এমন সময়, নদীর পানিতে একজনের অস্তিত্ব টের পেল সে। ম্যাগডার দুজন বডিগার্ডও চলে এসেছে, নদীর পাড়ে তাদের আওয়াজ পাচ্ছে পিটার। একজনকে আটকে ফেলেছে প্রধান দেহরক্ষী, কার্ল। ক্লান্ত, অবসন্ন লোকটা হাঁটু পানিতে হাঁটছে, চুলে ঢাকা পড়ে আছে তার মুখ। নাভির কাছে দুহাতে পিস্তল ধরে তাকে দেখছে কার্ল।
আচমকা পিটার টের পেল কি ঘটতে যাচ্ছে। বমির ভাবটা চেপে চেঁচিয়ে উঠল ও, না! কার্ল, না! ওকে জ্যান্ত ধরো! মেরো না, কার্ল!
দেহরক্ষী শুনতে পেল না বা ওর কথা বুঝল না। মাজল থেকে বেরিয়ে আসা আগুনের ঝলক কার্ল আর আততায়ীর মাঝখানে যে একটা রক্ত-গোলাপি রশি টেনে দিল। বজ্রপাতের মতো আওয়াজ হলো বিস্ফোরণের। আততায়ীর বুক আর পেটে বুলেট তো নয় যেন কাঠুরের কুঠার ঢুকল।
না! অসহায়ভাবে চিৎকার করছে পিটার। ওহ খোদা না! হাতের ব্যথা ভুলে দ্রুত সাঁতার দিয়ে এগিয়ে এল ও, জড়িয়ে ধরল একটা লাশকে। এক হাতে টেনে লাশটাকে পাড়ে তুলে আনল ও দেহরক্ষীরা সাহায্য করল ওকে।
দুবার দাঁড়াবার চেষ্টা করে শক্তি পেল না পিটার। কার্ল ওর বগলের নিচে হাত দিয়ে খাড়া করল। কোমর ভাজ করে গলগল করে বমি করল পিটার।
পিটার! ব্রিজের ওপর থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
ডান হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মুখ মুছে চোখ তুলল পিটার, নেশাখোর মাতালের মতো লাগছে ওকে। ব্রিজ ধরে ছুটে আসছে ব্যারনেস ম্যাগডা। লম্বা পায়ে কালো বুট আর স্কি প্যান্ট পরে আছে। সন্ত্রস্ত চেহারা সাদা হয়ে আছে।
কোমর সিধে করে টলতে লাগল পিটার। ছুটে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল ব্যারনেস, সিধে হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করল।
পিটার, ওহ গড! ডার্লিং কি হয়েছে…!
লাশটাকে দেখাল পিটার। কয়েকজন তোক নিয়ে তোমাকে কিডন্যাপ করতে চেয়েছিল ও, কিন্তু তোক চিনতে ভুল করে ফেলে।
লাশের দিকে তাকিয়ে থাকে ওরা। পয়েন্ট তিনশ সাতান্ন মাগনাম ব্যবহার করেছে কার্ল, বুক আর পেট ধসে গেছে। মুখ ঘুরিয়ে নিল ব্যারনেস।
ভালো দেখিয়েছ, কার্লকে বলল পিটার। ও আর মুখ খুলবে না।
আপনি তো, স্যার ওকে থামাতে বললেন, পিস্তল রিলোড করতে করতে গম্ভীর সুরে বলল কার্ল।
ভাবছি যদি মারতে বলতাম তাহলে কি করতে তুমি। রাগে, দুঃখে, অন্য দিকে তাকাল পিটার। ক্ষতটা ব্যথা করে উঠল। বিকৃত হয়ে গেল চেহারা।
আহত হয়েছ হঠাৎ বুঝতে পেরে আতকে উঠল ব্যারনেস ম্যাগডা। ওর ওদিকের হাতটা ধরো, কার্লকে হুকুম করল সে। দুজনের সাহায্যে ব্রিজের গোড়ায়, সেখান থেকে গাড়িতে উঠে এল পিটার।
ভিজে আর ছেঁড়া কাপড় খুলে ফেলল ও, ক্যাবের আলোয় ক্ষতটা পরীক্ষা করে নিজের গায়ের উলেন শাল দিয়ে পিটারকে ঢেকে দিল ব্যারনেস। ক্ষতটা থেকে এখন আর রক্ত পড়ছে না।
বুলেটের গর্তটা নীল হয়ে গেছে, শক্ত পেশি আর পাঁজরের মাঝখানে আটকে আছে বুলেট, বাইরে থেকে দেখা গেল। থ্যাংকস গড! ফিসফিস করে বলল ব্যারনেস। এখুনি তোমাকে আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাব। কার্ল, যত জোরে পারে চালাও। পাশের ককটেল কেবিনেট খুলল সে, ক্রিস্টাল একটা টাম্বলার বের করে হুইস্কি ঢালল তাতে।
মুখে হুইস্কি নিয়ে কুলি করল পিটার, তারপর দু-ঢোক গিলে ফেলল। একটু পরেই গরম হয়ে উঠল শরীর।
কিভাবে আসা হলো তোমার? জিজ্ঞস করল ও।
রবুইলে পুলিশকে কেউ একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টের খবর দেয়। মাসেরাতি ওদের চেনা গাড়ি, ইন্সপেক্টর লা পিয়েরে বেনিতে ফোন করে। আমি ধরে নিলাম…
গেটের কাছে পৌঁছুল গাড়ি, সামনে মেইন রোড। রাস্তার ধারে মাসেরাতির অবশিষ্ট দুমড়েমুচড়ে পড়ে আছে, সেটাকে ঘিরে পাঁচ-সাত জন পুলিশ অস্থিরভাবে ঘোরাফেরা করছে, যেন এরপর কি করতে হবে জানা নেই তাদের। গাড়ির গতি শ্লথ হলো, জানালা দিয়ে মুখ বের করে একজন সার্জেন্টের সাথে কথা বলল ব্যারনেস। সার্জেন্ট সমীহের সাথে ঘন ঘন মাথা ঝাঁকাল। পুলিশরা সবাই স্যালুট করল ব্যারনেসকে। আবার স্পীড তুলল কার্ল।
শুধু ব্রিজের কাছে নয়, বলল পিটার, সম্ভবত জঙ্গলের কিনারাতেও একটা লাশ পাবে ওরা।
সত্যি তুমি যোগ্য লোক, তাই না? পটলচেরা চোখ সরু করে ওর দিকে তাকাল ব্যারনেস।
সত্যিকার যোগ্য লোকেরা আহত হয় না। হাসল পিটার, বেঁচে থাকার আনন্দ ফিরে পাচ্ছে আবার।
মাসেরাতির ব্যাপারে তুমি তাহলে ঠিকই বলেছিলে–ওরা আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল।
সেজন্যেই তো ওটাকে পুড়িয়ে ফেললাম, বলল পিটার, কিন্তু ওর হাসির কোনো উত্তর দিল না ব্যারনেস।
পিটারের হাত চেপে ধরে, ওর অক্ষত কাঁধে মাথা রাখল ব্যারনেস। ওহ পিটার, কি রকম লাগছিল আমার সে তুমি বুঝবে না। পুলিশ জানাল, ড্রাইভার বেরোতে পারেনি, গাড়ির সাথে পুড়ে গেছে। মনে হলো…মনে হলো, আমার একটা অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। কি যেন একটা মরে গেল আমার ভেতরে। আমি আসতে চাইনি কিন্তু ভাবলাম নিজের চোখে না দেখে বিশ্বাস করব না। ব্রিজে ওঠার পর কার্ল বলল, নদীতে তোমাকে সে চিনতে পারছে… থরথরে করে কেঁপে উঠল সে। সব আমাকে বল, কি ঘটেছে বল আমাকে সব। পিটারের টামব্লারে আরো হুইস্কি ঢালল ম্যাগডা।
কি কারণে পিটার নিজেও ভালো জানে না সিট্রনের কথাটা চেপে গেল ও। নিজেকে যুক্তি দিল সিট্রনের সাথে ফাঁদের কোনো সম্পর্ক নাও থাকতে পারে কারণ স্ট্রিনের ড্রাইভার ফোন করে ভুয়া পুলিশকে জানিয়ে দিতে পারত মাসেরাতিতে ব্যারনেস অল্টম্যান নেই। তারমানে স্ট্রিনের সাথে ফাঁদের সম্পর্ক থাকলে বিশ্বাস করে নিতে হয় তারা ব্যারনেসকে নয়, ওকেই খুন বা কিডনাপ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তা বিশ্বাস করার, কোনো কারণ নেই। মাত্র আজ সকালে নিজেকে টোপ হিসেবে বাজারে ছেড়েছে পিটার, এত তাড়াতাড়ি সেটা গিলতে পারে না প্রতিপক্ষ। মাথাটা ঝিমঝিম করছে, এসব নিয়ে পরে চিন্তাভাবনা করা যাবে। তার আগে পর্যন্ত ওকে বিশ্বাস করতে হবে, ফাঁদটা ব্যারনেসের জন্যেই পাতা হয়েছিল, কিন্তু জালে ধরা পড়ে যাচ্ছিল ও।
