ঈশ্বর। পিটার উপলব্ধি করল, তাজা বোমার ওপর বসে রয়েছে সে। ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার সম্ভবত নিজে সব আয়োজন করেছে। ব্যারনেস ম্যাগডা যদি খলিফা না হয়, তাহলে ক্যাকটাস ফ্লাওয়ারের পাতা মরণ ফাঁদে আটকা পড়তে যাচ্ছে ও।
ঘড়িটা এখনো টিকটিক করে যাচ্ছে। কোমল, একঘেয়ে শব্দে বাড়ি মারছে। নার্ভে।
আমি ক্যাকটাস ফ্লাওয়ারের শহরে রয়েছি, তার গাড়িতে…
টিকটিক! ওহ গড! ড্যাশবোর্ড থেকে আসছে না। ঝট করে ঘাড় ফেরাল পিটার। আসছে ওর পিছন থেকে। বুট থেকে। ড্রাইভার খুলেছিল ওটা, কি যেন নাড়াচাড়া করেছিল। সেটা থেকেই আসছে আওয়াজটা, টি কিট টিক টি…
খপ করে ধরে হাতল ঘোরাল পিটার, একই সাথে কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দিল দরজার গায়ে, অপর হাতে চলে এসেছে ব্রিফকেসের হ্যান্ডেল।
বুট আর ব্যাকসীটের মাঝখানে ধাতব পার্টিশন থাকার কথা, নির্ঘাত সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বোমা আর সীটের মাঝখানে সম্ভবত মোটা চামড়া ছাড়া আর কিছুই নেই। সেজন্যেই বোধ হয় কানে এত বাজছে আওয়াজটা।
মার্সিডিজ থেকে বেরিয়ে হোঁচট খেতে খেতে ছুটল পিটার। জিনিসটা সম্ভবত প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ, ডিটোনেটরে টাইমার লাগানো আছে। কতক্ষণ পর বিস্কোরণ ঘটাতে চাইবে ওরা? ত্রিশ সেকেন্ড? না, আরো বেশি-ড্রাইভারকে নিরাপদ দুরত্বে সরে যেতে দিলে হবে। ছোকরা বলল, দুমিনিট, দুবার বলেছে কথাটা…।
ফুটপাথে উঠে লাফ দিয়ে মাটিতে নামল পিটার, ঝোঁপ-ঝাড় পেরিয়ে যতটা সম্ভব দূরে পালাচ্ছে। মিনিট দুয়েকই হয়েছে সরে গেছে ড্রাইভার…।
দশ কদম সামনে নিচু একটা পাঁচিল, ঘেরের মধ্যে ফুলবাগান করার জন্যে তৈরি করা হয়েছিল। হাঁটু সমান উঁচু, দুটো করে ইট পাশাপাশি রেখে গাঁথা হয়েছে, ঘেরের মধ্যে মাটির ঢেলা আলগা হয়ে আছে। ডাইভ দিয়ে পাঁচিলটা পেরোল পিটার, আলগা মাটির ওপর কাঁধ আর কনুই দিয়ে পড়ল, দুটো গড়ান দিয়ে ধাক্কা খেল দ্বিতীয় পাচিলের গায়ে।
ওর মাথার ওপর একতলা অ্যাপার্টমেন্টের বড় বড় জানালা, মাটিতে পাজর ঠেকিয়ে ওগুলোর দিকে তাকাল পিটার, কাঁচের ওপর মার্সিডিজের ঝকঝকে প্রতিবিম্ব দেখতে পেল।
দুহাতের তাল দিয়ে কান ঢাকল পিটার, মার্সিডিজ মাত্র পঞ্চাশ ফিট দূরে। বুকের দুপাশে কনুই, মুখ যতটা সম্ভব খোলা, বিস্ফোরণের ধাক্কা সামলাবার জন্যে তৈরি হলো পিটার।
স্লো-মোশন ছবিতে যেভাবে ধীরে ধীরে পাপড়ি মেলে গোলা, মার্সিডিজটা ঠিক সেভাবে ধীরে ধীরে খুলে গেল। চকচকে মেটাল ফাঁক হলো, দুমড়েমুচড়ে কুঁকড়ে গেল অদ্ভুত দর্শন পাপড়ির মতো, ভেতর থেকে স্যাৎ করে বেরিয়ে এল লাল-জিভ আগুন। তারপরই দৃশ্যটা হারিয়ে গেল, চুরচুর হয়ে খসে পড়ল সব কটা জানালার কাঁচ। সেই সাথে বিস্ফোরণের ধাক্কা থেঁতলে দিয়ে গেল পিটারকে।
মনে হলো কোনো দৈত্য ওর পাঁজরে পা রেখে চাপ দিয়েছে, সমস্ত বাতাস হুস করে বেরিয়ে গেল ফুসফুস থেকে। প্রচণ্ড ঝাঁকিতে ঘাড় থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল খুলি। পিটারের ধারণা হলো, কিছুক্ষণ হুঁশ ছিল না তার। অনুভব করল কাঁচের টুকরো, প্লাস্টার, টুকরো কাঠ বৃষ্টির মতো পড়ছে গায়ে, বড় আর ভারী কি যেন একটা শিরদাঁড়ার ওপর আঘাত করল, ব্যথায় গুঙিয়ে উঠল ও।
পিঠে একটা হাত রেখে দাঁড়াল ও। চারদিকে কিছুই নড়ছে না, অথচ মনে হলো তুমুল ঝড় বইছে। টলমল করতে করতে সিধে হলো, ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে ভরে নিচ্ছে ফুসফুস। জানে পুলিশ চলে আসার আগেই সরে যাওয়া দরকার, কিন্তু পা নড়ছে না। হঠাৎ উপলব্ধি করল ওর দৌড়াতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু চেষ্টা করলে শুধু বোধ হয় হাঁটতে পারবে। বিস্ফোরণের ধাক্কা এখনো সামলে উঠতে পারেনি শরীরটা, এই মুহূর্তে একে দিয়ে কঠিন কাজ করানো সম্ভব নয়।
ধীরে ধীরে ফুটপাথে উঠে এল পিটার। রাস্তা এখনো ফাঁকা, তবে আশপাশ থেকে শোরগোল আর কান্নায় আওয়াজ আসছে। মোড়ে পৌঁছে সরু একটা গলির ভেতর ঢুকল, সেটা থেকে বেরিয়ে এল মেইন রোডে। শোরগোলের আয়োজটা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে এল। বাসের জন্যে লাইন দিয়েছে মানুষ, তাদের পিছনে গিয়ে দাঁড়াল ও।
জাফা রোডে নেমে পড়ল পিটার। বাস স্টপেজের উল্টো দিকে একটা কফি শপ থেকে ভেতরে ঢুকল, এক কিনারায় বসে কাটলেট আর কফি চাইল।
পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে আধঘণ্টা চিন্তা করল পিটার। ইতোমধ্যে একবার টয়লেট থেকে ঘুরে এসেছে–চেহারায় কোনো দাগ নেই। পরচুলা, দাড়ি, আর গোঁফও ঠিকঠাক আছে।
ব্যারনেস ম্যাগডা যদি খলিফা না হয়ে থাকে… এভাবে চিন্তা করার ফলেই শেষ মুহূর্তে বিপদটা দেখতে পেয়েছিল, নতুন একটা জীবন পেয়ে গেছে।
ব্যারনেস ম্যাগডা খলিফা নয়! এখন নিশ্চিতভাবে জানে পিটার। নিজের পরিচয় ফাস হতে যাচ্ছে এ ভয়ে ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার স্টিভেনকে বাধা দিয়েছে, সে যাতে খলিফার কাছে পৌঁছুতে না পারে। তার মানে ব্যারনেস ওকে সত্যি কথাই বলেছে। বিপুল স্বস্তি, প্রায় পুলকের মতো সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। প্রথম যে চিন্তাটা মাথায় এল, এখুনি ম্যাগডার দেয়া মোসাডের নাম্বারে ফোন করবে ও, কথা বলবে তার সাথে। তারপর বিপদটা টের পেল। ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার মোসাড। এই মুহূর্তে ম্যাগডার কাছাকাছি যাওয়া মস্ত বোকামি হবে।
তাহলে কি করবে সে এখন? উত্তরটা খুঁজতে হলো না, তৈরি হয়েই ছিল মনের ভেতর। যা করার জন্যে এসেছে, তাই করবে ও। খলিফার সাথে দেখা করবে, আর দেখা করতে হলে তার পথ ধরেই সামনে বাড়তে হবে ওকে।
