ভার্সেই ছড়িয়ে রবুইলে রোডের উপর বেশ অনেকক্ষণ পর এই প্রথম পিছনটা অনেক দূর পর্যন্ত পরিষ্কার দেখতে পেল পিটার। রাস্তার দুপাশে গাছের সারি, মাঝখানে অন্য কোনো গাড়ি নেই। খুঁতখুঁতে ভাবটা আর থাকল না। শেষ বাঁকটা আর বেশি দূরে নয়, তারপরই লা পিয়েরি বেনিতে পৌঁছে যাবে প্রেমিক প্রবর।
ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হলো। বাঁক নেয়ার সাথে সাথে পিটারের সামনে ভিজে কুণ্ডলী ছড়ালো কালো অজগরের মতো রাস্তাটা, বহুদূরে এক জায়গায় ফুলে ফেটে উঁচু হয়ে আছে। তীরবেগে গাড়ি ছোটবার আনন্দে বিভোর হয়ে আছে ও। ঢালের মাথায় উঠে এর ঘণ্টায় দেড়শ কিলোমিটার স্পীড, ক্লাচ, ব্রেক আর হুইল নিয়ে মহানন্দে রয়েছে ও। ওর সামনে চকচকে সাদা ক্যাপ মাথায় একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে, বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ভিজছে লোকটা, হাতের লাল আলোসহ ল্যাম্পটা ঘন ঘন মুখের সামনে তুলে দোলাচ্ছে। রাস্তার পাশে খাদে পড়ে আছে একটা পুজোট গাড়ি, হেডলাইটের আলো আকাশের দিকে তাক করা। গাঢ় নীল পুলিশের ভ্যানটা রাস্তা প্রায় বন্ধ করে রেখেছে, ভ্যানের আলোয় আলোকিত হয়ে রয়েছে রাস্তার ওপর হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে থাকা স্থির দেহ। অত্যন্ত স্বাভাবিক অক্সিডেন্ট পরবর্তী দৃশ্য, পরিবেশে নাটকীয়তা এনে দিয়েছে ঝিরঝির বৃষ্টি।
সময় মতোই মাসেরাতির স্পীড কমাল পিটার, গুটি গুটি এগোচ্ছে গাড়ি। ইলেকট্রিক মটরের মৃদু গুঞ্জনের সাথে যোগ হলো বৃষ্টির কোমল শব্দ, পাশের জানালার কাঁচ নামিয়ে দিল পিটার। ঠাণ্ডা বাতাস ঝাপটা মারল চোখেমুখে। ইউনিফর্ম পরা পুলিশ ল্যাম্প নেড়ে একটা বিশেষ জায়গায় দিকে ইঙ্গিত করল পিটারকে, ঝোঁপ আর কোম্বি ভ্যানের মাঝখানে মাসেরাতিকে থামাতে বলছে।
অদ্ভুত একটা নড়াচড়া লক্ষ্য করল পিটার। হেডলাইটের আলোয় শুয়ে থাকা একটা দেহ। সামান্য একটু নড়ে আবার স্থির হয়ে গেছে। শুধু পিঠটা একটু ফুলে। মতে উঠেছিল, শোয়া অবস্থা থেকে কেউ উঠতে চাইলে প্রথমে তো পিঠটাই উঁচু হয়।
লোকটাকে হাত তুলতে দেখল পিটার, মাত্র কয়েক ইঞ্চি। উরুর পিছনে কি যেন লুকিয়ে রেখেছে লোকটা। তারপরই জিনিসটা চিনতে পারল পিটার। ভাজ করা মেশিন পিস্তল। ফুটোওয়ালা ছোট ব্যারেল।
সেই মুহূর্তে এত দ্রুত কাজ শুরু করল মাথা, পিটারের মনে হলো যা কিছু ঘটছে সবই স্বপ্নের মধ্যে বড় বেশি ধীরগতিতে ঘটছে। মাসেরাতি, ভাবল ও। ম্যাগডার জন্যে ফাঁদ পেতেছে ওরা।
মাসেরাতি যেখানে থামবে আন্দাজ করে নিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল পুলিশ, যাতে ড্রাইভারের পাশে থাকতে পারে সে। তার ডান হাত সাদা রেনকোটের ভেতর, পিস্তল বেল্টের কাছাকাছি।
গ্যাস পেডাল গাড়ির মেঝের সাথে চেপে ধরল পিটার, বুকে গুলি খাওয়া গণ্ডারের মতো গর্জে উঠে সাথে সাথে লাফ দিল মাসেরাতি। সামনের চাকা ভিজে রাস্তা ছেড়ে উঠে পড়ল, মৃদু স্পর্শ করে হইল একটু ঘোরাল পিটার। পুলিশ লোকটা ভারি সতর্ক, বিপদ দেখতে পাবার আগেই কিভাবে যেন টের পেয়ে গেছে, লাফ দিয়ে জায়গা বদল করল সে। ঝোঁপের দিকে ডাইভ দিল, হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করছে। মাসেরাতির একটা পাশ ঝোঁপ স্পর্শ করল, ঝড় ওঠার শব্দের সাথে ভেঙে পড়ল শুকনো ডালপালা। ডান পা তুলে মাসেরাতির বিদ্যুৎগতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করল পিটার, গাড়ির নাক আরেক দিকে ঘুরিয়ে নিতে হবে। মাসেরাতি সিধে হতেই আবার গ্যাস পেড়ালে চাপ দিল ও নতুন শক্তি পেয়ে আবার গর্জে উঠল ইঞ্জিন, এবার পিছনের চাকা থেকে নীল ধোয়া বেরিয়ে এল।
পুলিশ কোম্বিতে একজন ড্রাইভার রয়েছে, ভ্যানটা আগে বাড়িতে দিয়ে রাস্তাটা পুরোপুরি বন্ধ করার চেষ্টা করল সে। রাস্তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এই সময় অবশিষ্ট ফাঁকের মধ্যে চলে এল মাসেরাতি। দুটো গাড়ি স্পর্শ করল পরস্পরকে, ধাতব কর্কশ সংঘর্ষে পিটারের মাথার ভেতরটা এক সেকেন্ডের জন্যে ভোতা হয়ে গেল, দুসারি দাঁত ঠকাঠক বাড়ি খেল। দেহ দুটো এখন আর রাস্তায় পড়ে নেই। কাছের লোকটা এক হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে বেটপ মেশিন পিস্তলটা কাঁধের কাছে তুলছে-দেখে মনে হলো অস্ত্রটা স্টার্লিং বা সাইডওয়াইন্ডার হতে পারে। ভাজ করা ওয়ায়্যার বাঁট ব্যবহার করছে, কাঁধের কাছে তুলে ফায়ার করার জন্য একপলক বেশি সময় লাগছে তার, দ্বিতীয় লোকটার সামনে একটা বাধাও হয়ে সে। পিছনে তার সঙ্গীর হাতেও একটা মেশিন পিস্তল, প্রফেশনালদের মতো কোমরের কাছ থেকে গুলি করার জন্যে শিরদাঁড়া ধনুকের মতো বাঁকা করে সুযোগের অপেক্ষায় আছে।
কোম্বি ভ্যানের নাক বিধ্বস্ত করে দিয়ে কামানের গোলার মতো বেরিয়ে এল মাসেরাতি। গ্যাস পেডাল থেকে ডান পা তুলে পিছনের চাকার বিদ্যুৎগতি কমিয়ে আনল পিটার, একই সাথে বনবন করে ডান দিকে ঘুরিয়ে স্টিয়ারিং হুইল লক করে দিল। কংক্রিটের সাথে তীব্র শব্দে পিষে গেল রাবার, মাসেরাতি তার লেজের ঝাপটা দিল বাঁ দিকে, পিছলে রাস্তার লোক দুজনের দিকে ছুটল। দরজার নিচে মাথা নামিয়ে নিল পিটার। গাড়িটাকে বাঁ দিকে ইচ্ছে করে পিছলে যেতে দিয়েছে। যাতে অন্তত সামান্য হলেও ইঞ্জিন কমপার্টমেন্ট আর ধাতব কাঠামোর আড়াল পাওয়া যায়। নিচু হবার সময় পরিচিত আওয়াজটা কানে এল, এক দৈত্য যেন পুরু ক্যানভাস টেনে ছিঁড়ছে—অটোমেটিক আগ্নেয়াস্ত্রের উকিারণ, প্রতিটি মিনিটে প্রায় দু হাজার বুলেট। ইস্পাত ছিঁড়ে মাসেরাতির গায়ে ঢুকতে লাগল বুলেটগুলো কর্কশ আওয়াজে ভোতা আর অসাড় হয়ে গেল কান। কাঁচের গুড়ো ঝরঝর করে ঝরে পড়ল পিটারের গায়ে। কাঁচের টুকরো পিটারের পিঠে খোলা ঘাড়ে আর মুখে আটকে থাকল। গড়িয়ে বা খসে পড়ল না। মাথা ভর্তি কালো চুলে হীরের মতো আলো ছড়াচ্ছে।
