প্যারাসুট ডুপের ভঙ্গিতে মাটি স্পর্শ করল পিটার। পা আর হাঁটুতে ধাক্কা খেল, তার পর গড়িয়ে দিল শরীরটা কাধ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল ব্যথাটা ক্ষতের ভেতর। কি যেন ছিঁড়ে যাওয়ায় অন্ধকার দেখল চোখে।
লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে টলতে লাগল ও। এক সেকেন্ড পর একটু কমল ব্যথা, জঙ্গলের কিনারা লক্ষ্য করে ছুটল ও কমলা রঙের কাঁপা আলো আসছে আগুন ধরা গাড়িটা থেকে। কোবরার চেম্বারে এক রাউন্ড গুলি ভরল পিটার। বাঁ হাতের আঙুলগুলো ফোলা ফোলা আর অসাড় লাগল।
ঠিক তখুনি বাঁকের সামনের রাস্তা বিমূঢ় করা উজ্জ্বল আলোয় ঝলসে উঠল। ছাৎ করে উঠল পিটারের সামনের বুক। যেন নধর, মধ্যিখানে কেউ ওর কাপড় খুলে নিয়েছে। বৃষ্টিভেজা নরম রাস্তায় ডাইভ দিয়ে পড়ল ও শর্ষেফুল দেখল চোখ।
হামাগুড়ি দিয়ে গাছগুলোর দিকে এগোচ্ছে ফোলা দেখল নাক। শর্টের ভেতর আবার শুরু হয়েছে রক্তপাত। রাস্তার বিস্তৃতিটুকু সগর্জনে পেরিয়ে গেল পুলিশ ভ্যান। কাদা মাটি আর ঘাসের সাথে মুখ সেটে পড়ে থাকল পিটার। তিনশ গজ দূরে দাঁড়িয়ে পড়েছে মাসেরাতি। দুটো চাকা এখনো রাস্তায়। বাকি দুটো রাস্তার পাশে মাটিতে। সর্বাঙ্গে আগুন নিয়ে ভালোভাবেই জ্বলছে সেটা। কোম্বি ভ্যান থামল মাসেরাতির কাছ থেকে সশ্রদ্ধ একটা দূরত্ব রেখে। যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারে গাড়িটা। সাদা ক্যাপ আর কোট পরা পুলিশটা ভ্যান থেকে নেমে সামনের দিকে ছুটল। মাসেরাতির ক্যাবের ভেতর একবার উঁকি দিয়েই চিৎকার করে কিছু বলল সে, মনে হলো ভাষাটা ফরাসি কিন্তু এত দূর থেকে পরিষ্কার শোনা গেল না।
দ্রুত একটা ইউ টান নিল কোম্বি; মাটিতে ঝাঁকি খেল, তারপর ফিরে যেতে শুরু করল বাকের দিকে, ধীর গতিতে। ভ্যানের সামনে মেশিন পিস্তল হাতে সেই দুজন লোক রয়েছে। চেইনের সাথে বাধা হাউন্ডের মতো ছুটছে তারা দুজন রাস্তার দুই কিনারা ধরে, রাস্তার নরম কাঁধে পিটারকে খুঁজছে তারা। সাদা ক্যাপ মাথায় পুলিশটা দাঁড়িয়ে রয়েছে ভ্যানের রানিংবোর্ডে, শিকারিদের নির্দেশ এবং উৎসাহ দিচ্ছে।
আবার দাঁড়াল পিটার কোমর ভাঁজ করে নিচু হয়ে দৌড়াল। যেমন করে হোক জঙ্গলের ভেতর ঢুকতে হবে ওকে। কাটাতারের বেড়ায় গোটা শরীর আছাড় খেল, স্প্রিং-এর মতো আরেক ধাক্কা দিয়ে পিছন দিকে ছুঁড়ে দিল ওকে বেড়াটা, ধড়াম করে চিত হয়ে পড়ে গেল পিটার।
কাঁটাতারে ছিঁড়ে গেছে ট্রাউজার, আওয়াজ শুনেছে ও। দুইশ সত্তর ডলার দিয়ে স্যাভিল রো থেকে তৈরি করা স্যুট বরবাদ হয়ে গেল, দুঃখের মধ্যেও মৃদু হেসে ভাবল। বিশ্রাম নিল না সে। হামাগুড়ি দিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকল পিছন থেকে। একটা চিৎকার ভেসে এল, যাস্ শালা, মাটিতে পায়ের দাগ দেখে ফেলেছে। তার পর আরেকটা আওয়াজ হলো আগের চেয়ে জোরালো উল্লাসে ভরপুর। মাসেরাতির আলোয় ধরা পড়ে গেছে পিটার। চিৎকারের পরপরই অটোমেটিক ফায়ারের শব্দ হলো কিন্তু শর্ট ব্যারেল আর লো ভেলোসিটি অ্যামুনিশনের জন্যে রেঞ্জটা খুব বেশি। বাদুড়ের ডানা ঝাপটানোর মতো মৃদু আওয়াজ পেল পিটার মাথার দিকে অনেক ওপর থেকে। এতক্ষণে প্রথম সারির গাছগুলোর কাছে পৌঁছুল ও, একটার পিছনে দাঁড়িয়ে আড়াল নিল।
হাঁপাছে বটে, কিন্তু নিঃশ্বাস ফেলতে কোনো কষ্ট হচ্ছে না। ক্ষতটা মারাত্মক নয়, হলে এতক্ষণে দুর্বল হয়ে পড়ত শরীর। এখান থেকে কাঁটাতারের বেড়া পঞ্চাশ মিটার, আন্দাজ করল পিটার। কোবরার বাট ধরেছে দুহাতে, অপেক্ষা করছে ওর মতো একই দুর্দশায় পড়ে লোকগুলো। বেড়ার সাথে ধাক্কা খেয়ে দুজন ধরাশায়ী হলো, ব্যথা পেয়ে গালিগালাজ বেরিয়ে এল মুখ থেকে। নিঃসন্দেহ হওয়া গেল ভাষাটা ফরাসি। উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। আগুনের আভায় দেহ-কাঠামোর কিনারা গোলাপী দেখাল। একজন মেশিন গানারের পেট লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ল পিটার।
তিনশ পঁচাশি ফুট পাউন্ড এনার্জি নিয়ে ছুটে গেল বুলেট। থ্যা করে একটা আওয়াজের সাথে ঢুকে গেল মাংস আর হাড়ের ভেতর। মাটি থেকে শূন্যে উঠে পড়ল লোকটা, ছিটকে পড়ল পিছন দিক। পরবর্তী টার্গেটের দিকে কোবরার ব্যারেল ঘোরাল পিটার, কিন্তু বাকিগুলো অপ্রত্যাশিত আক্রমণের মুখেও হতভম্ব হয়ে পড়েনি। সাথে সাথে অন্ধকার মাটিতে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়েছে। দেখতে না পেলে গুলি করবে না পিটার, অ্যামুনিশন কম। ওদের একজন একপশলা ব্রাশ ফায়ার করল, সামনের কয়েকটা গাছ থেকে ঝরে পড়ল ডাল আর পাতা। এক কি দুই মিনিট লাগবে ওদের, এই সুযোগে খানিক দূর সরে যাওয়া দরকার। জঙ্গলের মাথা আর মাসেরাতির মাঝখানে কোনো আড়াল নেই। আগুনের ক্ষীণ আভায় অন্ধকার দূর না হলেও কোন দিকে যাচ্ছে বুঝতে পারল পিটার। নাক বরাবর গেলেই নদী পড়বে কিন্তু দু-তিন গজ এগোবার পরই কাঁপতে শুরু করল ও। বৃষ্টিতে আর ভেজা ঝোপেঝাড়ে ঘষা খেয়ে স্যুটটা সপসপ করছে। জুতোর ভেতর কাদা-পানি ঢুকছে, ঠাণ্ডায় হি হি করতে করতে এই প্রথম বমি পেল পিটারের। পঞ্চাশ গজের মতো এগিয়ে একবার করে থামল ও, পিছনে পায়ের আওয়াজ শোনার জন্যে। রাস্তার দিক থেকে একবার ইঞ্জিনের আওয়াজ পেল, মনে হলো ফুল স্পীডে কোনো প্রাইভেট কার ছুটে গেল। রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত পুলিশ ভ্যান আর জ্বলন্ত মাসেরাতি দেখে কি মনে করবে আরোহীরা? আসল পুলিশকে খবর দিয়ে হলেও তারা এসে পৌঁছুবার আগে যা ঘটার ঘটে যাবে।
