সমীহের একটা ভাব নিয়ে নৈঃশব্দ্য উপভোগ করছে পিটার, ব্যারনেসের সাথে সমান তালে পা ফেলে পাশাপাশি হাঁটতে পারায় খুশি। কাল রাতে বোধ হয় বৃষ্টি হয়েছে এদিকে, সবুজ পাতার ছুঁচালো ডগায় চিকচিক করছে পানি। ছাল ওঠা নগ্ন ওক গাছের কাণ্ডগুলোকে নির্লজ্জ পুরুষ-মূর্তির মতো লাগছে। এখান থেকে ক্রমশ উঁচু হতে শুরু করেছে মাটি। কোথাও না থেমে খোলা একটা ঢালের মাথায় বেরিয়ে এল ওরা। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে একটু হাঁপাচ্ছে ব্যারনেস, আরো গোলাপি হয়ে গেছে মুখের চেহারা। কিন্তু ক্লান্ত নয় মোটেও। প্রায় হনহন করে সোয়া ঘণ্টা হাঁটার পর এই প্রথম থামল ওরা। কোনো সন্দেহ নেই, ভাবল পিটার, শরীরটাকে ফিট রেখেছে।
ওই দেখুন। পাহাড়ের মাথা ঘিরে থাকা ঘাস মোড়া বৃত্ত আকারের গর্তের দিকে হাত তুলল পিটার। তেমন আহামরি কিছু নয়, হতাশ হতে পারেন ভেবে ইচ্ছে করেই আগে আপনাকে সাবধান করিনি।
এই প্রথম হাসল ব্যারনেস। এখানে আমি আগেও এসেছি, সেই প্রলম্বিত, শ্রুতিমধুর কণ্ঠস্বর।
তার মানে প্রথম সাক্ষাতেই পরস্পরকে আমরা ধোঁকা দিলাম। মৃদুশব্দে হেসে উঠল পিটার।
প্যারিস থেকে এত দূর এলাম, অকারণে নয়, অনেকটা যেন ব্যাখ্যা দেয়ার সুরে বলল ব্যারনেস। স্যার স্টিভেনের সাথে ব্যবসা নিয়ে টেলিফোনেও কথা বলতে পারতাম। কিন্তু বুঝলাম, আপনার সাথে আমাকে মুখোমুখি কথা বলতে হবে। স্যার স্টিভেনকে অনুরোধ করলাম, বললেন সম্ভব-তার কথা আপনি নাকি ফেলতে পারবেন না।
আপনার মতো সুন্দরী ভদ্রমহিলা আমার ব্যাপারে আগ্রহী…
ভ্রু কুঁচকে উঠল সামান্য, সাথে সাথে পিটারকে থামিয়ে দিল ব্যারনেস। এমন খোলামেলা প্রশংসা শুনতে অভ্যস্ত নয় সে। নার্সকোর শাখা, সেডলার স্টিল কোম্পানির একটা প্রস্তাব আপনি প্রত্যাখ্যান করেছেন, স্টিলের সেলস ডিভিশনের হেড। মাথা ঝাঁকাল পিটার। থোর কমান্ড থেকে পদত্যাগের পর এ ধরনের অনেক প্রস্তাবই দেয়া হয়েছে ওকে। প্রস্তাবগুলোয় আপনাকে সন্তুষ্ট করার সব রকম সুযোগ-সুবিধে ছিল বলেই আমার ধারণা।
সেটা সত্যি।
সম্ভবত, একাডেমিক জীবন পছন্দ করেন আপনি, নাকি? জানতে চাইল ব্যারনেস। যদিও পিটারের মুখাবয়ব পাল্টাল না, কিন্তু ও অত্যন্ত অবাক হলো। কেমন করে আমেরিকার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক সামরিক ইতিহাস বিষয়ক বিষয়ের লেকচারারের অফারটা এই মেয়ে জানলো?
আমি কিছু বই পড়তে ও লিখতে চাই। অবশেষে জানাল পিটার।
বই। আপনার দারুণ সংগ্রহ আছে, আমি জানি। আপনার লেখা বই আমি পড়েছি। বেশ পরস্পরবিরোধী মানুষ আপনি, জেনারেল স্ট্রাইড-একদিকে সোজাসুজি অ্যাকশন; আবার গভীর রাজনৈতিক জ্ঞান রাখেন।
আমি নিজেও মাঝেমধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে যাই, পিটার হাসে। তাহলে বলুন, কেমন করে আপনি আমাকে বুঝবেন?
ম্যাগডা কিন্তু হাসল না। আপনার লেখার অনেক চিন্তাধারা আমার সাথে মিলে যায়। আর অ্যাকশনের কথা যদি বলেন–আপনার অবস্থানে থাকলে আমিও এই করতাম।
একটু শক্ত হয়ে যায় পিটার। আবারো সেই বোয়িং ০৭০-র ঘটনা। ওর অস্বস্তি টের পায় ম্যাগডা।
আমি আপনার পুরো ক্যারিয়ারের কথাই বলছি। জোহানেসবার্গ থেকে সাইপ্রাস এবং আয়ারল্যান্ড। এবারে একটু শিথিল হলো পিটার।
নার্সকোর প্রস্তাব আপনি ফিরিয়ে দিলেন কেন?
প্রস্তাবের লোভনীয় দিকগুলো এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, ভাবটা যেন লুফে না নিয়ে উপায় থাকবে না আমার, বলল পিটার। আরো একটা কারণ আছে। মনে হচ্ছিল, বোয়িং ঘটনার মতো কিছু আমার থেকে আশা করে বলেই অমন একটা প্রস্তাব করা হয়েছিল আমাকে।
বোয়িং ঘটনার মতো—কি? একটু ঝুঁকে আসে ম্যাগডা। অদ্ভুত একটা সুগন্ধি পায় পিটার। চমৎকার স্বাস্থ্যের অধিকারিণী একজন নারী ওর সামনে। যেন সতেজ একটা লেবু। পিটার টের পায়, একটু একটু করে শারীরিক আকর্ষণ বোধ করছে সে। সম্ভবত, এমন কোনো দায়িত্ব যাতে জোরজারি করে পথ তৈরির ব্যাপার আছে। পিটার জবাব দেয়।
কি মনে হয়, কি করতে বলা হবে আপনাকে?
এবারে কাঁধ ঝাঁকায় পিটার। জানি না। হতে পারে, ন্যাটোতে আমার কলিগদের কাছে ঘুষের প্রস্তাব, যাতে করে নামকোর প্রডাক্ট কিনতে রাজি হয়। তারা।
কেন এমন মনে হলো?
একটা কমান্ডের প্রধান ছিলাম আমি।
শীতের মাঠের দিকের তাকিয়ে থাকে ম্যাগডা।
আপনি কি জানেন, অল্টম্যান ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে সেডলার স্টিল কোম্পানির একটা বড় শেয়ার আমি নিয়ন্ত্রণ করি এবং নার্মকোর, অবশ্যই?
না, পিটার স্বীকার করে। কিন্তু মোটেও অবাক হচ্ছি না।
জানেন কি, নার্মকোর অফারটা ব্যক্তিগতভাবে আমি পাঠিয়েছিলাম?
এবারে পিটার কোনো কথা বলল না।
একটা কথা ঠিক, ন্যাটো এবং ব্রিটিশ হাইকমান্ডে আপনার বন্ধু-বান্ধব আছে বলেই আপনাকে অবিশ্বাস্য রকম মোটা বেতন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। হঠাৎ ঠোঁট টিপে হাসল ব্যারনেস, সাথে সাথে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল তার গোলাপি চেহারা। আমরা একটা ক্যাপিটালিস্টিক সোসাইটিতে বাস করছি, জেনারেল স্ট্রাইড। এমনকি বেতনভুক কর্মচারীকেও আমরা কমিশন আর ইনট্রডিউসার ফিস দিয়ে থাকি।
ওগুলোর জন্যে নয়, হাসিটা সংক্রামক বলে পিটারেরও হাসি পেল।
তবে লকহীড কেলেঙ্কারির পর আমরা আর কাউকে টাকা বহন করতে দেই না, কমিশন দেয়ার সিস্টেমও তুলে দিয়েছি। কেউ আপনাকে সনাক্ত করতে পারত না।
