ম্যাগাজিন শেষ হতেই গুলির আওয়াজ থেমে গেল। সীটে উঁচু হলে, পিটার পাপড়িতে কাঁচের কণা নিয়ে চোখ পিটপিট করে সামনে তাকাল। গাছ আর ঝোঁপ কালো মেঘের মতো ঝুলে রয়েছে মাথার ওপর, শিউরে উঠে মাসেরাতিকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করল ও। উল্টে যেতে শুরু করল গাড়ি কিন্তু সেদিকে খেয়াল না দিয়ে পিটার দেখল আততায়ীরা দ্রুত গড়াতে গড়াতে অগভীর খাদে নেমে যাচ্ছে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে খাদের ঠোঁট পেরোল মাসেরাতির পিছনের একটা চাকা।
সামনের দিকে ছিটকে পড়ল পিটার, সীট বেল্টের চাপে হুস করে খালি হয়ে গেল ফুসফুস। আতঙ্কিত ঘোড়ার মতো পিছিয়ে এল মাসেরাতি, পারলে লেজের ওপর, সটান দাঁড়িয়ে পড়ে। খাদের ঠোঁট পেরিয়ে একবার নামছে মাসেরাতি আবার ওঠার চেষ্টা করছে। এভাবেই চলল কিছুক্ষণ।
নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবার জন্য গিয়ার, ব্রেক আর হইলের সাথে যুদ্ধ করছে পিটার। পরবর্তী দু সেকেন্ডের কোনো বর্ণনা দিতে পারবে না ও, তবে নিশ্চয়ই পুরো এক পাক ঘুরে গেছে মাসেরাতি–একঝলক আলো লাগল চোখে একজনকে গড়াতে দেখল, আরেকজনকে ছুটতে—সবই বৃষ্টির মধ্যে ঝাপসা আর অস্পষ্ট।
সবশেষে আবার সামনে খোলা রাস্তা ছেড়ে দিয়ে হুইল আপনাআপনি ঘুরে যাচ্ছে, তীরবেগে নাক বরাবর লাফ দিল গাড়ি। একই সময়ে মুখ তুলে রিয়ার ভিউ মিররে।
একচোখ জ্বলছে কোম্বি ভ্যানের। সেটার আলোর নীল ধোয়া আর বাষ্পের মেঘ দেখল পিটার।
টায়ার জ্বলছে। ধোয়া আর বাস্পের ভেতর দিয়ে খাদে দাঁড়ানো দ্বিতীয় লোকটাকে আবছামূর্তির মতো লাগল, তার কোমরের কাছ থেকে মেশিন পিস্তলের মাজল ঝলসে উঠল। মাসেরাতির গায়ে প্রথম দফা বিস্ফোরণের আওয়াজ পেল পিটার কিন্তু নিচু হয়ে মাথাটা আড়াল করার উপায় নেই, বৃষ্টির মধ্যে সামনেই একটা বাঁকাচোখ ধাঁধানো গতিতে কাছে চলে আসছে। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। মুখের ভেতর হাড়গোড় সব যেন ভেঙে চুড়িয়ে যাবে। পরবর্তী বিস্ফোরণও মাসেরাতির গায়ে লাগল, মনে হলো ঝমঝম বৃষ্টি পড়ল টিনের ছাদের। পিঠের ওপরের অংশে একটা ধাক্কা খেল পিটার। বুলেট আটকে গেছে নিঃসন্দেহে, অনুভব করল সে। হতে পার রিকোশো নয়তো পিছনের উইন্ডশীল্ড আর সীটের ভেদ করে আসা গতি হারানো বুলেট।
নিখুঁতভাবে বাঁক নিল গাড়ি, আর তার পরই খকখক করে উঠল ইঞ্জিন। একবার গতি হারায়, আবার ছোটে, তারপর আবার গতি হারায়। প্রায় সাথে সাথেই গ্যাসোলিনের গন্ধে ভরে উঠল গাড়ির ভেতরটা। ফুয়েল লাইন ফুটো হয়ে গেছে কোথাও, বুঝতে পেরে ভাগ্যকে অভিশাপ দিল পিটার। পিঠ আর পাঁজর বেয়ে রক্তের ধারা নেমে যাচ্ছে। বাম কাঁধের নিচে কোথাও আঘাত পেয়েছে। আরো একটু ভেতরে ঢুকলে ফুটো হয়ে যেত ফুসফুস। ফুটো হয়েছে কিনা, তা এখনো বলা যাচ্ছে না। গলা দিয়ে রক্ত ওঠার অপেক্ষায় থাকল ও।
আবার সচল হলো ইঞ্জিন, ফুয়েলের অভাবে মারা যাচ্ছে। মেশিন পিস্তলের প্রথম দফা বিস্ফোরণেই সম্ভবত ইঞ্জিন কমপার্টমেন্ট আঘাত করেছিল। সিনেমা হলে এতক্ষণে খুদে ভিসুভিয়াসের মতো অগ্নিকুণ্ড হয়ে উঠত মাসেরাতি, বাস্তবে অবশ্য তেমন ঘটে না। ছেঁড়া লিড থেকে এখনো প্রাগ আর পয়েন্টগুলোর গ্যাসেলিন সাপ্লাই হচ্ছে।
বাঁক নেয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে পিছন দিকটা চট করে একবার দেখে নিয়েছে পিটার।
আহত মাসেরাতি আরেকটা লাফ দিল। ধুঁকতে ধুঁকতে আরো পাঁচশ গজ নিয়ে এল পিটারকে, তারপর শেষবারের মতো থেমে গলে। ওর সামনে, হেডলাইটের আলোর শেষ প্রান্তে, লা পিয়ের বেনিতে সাদা গেট দেখা যাচ্ছে। ফাঁদটা এমন এক জায়গায় পেতেছে ওরা যেখানে অন্যান্য যানবাহন থেকে দৃষ্টি পড়ার আশঙ্কা কম। জালের ভেতর শুধু যাতে মাসেরাতিকে আটকানো যায়।
মনটাকে কাজের মধ্যে ফিরিয়ে আনল পিটার। মেইন গেটের সামনে এস্টেটের লে আউট স্মরণ করল ও। মাত্র একবার এখানে এসেছিল, সেবারেও অন্ধকার। তবে সৈনিকের চোখ, মনে আছে রাস্তার দুধারে গভীর জঙ্গল, রাস্তার আরো খানিক সামনে নিচু একটা ব্রিজ, নিচে খাড়া পাড়সহ খরস্রোতা পাহাড়ি নদী। ব্রিজের পর খাড়াভাবে উঠে গেছে রাস্তা সরাসরি বাড়িতে। গেট থেকে বাড়িটা আধমাইল দূরে, পিছনে চারজন সশস্ত্র আততায়ী আর শরীরে বুলেট থাকলে এই আধমাইলই অনেক দূরের পথ। তাছাড়া, বাড়িতে পৌঁছুতে পারলেও নিরাপত্তা পাওয়া যাবে কিনা তার কোনো গ্যারান্টি নেই। ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলেও মাসেরাতি এখনো গেটের দিকে এগোচ্ছে, ধীর ধীরে কমে আসছে গতি। গরম তেল আর পোড়া রাবারের গন্ধ পাচ্ছে পিটার। ইঞ্জিন হুডের রঙ বদলে যেতে দেখল ও। ইলেকট্রিক পাম্প থেকে গরম ইঞ্জিনে আরো তেল ছড়াচ্ছে, ইগনিশন অফ করে বন্ধ করল সেটা। জ্যাকেটের ভেতর হাত ভরে যেখানে পাবে বলে আশা করেছিল সেখানেই পেল ক্ষতটা, বাম দিকে আর নিচে। এতক্ষণে দপদপ করতে শুরু করেছে, চটচট আর পিচ্ছিল হয়ে উঠল হাত। বের করে উরুতে মুছল।
ওর পিছন দিকে বৃষ্টির মধ্যে প্রতিফলিত আলোর আভা, প্রতি মুহূর্তে জোরাল হচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে বাঁক নিয়ে চলে আসবে ওরা। গ্লাভ কর্মপার্টমেন্ট খুলে নাইন এম এম কোবরাটা বের করে হোলস্টারে ভরল। টেনে বেল্টের সমনে নিয়ে এল সেটাকে। স্পেয়ার ম্যাগাজিনের ব্রীচও খালি। ম্যাগাজিনে শুধু নয় রাউন্ড গুলি আছে। ইঞ্জিন কম পার্টমেন্টের বনেটের ভেতর থেকে ফাটল আর ফুটো দিয়ে। আগুনের খুদে শিখা বেরিয়ে আসছে। সীট বেল্ট খুলে ফেলল পিটার। দরজাটা আধখোলা অবস্থায় রাখল, একহাতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে মাসেরাতিকে রাস্তার কিনারায় নিয়ে যাচ্ছে। এখান থেকে হঠাৎ করে নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে রাস্তা। এক ঝটকায় স্টিয়ারিং হুইল উল্টে একটা ঝাঁকি মতো খেল পিটার। সেই ঝকির সাথে ছোট একটা লাফ দিয়ে বেরিয়ে এল গাড়ির বাইরে। গড়িয়ে রাস্তার মাঝেখানে ফিরে গেল। মাসেরাতি থেমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
