কফি শপ থেকে বেরিয়ে রাস্তার মোড় পর্যন্ত হেঁটে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে চলে এল পিটার। কিং ডেভিড হোটেল, ড্রাইভারকে বলল ও, হেলান দিল সীটে।
নিজেকে অভয় দিল পিটার, এখন অন্তত জানা আছে ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার বাস্তব চরিত্র। পরবর্তী ফাঁদে অন্ধের মতো পা দেবে না সে।
.
চেহারায় অসন্তোষ নিয়ে চারদিকে চোখ বুলার পিটার, এই কামরাটাই রিজার্ভ করা হয়েছে ওর জন্যে। হোটেলের পিছন দিকে কামরাটা, রাস্তার ওপারে আকাশছোঁয়া একটা বিল্ডিং, মাত্র পনেরো গজ দূরে। দুটো জানালার যে কোনোটা দিয়ে আসতে পারে স্নাইপারের বুলেট।
কিন্তু আমি তো একটা স্যুইট চেয়েছিলাম, সাথে উঠে আসা রিসেপশন ক্লার্ককে ধমকের সুরে বলর পিটার।
দুঃখিত, স্যার, সবিনয়ে বলল লোকটা। তাহলে নিশ্চয়ই ভুল হয়ে গেছে।
চারদিকে আরেকবার তাকাল পিটার, ভারী ফার্নিচারগুলোর আড়ালে অন্তত দশ-বারোটা জায়গা রয়েছে যেখানে ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার বিস্ফোরক পদার্থ রেখে গিয়ে থাকতে পারে, মার্সিডিজের পর বিকল্প হিসেবে। সাপের খাঁচায় রাত কাটাতে রাজি আছে পিটার, ক্যাকটাস ফ্লাওয়ারের তৈরি পরিবেশের চেয়ে সেটা অনেক নিরাপদ।
পিছিয়ে করিডোরে বেরিয়ে এল ও, তিরস্কার ভরা দৃষ্টিতে তাকাল ক্লার্কের দিকে। শশব্যস্ত হয়ে এলিভেটরের দিকে ছুটল বেচারা, ফিরে এল পাঁচ মিনিটের মাথায়, গালভরা হাসি নিয়ে। নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিল পিটার, জিনিসটা ভারী বিপজ্জনক–এই গালভরা হাসি।
আমাদের সেরা সুইটের একটা, স্যার, এইমাত্র খালি হওয়ায় আপনাকে দেয়া গেল–আসুন, প্লিজ।
একশ বাইশ নম্বর সুইট। জানালা দিয়ে বহুদূর পর্যন্ত উপত্যকা দেখা যায়, ওল্ড সিটির গায়ে জাফা গেটটাও পরিষ্কার নজরে আসে। শহরের মাঝখানে মাথা তুলে আছে লাস্ট সাপার চার্চ।
হোটেলের বাগানে ফুল ফুটে আছে, লনগুলো সবুজ ঘাসে মোড়া, সুইমিং পুলের কিনারায় ছুটোছুটি করে খেলছে শিশুরা।
খোলা একটা টেরেস রয়েছে স্যুইটের সাথে, একা হতেই শাটার বন্ধ করে দিল পিটার, ওদিক দিয়ে খুব সহজেই লোক পাঠাতে পারে ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার। এরপর প্রাইভেট ব্যালকনিতে বেরিয়ে এল পিটার।
বাগানের পাশেই ফ্রেঞ্চ কনসুলেট। দুর্গ আকৃতির একটা বাড়ি। বাড়ির পাশে অস্ত যাচ্ছে সূর্য। সুইটের নিরাপত্তা নিয়ে আবার চিন্তা করল পিটার।
পাশের সাইট থেকে অনায়াসে একজন লোক ওর ঝুল-বারান্দায় চলে আসতে পারবে, শুধু যদি আটতলার জানালার কার্নিসে পা রাখার সাহস থাকে। কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করল পিটার, তারপর সিদ্ধান্ত নিল ঝুল-বারান্দার শাটার বন্ধ করবে না। সবদিক বন্ধ একটা জায়গায় নিজেকে আটকে রাখলে হীতে বিপরীতও ঘটতে পারে।
পর্দা টেনে দিল পিটার, তারপর রুম সার্ভিসকে ফোনে ডেকে হুইস্কি আর সোর্ডার অর্ডার দিল। দরকার, খুব ধকল গেছে সারাটা দিন।
টাই আর শার্ট খুলল পিটার; তারপর চুল, গোঁফ আর দাড়ি। বাথরুমে ঢুকে সাবান দিয়ে মুখ ধুলো। তোয়ালে দিয়ে পানি মুছছে, টোকা পড়ল দরজায়।
রুম সার্ভিস? কিন্তু এত তাড়াতাড়ি? ব্যস্ত হতে উইগটা মাথায় চাপিয়ে লাউঞ্জে বেরিয়ে এল পিটার, কানে চাবির আওয়াজ পেল না, অথচ হাতল ঘুরে যাচ্ছে, পরমুহূর্তে দড়াম করে খুলে গেল কবাট। ঝট করে তোয়ালাটা মুখে তুলে ফেলেছে পিটার, ভান করল এখনো মুখ মোছা শেষ হয়নি–গোঁফ দাড়ি নেই সেটা গোপন করা সম্ভব হলো কোনো রকমে।
ভেতরে এসো, ভোয়ালের ভেতর থেকে ভোতা আওয়াজ বেরুল।
স্যার স্টিভেন?
দোরগোড়ার সামনে স্থির পাথর হয়ে গেল পিটার, গলার আওয়াজটা যেন পিষে দিল হৃৎপিণ্ডকে, মাঝখানে থামিয়ে দিল নিঃশ্বাস।
পুরুষের বুক খোলা শার্ট পরেছে সে, বুকের দুপাশ ঢাকনি সহ ছোটো পকেট। কোমর আর ঊরুতে আঁটসাঁট হয়ে আছে খাকি কমব্যাট ট্রাউজার, পায়ে নরম সোলের ক্যানভেস বুট।
স্যার স্টিভেন, পিছনে দ্রুত বন্ধ করে দিল দরজা, তার তালুতে সরু আর লম্বা একটা ইস্পাতের টুকরো দেখল পিটার, ওটা দিয়েই তালা খুলেছে সে। চোখ থেকে তোয়ালে সরান, এদিকে তাকান–আমি ব্যারনেস অল্টম্যান। আপনি মারাত্মক বিপদে আছেন, আমি আপনাকে সাবধান করতে এসেছি… সদ্য কাটা কোঁকড়া কালো চুলের মাঝখানে তার মুখ তাজা ফুলের মতো কোমল আর স্নিগ্ধ। এই মুহূর্তে ইসরাইল ত্যাগ করতে হবে আপনাকে। কাছাকাছি একটা এয়ারফিল্ডে আমার লিয়ার জেট আছে… তার বিশাল সবুজাভ চোখে দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা।
কথা বলার জন্যে তোয়ালে একটু নামাল পিটার। এ-সব কথা কেন বলছেন আমাকে, বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করল ও। আপনার কথা আমি বিশ্বাসই বা করব কেন?
পিটার দেখল, এক নিমেষে রাগে লালচে হয়ে উঠল ব্যারনেসের চেহারা।
আপনি বোকার মতো এমন জিনিসে নাক গলাচ্ছেন, হুঁশ ফেরার পর দেখবেন ওটা আর নেই।
আমাকে সাবধান করে আপনার কি লাভ, ব্যারনেস অল্টম্যান?
কারণ…,ইতস্তত করল ব্যারনেস, তারপর বলল, …কারণ আপনি পিটারের বন্ধু। শুধু এই একটা কারণে আমি চাই না আপনি খুন হয়ে যান।
হাত থেকে তোয়ালে ছেড়ে দিল পিটার, ঝটকা দিয়ে মাথা থেকে ফেলে দিল পরচুলা।
নো! ইমপসিবল! ওহ্ গড়, ইয়েস, ইটস ট্র! দুই সেকেন্ডে কয়েকবার ব্যারনেসের চেহারা বদলে যেতে দেখল পিটার–প্রথমে ফ্যাকাসে হয়ে গেল, তারপর অবিশ্বাসের ছায়া পড়ল, সবশেষে আনন্দে বিকৃত হয়ে উঠল। মনে হলো বিস্ময়ের ধাক্কায় পঙ্গু হয়ে গেছে সে, পিটারের দিকে ঝপিয়ে পড়ার ভঙ্গি করেও স্থির হয়ে থাকল, সেই শ্রুতিমধুর প্রলম্বিত সুরে বিড়বিড় করে চলেছে। পিটার, মাই লাভ…ওহ গড, ইটস্ ট্র!
