এ সব এখন কথা, বলল পিটার। আমি প্রস্তাবগুলো ফিরিয়ে দিয়েছি।
আমি তা মানি না, জেনারেল স্ট্রাইড, মাথা নিচু করে নিয়ে এমনভাবে চুপ করে থাকল ব্যারনেস, যেন কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে। হ্যাঁটের কার্নিসে ঢাকা পড়ে আছে মুখ। আবার যখন চোখ তুলল, সাথে সাথে হাতটাও উঠে এল পিটারের গায়ে। পিটারের কনুই ধরে স্মিত হাসল। আমার স্বামী ছিলেন অসাধারণ একজন মানুষ। তার মতো হিতাকাঙ্ক্ষী, শক্তিশালী আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ আমি আর দেখিনি। সেজন্যেই ওকে তারা খুন করে–ফিসফিস করে কথা বলছে সে,–খুন করার আগে তারা ওর উপর অমানসিক নির্যাতন চালায়। থামল সে কিন্তু মুখ ঘোরাল না। কেঁদে ফেলেছে সেজন্য লজ্জিত নয়। চোখ দুটো ভরে উঠেছে পানিতে, তবু নিজের পাতার কিনারা উপচে পানি ঝরে পড়ল না, এমনকি পাতা দুটো একবার কাঁপল না পর্যন্ত। অন্য দিকে তাকাতে হলো পিটারকেই। এবার ওর কনুই ছেড়ে দিল ব্যারনেস, ওর পাজর আর কনুই এর মাঝখানে হাত গলিয়ে আরো কাছে সরে এল, কেন কে জানে শিউরে উঠল একবার, দুটো মুখ একেবারে কাছে চলে এসেছে। বৃষ্টি হবে এখনি বলল সে, শান্ত গলা। আমাদের বোধ হয় ফেরা উচিত।
ফেরার পথে মৃদুকণ্ঠে কথা বলে গেল ব্যারনেস। অল্টম্যান খুন হয়ে গেল, কিন্তু খুনিদের কোনো সাজা হলো না, নপুংষক সমাজ তাদের শাস্তি দেয়ার কোনো ব্যবস্থা করতে পারল না। অ্যাটলাসের ধারণাটা প্রথম থেকেই আমার ভাল লেগেছিল। কিন্তু থোর আমাকে হতাশ করল। একটু থেমে পিটারের হাতে মৃদু চাপ দিল সে। হ্যাঁ, জেনারেল স্ট্রাইড-থোরের কথা আমার জানা ছিল। কিভাবে জেনেছি জিজ্ঞেস করবেন না প্লিজ।
খোলা ঢালের মাথা থেকে নেমে আবার বনভূমিতে ঢুকল ওরা। শুনে যাচ্ছে পিটার, কিছুই বলছে না।
বুঝলাম শক্তি দিয়ে কেউ বাধা না দিলে কিছুদিনের মাঝে সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যবে টেরোরিস্টদের হাতে। রাতদিন চিন্তা করতে লাগলাম আইনের ভিতরে থেকে কিভাবে ওদের ধংস করা যায়। অল্টম্যান ইন্ডাস্ট্রির উত্তরাধিকারী হিসেবে আন্তর্জাতিক তথ্য সংগ্রহের বা সিস্টেমের মালিকও আমি…, ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করল ব্যারনেস, বিভিন্ন সীমান্তের ওপার থেকে কিভাবে সে সন্ত্রাসবাদী খবরাখবর দিতে শুরু করে প্রথমে খবর দিলাম ইন্টারপোলকে, কিন্তু ওরা বলল অপরাধ সংগঠিত হওয়ার আগে ওদের কিছুই করার নেই। এভাবে আত্মহত্যাকারী একটা প্রবণতা চলতে থাকে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোতে। অপরাধীকে ধরার এবং শাস্তি দেবার ব্যাপারে তারা খুব একটা সচেতন নয়।
আমি অপেক্ষা করছি আসল কথাটা কখন আপনি বলবেন।
তারপর আমি প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশন ফার্মগুলো সম্পর্কে খবর নিতে শুরু করি, বলল ব্যারনেস। কিন্তু জেনারেল স্ট্রাইড, আমরা বাড়ির কাছে এসে পড়েছি…
আসুন বলে পথ দেখিয়ে এগোল পিটার, আস্তাবল পাস কাটিয়ে চলে এল সুইমিং পুল প্যাভিলিয়নে। পুলের গরম পানি থেকে বাষ্প উঠছে। ওদের পাশের কাঁচ মোড়া ঘরে ফুলে ভরে আছে গাছ। একটা দোলনায় বসলো ওরা, পাশাপাশি, এত কাছাকাছি যে নিচু গলায় কথা বললেও শোনা যাবে। হ্যাট, স্কার্ফ আর জ্যাকেট খুলে পাশের একটা বেতের চেয়ারে ছুঁড়ে দিল ব্যারনেস। তারপর সকৌতুকে বলল, কেন যেন মনে হচ্ছে স্যার স্টিভেন আপনাকে ব্যাঙ্কের চাকরিতে নিতে পারলে বর্তে যান!
স্টিভেনের মতো টাকার পিছনে অতটা ছোটার ইচ্ছে আমার কখনো ছিল না।
এই সময় মেলিসা এবং স্যার স্টিভেনের ছোট ছেলে হাত ধরাধরি করে হেঁটে এলো ওখানটায়, হাসিতে ফেটে পড়ছে দুজন।
ওদের দুষ্টামি দেখে হাসে ব্যারনেস। আপনার মেয়ে দারুণ মিষ্টি! উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে আরেকটা প্রশ্ন করল সে। মাথার ওপর দিয়ে ঝকঝাক পাখি কিচিরমিচির করতে করতে উড়ে গেল। পিটারের মনে হলো শব্দটা ভুল শুনেছে।
কি বললেন? সাবধানে জিজ্ঞেস করল ও। নির্লিপ্ত চেহারা, কিছুই প্রকাশ পাচ্ছে না।
খলিফা। নামটার তাৎপর্য জানা আছে আপনার?
ভ্রু কোঁচকাল পিটার, স্মরণ করার ভান করছে। বোয়িংয়ের ভেতর যা যা ঘটেছে সব একপলকে ভেসে উঠল চোখের সামনে। বিস্ফোরণ, ধোয়া, শিখা, পিস্তলের আওয়াজ, লাল শার্ট পরা কালো চুলের মেয়েটা উন্মাদিনীর মতো ছুটে আসতে আসতে বলেছে, আমাদের মেরো না! খলিফা বলেছে আমাদের মরতে হবে না। খলিফা…
খলিফা? জিজ্ঞেস করল পিটার, নিজেও জানে না কেন অস্বীকার করছে ও। শব্দটা মুসলমানদের একটা টাইটেল। আক্ষরিক অর্থ হল পয়গম্বরের উত্তরাধিকারী।
হ্যাঁ, একটু অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল ব্যারনেস। সিভিল আর রিলিজিয়াস লিডারের টাইটেল–কিন্তু কোডনেম হিসেবে নামটা কখনো কোথাও ব্যবহার করতে শুনেছেন?
না, দুঃখিত। তাৎপর্যটা কি?
নামটা আমি কয়েক মাস আগে প্রথম শুনি, জীবনে ভোলার নয় এমন একটা পরিস্থিতিতে, কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করল ব্যারনেস। আমার স্বামী কিডন্যাপ হলেন, তারপর কিভাবে তাকে খুন করা হলো, সমস্ত ঘটনা জানেন আপনি? দরকার না হলে সব আবার নতুন করে মনে করতে চাই না।
আমি জানি।
জানেন, মুক্তিপণের টাকা আমি নিজে গিয়ে দিয়ে আসি?
হ্যাঁ।
রঁদেভো ছিল ঈস্ট জার্মান বর্ডারের কাছে পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ড। হালকা দুই ইঞ্জিনের একটা রাশিয়ান প্লেন নিয়ে অপেক্ষা করছিল ওরা, রঙ প্রে করে মার্কিংগুলো মুছে ফেলা ছিল। বুক ভরে বাতাস নিলেন ব্যারনেস। পিটারের মনে পড়ল, বোয়িং সেভেন-জিরো-সেভেন হাইজ্যাক করার প্ল্যানেও কোনো খুঁত ছিল না এবং হাইজ্যাকাররা স্পেশাল টাইপের ইকুপমেন্ট ব্যবহার করেছে। অল্টম্যানকে যারা কিডন্যাপ করেছিল তাদের সাথে হাইজ্যাকারদের অনেক মিল আছে, চারজন ছিল ওরা, আবার শুরু করল ব্যারনেস। সবাই মুখোশ পরা ছিল। রুশ ভাষায় কথা বলছিল দুজন। বাকি দুজন কোনো কথাই বলেনি। পিটারের মনে পড়ল, রুশ ছাড়াও আরো পাঁচটা ভাষায় ভালো দখল আছে ব্যারনেসের। তার জন্ম পোল্যান্ডে, খুব ছোট থাকতে বাবা তাকে নিয়ে পালিয়ে আসেন। বেশ কিছুসময় ওদের সাথে ছিলাম আমি। রাশিয়ার প্লেন, ভাষা, এ সব নিজেদের আসল পরিচয় গোপন করার জন্যে ব্যবহার করছিল ওরা। অল্প কিছুক্ষণ ছিলাম ওদের সাথে, পঁয়তাল্লিশ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঙ্ক নিয়ে গিয়েছিলাম। কয়েক মিনিট পর ওরা যখন বুঝতে পারল আমার সাথে বা পিছনে পুলিশ নেই, ওরা হাসাহাসি আর ঠাট্টা-তামাশা করতে লাগল। রুশ ভাষায় কথা বললেও ইংরেজি টোনে খলিফা শব্দটা শুনলাম ওদের মুখে। বাক্যটা মনে আছে আমার খলিফা কখনো ভুল করেন না।
