মুগ্ধ বিস্ময়ে পিটারের অভিভূত হবার আরো অনেক কারণ আছে। ও জানে, ব্যারনেস অল্টম্যান তার এই অল্প বয়েসেই অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিশাল এক শক্তিশালী সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী সে। আধুনিক দুনিয়ার যার ভাগ্যনিয়ন্তা, যারা পৃথিবীখ্যাত ব্যক্তিত্ব, তারাও তার সঙ্গ পেলে কৃতাৰ্থ বোধ করেন। সরাসরি পিটারের ওপর চোখ বুলিয়ে সে যেন ওর পৌরুষদীপ্ত অস্তিত্বকে ক্ষীণ একটু বিদ্রূপ করছে কিংবা কৌতুক বোধ করছে। চেহারায় রানী বা দেবীসুলভ নির্লিপ্ত ভাব যেন তার ন্যায্য পাওনা।
তার সম্পর্কে যা যা জানে এক মুহূর্তে সব মনে পড়ে গেল পিটারের।
প্রথমে ব্যারনের প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিল ম্যাগডা, পাঁচ বছর কাজ করার পর ব্যারনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ওঠে সে। তার নিপুণ কর্মকুশলতা, দক্ষতা, নিষ্ঠা, অধ্যবসায়, আর আন্তরিকতা লক্ষ্য করে ব্যারন তাকে ধাপে ধাপে তুলে আনেন, ডিরেক্টরদের একজন বানানো হয় তাকে। প্রথমে তিন-চারটে ছোটখাটো গ্রুপ অভ ইন্ডাস্ট্রি পরিচালনার দায়িত্ব, তারপর সেন্ট্রাল হোল্ডিং কোম্পানির অসীম ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া হয় তার হাতে। দুরারোগ্য ক্যানসারে দীর্ঘদিন ভুগেছেন ব্যারন, সে সময় তিনি আরো বেশি করে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন ম্যাগডার ওপর। দেখা গেল, তিনি তার বিশ্বাস অপাত্রে ঢালেননি। একাধিক হেভি ইন্ডাস্ট্রি, ইলেকট্রনিক্স আর আর্মামেন্টস করপোরেশন, ব্যাঙ্কিং, শিপিং, প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট–সবগুলো জটিল ব্যবসা নিপুণ দক্ষতার সাথে চালিয়ে গেল সে। আটান্ন বছর বয়সে বিয়ে করলেন তিনি, ম্যাগডার নতুন পরিচয় হলো ব্যারনেস অল্টম্যান।
তার বয়স তখন উনত্রিশ। দেখা গেল শুধু ব্যবসায়ী হিসেবে নয়, স্ত্রী হিসেবেও ম্যাগডার জুড়ি পাওয়া ভার।
মুক্তিপণের বিশাল অঙ্কের টাকা কিডন্যাপারদের হাতে তুলে দেয়ার জন্যে একাই গিয়েছিল ব্যারনেস অল্টম্যান, ফ্রেঞ্চ পুলিশের বারণ কানে তোলেনি। কিডন্যাপাররা ছিল নির্মম খুনি–কিন্তু স্বামীকে ফিরে পাবার জন্যে নিজের জীবনের ওপর ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করেনি সে। মুক্তিপণের বিনিময়ে স্বামীকে নয়, তার ক্ষতবিক্ষত লাশ নিয়ে ফিরে আসে সে। শোকে অস্থির হলেও, কর্তব্য-কর্ম থেকে সরে দাঁড়ায়নি সে, স্বামীকে সমাধিস্থ করার সমস্ত আয়োজন নিজে দেখাশোনা করেছে। তারপর নিহত স্বামীর শিল্প-সাম্রাজ্যের হাল ধরেছে আগের চেয়ে আরো দক্ষ এবং শক্ত হাতে।
ম্যাগডা অল্টম্যানের হাতের ওপর ঝুঁকে পড়ল পিটার, পলকের জন্যে তার মসৃণ, ঠাণ্ডা আঙুলে ঠোঁট ছোঁয়াল। এখন ওর বয়স একত্রিশ হবে। অনামিকায় হীরে বসানো একটা আংটি পরেছে সে, সাদা পাথরটা থেকে রঙহীন আগুনের মতো দ্যুতি ছড়াচ্ছে। শুধু বিত্ত-বৈভব নয়, এই নারীর মধ্যে উন্নত রুচি আর সৌন্দর্যবোধেরও বিকাশ ঘটেছে। সিধে হবার সময় উপলব্ধি করল পিটার, ম্যাগডা অল্টম্যানও সতর্কতার সাথে ওর সবকিছু খুঁটিয়ে লক্ষ্য করছে। পান্নার ছড়ানোর বড় বড় চোখ, কিছুই যেন তার দৃষ্টি থেকে লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
ইদানীং খুব নাম শোনা যাচ্ছে আপনার, বলল ম্যাগডা, যেন কৌতূহলী দৃষ্টির ব্যাখ্যা দিল।
লাঞ্চের আয়োজন মোলোজনের জন্যে। স্টিভেন আর প্যাটের তিন ছেলেমেয়ে; মেলিসা রয়েছে। হাসিখুশি পরিবেশ, সবার সামনে সুস্বাদু খাবারের ছোটখাটো পাহাড় কিন্তু ব্যারনেস এমন একটা সীটে বসেছে যে সরাসরি তার সাথে কথা বলার সুযোগ হলো না পিটারের। তার কথা শোনার জন্যে সারাক্ষণ কান খাড়া করে রাখলেও, অত্যন্ত নিচু গলায় স্টিভেন আর একটা জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকের সাথে দু-চারটে কথা বলল সে, ওরা দুজন তাকে মাঝখানে নিয়ে বসে। বাঁ দিকে বসেছে সোনালি চুলো এক সুন্দরী–বিয়ে করা, ডিভোর্সে তার কোনো জুড়ি নেই। চোখ ধাঁধানো রূপ দিয়ে পিটারকে মুগ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে বেচারি। এটা নিঃসন্দেহে প্যাট্রিসিয়ার কাজ। বারো বছর হলো পিটারের বিয়ে ভেঙেছে–কিন্তু হাল ছাড়েনি সে।
চোরাচোখে ব্যারনেসকে বারবার লক্ষ্য করছে পিটার। বেশ কয়েকবার ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিল ম্যাগডা, কিন্তু ওয়াইনের লেভেল যেমন ছিল তেমনি থাকল, নিচে নামল না। প্লেটের খাবারও খুঁটে খুঁটে অতি সামান্যই খেল সে। পিটার চুপিচুপি তাকালেও, ব্যারনেস ভুলেও একবার পিটারের দিকে তাকাল না। একেবারে শেষ সময়, যখন ওরা কফি খাচ্ছে, হঠাৎ ওর পাশে চলে এসে বলল সে, স্যার স্টিভেন আমাকে বলছিলেন, এস্টেটে নাকি রোমান ধ্বংসাবশেষ আছে?
বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে অনেকটা দূর যেতে হয়, বলল পিটার। আমি আপনাকে নিয়ে যেতে পারি।
ধন্যবাদ। কিন্তু তার আগে স্যার স্টিভেনের সাথে কিছু ব্যবসার কথা আছে আমার। আমরা কি তিনটের সময় রওনা হতে পারি?
কাপড় পাল্টে টুইডের ঢোলা স্কার্ট আর জ্যাকেট পরে এল ব্যারনেস, খাটো কেউ পরলে তাকে মোটা দেখাত। কাপড়ের মতো হাই বুট জোড়াও ব্রাউন। জ্যাকেটের নিচে পরেছে গোল গলা কাশ্মীরী জার্সি, একই সূক্ষ্ম উলের তৈরি স্কার্ফটা পিঠে ঝুলে আছে। চওড়া কানিসসহ হ্যাঁটের ব্যান্ডে উজ্জ্বল পালক, চোখ প্রায় ঢেকে রেখেছে।
নিঃশব্দে হাঁটছে সে, হাত দুটো জ্যাকেট-পকেটের গভীরে ঢোকানো, কাদা বা ভেজা পাতা থেকে বুট জোড়া বাঁচানোর কোনো চেষ্টা নেই। লম্বা পা ফেলে হাঁটার মধ্যে বাতাস কেটে ভেসে চলার একটা ভাব আছে, নিতম্বের কাছ থেকে ওপরের অংশটুকু অদ্ভুত এক ছন্দে দোল খায়, এবং তার ফলে পিটারের মতো হতে লাগল ওর পাশে ব্যারনেসের মাথাটা যেন ভাসছে। ফাইন্যান্স আর ইন্ডাস্ট্রির জগতে মেয়েটা যদি সম্রাজ্ঞী নাও হতো, কোনো সন্দেহ নেই, সাড়া জাগানো মডেল হতে পারত অনায়াসে। কাপড় দিয়ে সাজিয়ে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা এবং চেহারায় দুর্লভ আভিজাত্য ফুটিয়ে তোলায় ভারি দক্ষ, সেই সাথে পরিচ্ছদের প্রতি নির্লিপ্ত অবহেলা অকৃত্রিম একটা সারল্য ফুটিয়ে তুলেছে।
