সবাই কি যাচ্ছেতাই বলছে তোমাকে নিয়ে, ড্যাডি। আমি বিশ্বাস করি না।
ধন্যবাদ। কিছুসময় চুপ রইল ওরা দুজন।
পিটারই নীরবতা ভাঙে।
তুমি নাকি একজন প্যালিয়েন্টোলজিস্ট হবে–সে বলে।
না। সেটা গতমাসের সিদ্ধান্ত। এখন আর মাটি থেকে খুঁড়ে আনা হাড় নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই আমার। আমি ডাক্তার হব। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ।
দারুণ! সায় দেয় পিটার। কিন্তু এখন যাওয়া উচিত। এখানে আর বেশিক্ষণ থাকলে ঠাণ্ডায় জমে যাব যে! পাশাপাশি ঘোড়া চালিয়ে ফিরে চলল ওরা দুজন। পিটারের মাত্র তিন ঘণ্টার বড় ভাই স্টিভেন সমস্ত রক্ষণাবেক্ষণ করে এখানকার।
একটু পরই লাল ইটের বাড়িটা দেখা গেল, তিন একর জায়গা নিয়ে বিশাল ছাদ। বাড়ির সামনে পাথুরে উঠান, পশ্চিম প্রান্তে আস্তাবল। ঘোড়া থেকে নেমে ঘাড় ফেরাতেই খোলা গ্যারেজগুলোর দিকে চোখ পড়ল পিটারের। নতুন মডেলের দুটো গাড়ি রয়েছে বাড়ির সামনে, তার মধ্যে একটা মার্সিডিজ সিক্স হানড্রেড, চকচকে রুপালি লিমোজিন। পপ স্টার, আরব শেখ কিংবা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রিরা ব্যবহার করে এমন জিনিস। আরেকটা আকৃতিতে অপেক্ষাকৃত ছোট্ট। গাড়ির পাশে বনেদি পোশাকের দুজন লোক টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কঠিন চেহারা। দেহরক্ষী।
গাড়িগুলো দেখতে পেয়ে চোখ উল্টাল মেলিসা। আবারো সেই অপদার্থ পয়সা-অলা লোজন। মেয়েকে ঘোড়া থেকে নামতে সাহায্য করল পিটার। হাত ধরাধরি করে গোলাপের বাগানের ভিতর দিয়ে এগিয়ে গেল ওরা দুজন। প্রধান ড্রইংরুমে প্রবেশ করল।
পিটার, ওল্ড বয়! অতিথিদের ফেলে লম্বা পায়ে এগিয়ে এল স্টিভেন। প্রায় পিটারের সমান লম্বা সে, একসময় বেশ পাতলা ছিল কিন্তু আরাম-আয়েশ তার মধ্যে ঢিলেঢালা ভাব এনে দিয়েছে। ব্যবসায়ীর পরিচয় পাওয়া যায় রুপালি চুলের গাছি আর পেকে যাওয়া গোঁফে। অবশ্য, পিটারের জমজ ভাই হিসেবে এখনো মিল পাওয়া যায়। এই মুহূর্তে আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে আছে তার চেহারা।
এবারে ভাতিঝির দিকে ফিরে আলিঙ্গন করল স্টিভেন।
কি খবর, আমার ফ্লোরেন্স নাইটঙ্গেলকে মনে ধরেছে? জানতে চাইল সে।
দারুণ, আঙ্কল স্টিভ! খুব ভালো ঘোড়া ওটা। মেলিসা নিজের মতামত জানায়।
পিটার, এসো, তোমার সাথে এক বিশিষ্ট ভদ্রমহিলার পরিচয় করিয়ে দিই।
স্টিভেনের স্ত্রী, প্যাট্রিসিয়া স্ট্রাইডের সাথে আলাপ করছিল মেয়েটা। ঘুরে তাকাতেই জানালা দিয়ে আসা নরম রোদ উজ্জ্বল হয়ে জ্বলল অবয়বে।
পিটারের মনে হলো পায়ের তলায় ধরণী কাত হয়ে পড়ছে, দুপাশের পাজরে কিসের একটা তীব্র চাপ অনুভব করে দম আটকে এল ওর।
দেখামাত্র তাকে চিনতে পারল পিটার। কিডন্যাপাররা অনেক দিন ধরে আটকে রেখেছিল ওর স্বামীকে, তারপর খুন করে। অফিশিয়াল ফাইলে স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই অনেক ফটো ছিল। একটা পর্যায়ে বিশ্বাস করার কারণ ঘটেছিল কিডন্যাপাররা ব্যারন ভদ্রলোককে নিয়ে ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে, প্রায় এক সপ্তা কন্ডিশন আলফাতে ছিল থোর কমান্ড। ছবিগুলোর মধ্যে কয়েকটা ছিল ভোগ পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করা, দক্ষ পেশাদার ক্যামেরাম্যানের নিপুণ শিল্পকর্ম, বহু রঙা ঝলমলে ছবি। কিন্তু সে সব পেশাদার ছবিও, রূপবতীর প্রতি অবিচার করা হয়েছে, রূপের মহিমা বা ব্যক্তিত্বের আকর্ষণীয় দিকগুলো সিকিভাগও ফোটেনি।
সামান্য অবাক এবং অকারণ পুলকের সাথে পিটার লক্ষ্য করল, ওকেও চিনতে পেরেছে সে। মেয়েটার মুখের ভাব বদলাল না, শুধু গাঢ়-সবুজ পান্নার মতো পলকের জন্য দীপ্তি ছড়াল চোখ জোড়া। এখনো তার দিকে হাঁটছে পিটার, কাছাকাছি হয়ে বুঝতে পারল মেয়েটা বেশ লম্বা, কিন্তু দেহ-সৌধে কোনো খুঁত না থাকায় সাথে সাথে তা বোঝা যায় না। সূক্ষ্ম উলের তৈরি একটা স্কার্ট পরে আছে সে, নর্তকীর মতো লম্বা পা দুটো বেশিরভাগই অনাবৃত।
ব্যারনেস, মে আই প্রেজেন্ট মাই ব্রাদার-জেনারেল স্ট্রাইড।
হাউ ডু ইউ ডু, জেনারেল। প্রায় নিখুঁত ইংরেজি বলতে পারে সে, শ্রুতিমধুর কণ্ঠস্বর, ইংরেজি তার জন্যে বিদেশি ভাষা বলেই সম্ভবত সুর একটু প্রলম্বিত, পিটারের পদটা সে উচ্চারণ করল তিন ভাগে—জেনারেল।
পিটার, দিস ইজ ব্যারনেস অল্টম্যান।
চকচকে কালো চুল এমনভাবে ব্যাকব্রাশ করা, টান টান হয়ে আছে কপালের চামড়া। পিছন দিকে নিয়ে গিয়ে লম্বা চুলগুলো বিনুনি করা হয়েছে, তারপর কান জোড়ার ওপর মাথার দুপাশে উঁচু করে বাঁধা হয়েছে দুটো খোঁপা। উঁচু চোয়ালের স্লাভিক গড় সহজেই টের পাওয়া যায়, চেহারায় দৃঢ় মানসিকতার একটা ভাব এনে দিয়েছে। চোখ জুড়িয়ে যায় গায়ের রঙ দেখলে, নির্মল হালকা গোলাপি কিন্তু তার থুতনি সামান্য চৌকো এবং একটু যেন শক্ত, সৌন্দর্য নিখুঁত হবার পথে ছোটখাটো হলেও একটা বাধা বটে। কমনীয় চেহারা, কিন্তু কোমলতার চেয়ে কাঠিন্যই যেন বেশি। মেয়েটা বিশ্বসুন্দরী হতে পারবে না, কিন্তু প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলে কেউ তার দিক থেকে চোখ ফিরিয়েও থাকতে পারবে না। যা সাধারণত হয় না, প্রচণ্ড আকর্ষণ বোধ করল পিটার। কয়েক মুহূর্তে নিজের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে থাকল ও। একটা মেয়ের মধ্যে যা কিছু থাকা সম্ভব, থাকলে সন্তুষ্ট আর পুলকিত হয় হৃদয়, তার মধ্যে যেন সব কিছুই অঢেল রয়েছে।
