হ্যাঁ।
তোমার সাথে যখন এভাবে থাকি, ভুলে যাই যে তুমিও বিপজ্জনক একটা মানুষ। পিটারের চেহারায় কি যেন খুঁজল ব্যারনেস। তুমি বিপজ্জনক সেজন্যেই কি তোমার প্রতি এতটা আকর্ষণ আমার? তুমি কাছে না থাকলে কেন আমি কাতর হয়ে পড়ি? অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল সে। তুমি দ্র, তোমার ব্যবহার কি সুন্দর। কিন্তু কখনো কখনো তোমার হাসির মধ্যে কি যেন একটা থাকে, কখনো কখনো তোমার চোখে জ্বলে ওঠে ঠাণ্ডা একটা আলো, কঠিন আর নিষ্ঠুর। তখন আমার মনে পড়ে অনেক, অনেক লোককে খুন করেছ তুমি। তোমার কি মনে হয় এর জন্যেই তোমাকে এত ভালো লাগে আমার? সেজনেই কি এই টান?
অন্য কোনো কারণ থাকলে ভালো হয়।
রক্ত আর জখম ধ্বংস আর বিপর্যয় দেখে উত্তেজিত বোধ করে অনেক লোক। যারা বুল ফাইট আর বক্সিং দেখতে যায় তাদের চেহারা লক্ষ্য করেছি আমি। নিজের কথা ভেবেছি, আমি কি তাদের একজন? জানি না, পিটার। শুধু জানি শক্তিশালী আর কঠিন পুরুষ আমাকে টানে। অল্টম্যান সেরকম একজন লোক ছিল। সে চলে যাবার পর আমার জীবনে আর একজন সেরকম লোক তুমি। আজ পর্যন্ত আর কাউকে দেখিনি।
নিষ্ঠুরতা শক্তি নয়, ব্যারনেসকে বলল পিটার।
না, সত্যিকার একজন শক্তিশালী মানুষের মধ্যে কোমলতা আর আবেগ থাকবে। তুমি শক্ত, অথচ যখন ভালোবাস এত নরম হতে পারো। কিন্তু নরম হলেও তোমার ভেতর কাঠিন্য আর নিষ্ঠুরতা আছে, টের পাই আমি। পিটারের পাশ থেকে সরে গিয়ে সোনালি আর ক্রীম কালারে সাজানো ঘরের চারদিকে হাঁটতে লাগল সে। একবার থেমে দেয়ালের পর্দা সরিয়ে বেল বাজাল।
ডিনার ট্রলি নিয়ে ভেতরে ঢুকল লোকজন, নেতৃত্ব দিচ্ছে রবার্টো। সে নিজের হাতে ওয়াইন গ্লাসে ঢালছে। তরল সাদা গ্লাভস পরনে। তার লোকেরা চলে যাবার পর দরজার পাশে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়াল, নিজের হাতে পরিবেশন করতে চায়। কিন্তু হাত নেড়ে তাকে বিদায় করে দিল ব্যারনেস।
মোটা প্যাড আকৃতির একটা উপহার রয়েছে টেবিলে, লাল আর সোনালি কাগজে মোড়া।
উপহার একবার কেনা শুরু করলে আমার আর হুশ থাকে না, বলল ব্যারনেস। কিন্তু এবার আমি ভাবলাম, ওটা তুমি খুলবে!
সাবধানে খুলল পিটার, তারপর স্থির হয়ে গেল।
ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে আছে ব্যারনেস। কি যেন খুঁজছে পিটারের চোখে। তুমি খুশি হওনি?
বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল পিটার। ওটা কোথায় পেলে তুমি? সোথবিতে ১৯৭১-এ ছিল বইটা, তখন একবার অকশন করেছিলাম। পাঁচ হাজার পাউন্ডের পর ছেড়ে দিয়েছিল সে।
তোমার কাছে কর্নওয়ালিস হ্যারিসের প্রথম এডিশন নেই তাহলে? মাথা নাড়ে পিটার। আফ্রিকার বিগ গেমের দুপ্রাপ্য সোনালি কালার প্লেট রয়েছে বইটায়।
না, নেই। কিন্তু তুমি জানলে কি করে?
তোমার কি মনে হয় না, তোমার নিজের চেয়ে তোমার সম্পর্কে বেশি জানি আমি? রহস্য করে জানতে চায় ম্যাগডা।
অসাধারণ একটা বই! তাও প্রথম এডিশন! বিশ্বাস করতে পারছি না।
মুখ নিচু করে খেতে শুরু করল ব্যারনেস, খাওয়ার সময় কেউ আর কোনে কথা বলল না। রবার্টো এসে টেবিল পরিষ্কার করল, ট্রলি নিয়ে বেরিয়ে গেল নিঃশব্দে। ফায়ার প্রেসের সামনে পাশাপশি সোফায় বসল ওরা, হাতে কফির কাপ
পিটার, ব্যারনেস ম্যাগডাই প্রথম নিস্তব্ধতা ভাঙল। আজ আমি তিনজনের কথা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছি না। তুমি, আমি আর খলিফা। তুমি পাশে আছ, কাজেই আমার ভয় পাবার কোনো কারণ নেই তবু আমি ভয় পাচ্ছি। অল্টম্যানের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। হিংস্র পশুর ওপরও মানুষ ওরকম নির্যাতন চালায় না…
ব্যারনেস ম্যাগডার হাতে হাত রেখে মৃদু চাপ দিল।
আমার একটা দ্বীপ আছে, হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল ব্যারনেস। একটা নয় অনেকগুলো ছোট ছোট নয়টা। ওগুলোর মাঝখানে আছে নয় কিলোমিটার চওড়া একটা লেগুন। এত স্বচ্ছ তার পানি পঞ্চাশ ফিট নিচেও মাছ দেখতে পাবে তুমি। বড় দ্বীপটায় আছে এয়ারস্ট্রিপ, তাহিতি থেকে প্লেনে মাত্র দুঘণ্টার পথ। ওখানে আমরা আছি কেউ জানতে পারবে না। সারাদিন আমরা সাঁতার কাটতে পারি, হাত ধরাধরি করে হাঁটতে পারি বালির ওপর, আকাশ ভরা মিটিমিট তারার নিচে ভালোবাসতে পারি। আমার মতো বা আমার চেয়ে ভালো কাউকে ব্যবসায় দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারি আমরা। ওখানে শান্তির নীড় বাঁধতে পারি। কোনো বিপদ নেই। ভয় নেই। খলিফা নেই–হঠাৎ থেমে গেলে সে, যেন শেষ কথাটা ভুল করে বলে ফেলছিল। যাবে, পিটার? পালাবে আমার সাথে?
স্বপ্নটা লোভনীয়, বিষণ্ণ সুরে বলল পিটার।
কথা না বলে ব্যারনেসের চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকল পিটার, যতক্ষণ না ব্যারনেস দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ নিচু করল।
উঁহু, না, পিটারের মনের ভাব বুঝতে পেরে সমর্থন করল ব্যারনেস। তা হবার নয়। এই জীবনযাপন কেউই আমরা ছাড়তে পারব না। কিন্তু পিটার, আমার বড় ভয় হয়–ভয় হয় তোমার সম্পর্কে আমি কি জানি, আর কি কি জানি না। একইরমভাবে, আমার সম্পর্কে তুমি তো সব জানো না। অনেক কিছু আছে যেগুলো বলতে পারি না। কিন্তু তুমি ঠিক বলেছ। খলিফাকে খুঁজে পেতে হবে আমাদের। ধ্বংস করতে হবে তাকে। কিন্তু ওহ গড–এই করতে গিয়ে নিজেদেরকেই না ধ্বংস করে ফেলি আমরা।
যে কোনো সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায়।
