সালোম, সালোম, পিটারকে অভ্যর্থনা জানাল সে। এই একটাই লাগেজ আপনার?
হ্যাঁ।
আপনাকে আমার পছন্দ হয়ে গেল। সবিনয়ে পিটারকে সরে যেতে বলে ট্রলিটা নিজেই ঠেলতে শুরু করল ছোকরা। আসুন। অ্যারাইভাল হল থেকে বেরিয়ে লিমুসিনের দিকে এগোল ওরা। পবিত্র নগরী, আমাদের এই জেরুজালেম… বকবক করে চলেছে অল্প বয়েসী ড্রাইভার।
গাড়িটা দেখে মুগ্ধ হলো পিটার। টু হানড্রেড ফরটি ডি মার্সিডিজ বেঞ্জ, প্রায় আনকোরা নতুন, ঝকঝক করছে। শুধু বুটে কে যেন একজোড়া বিস্ফারিত চোখ এঁকে রেখেছে।
এয়ারপোর্টের গেট দিয়ে বেরিয়ে আসতেই একটা গন্ধ পেল পিটার। ইসরায়েলের এই গন্ধ ওর পরিচিত।
ইসরায়েলের প্রায় প্রতিটি ফুটপাতের পাশে কিছু খালি জায়গা রাখা হয়েছে, সেখানে ফলের চাষ হয়। এখন কমলা পাকার সময়, বাতাসে তারই সুবাস।
কিন্তু ভালো লাগার অনুভূতিটা কেন যেন মিইয়ে এল, অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করল পিটার–মনে হলো কি যেন দেখেও দেখতে পাচ্ছে না, গুরুত্বপূর্ণ কি একটা অবহেলা করছে।
নতুন ডাবল-ওয়ে রোডে উঠে এল মার্সিডিজ, মনের আনন্দে কথা বলে চলেছে, ড্রাইভার, মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করতে পারছে না পিটার। রাস্তাটা পাহাড়ের ওপর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে, দুপাশে পাইন বন, সামনে আরো অনেকটা দূরে জেরুজালেম।
ওরলিতে, হোটেলে বসে, একটা তালিকা তৈরি করেছিল পিটার, সেটা ছিঁড়ে ফেলায় নিজেকে এখন তিরস্কার করল ও। কি কি লেখা ছিল মনে পড়ে কিনা দেখছে।
পক্ষে ছিল বারোটা যুক্তি। তৃতীয়টা মনে পড়ছে;
ব্যারনেস আমাকে ক্যাকটাস ফ্লাওয়ারের কথা জানিয়েছে। সে খলিফা হলে জানাত কি?
বিপক্ষে তৃতীয় যুক্তিটা সাথে সাথে মনে পড়ল;
ব্যারনেস ম্যাগডা যদি খলিফা হয়, তাহলে ক্যাকটাস ফ্লাওয়ারের কোনো অস্তিত্বই নেই। কোনো অজ্ঞাত কারণে ক্যাকটাস ফ্লাওয়ারের অস্তিত্ব মিছিমিছি আবিষ্কার করা হয়েছে।
এই ব্যাপারটাই, এই ক্যাকটাস ফুলের ব্যাপারটাই ওর অস্বস্তি বোধ করার কারণ।
আরো একটা কারণ, ড্রাইভার। ছোকরা মুহূর্তের জন্যেও থামছে না। কেন? শুধু যে বকবক করে চলেছে তাই নয়, খানিক পরপরই ঘাড় ফিরিয়ে পিটারের দিকে তাকাচ্ছে, গাল ভরা হাসি নিয়ে জিজ্ঞেস করছে, তাই না, ঠিক বলিনি?
ভালো করে না শুনেই দু-একবার হু-হু করল পিটার, তারপর শুধু মাথা ঝাঁকাল। কমলার গন্ধ ওকে অস্বস্তির মধ্যে ফেলবে কেন? কারণ কমলার গন্ধ ফুলের গন্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়? ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার? ধ্যেৎ, কষ্টকল্পনা মনে হচ্ছে।
ব্যারনেস যদি খলিফা না হয়, তাহলে… তাহলে কি?
তাহলে ঠিক আছে, তাই না, কোনো অসুবিধে নেই? আবার বিরক্ত করছে। ড্রাইভার।
দুঃখিত, শুনতে পাইনি… কি বলছিলে?
বলছিলাম, আমার শাশুড়িকে একটা প্যাকেট দিয়ে আসতে হবে, আবার ব্যাখ্যা করল ড্রাইভার। আমার বউ পইপই করে বলে দিয়েছে কিনা।
ঠিক আছে, ঝাঝের সাথে বলল পিটার, ছোকরার মধ্যে খারাপ কিছুই নেই অথচ ওর ঠিক পছন্দ হচ্ছে না তাকে। দুশ্চিন্তার কারণটা মন থেকে হারিয়ে গেল। ফাঁকিবাজ সব জায়গাতেই আছে।
এখানে আমরা বাঁক নেব, বলে আকাশছোঁয়া সার সার অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের দিকে গাড়ি ঘোরাল ছোকরা। ইসরায়েল সরকার মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে নাগরিকদের বাসস্থান সমস্যার সমাধান করতে, এ তারই ফলশ্রুতি।
মাইল জুড়ে শত শত ভবন, প্রতিটি ছয়তলা। সন্ধ্যার এই সময় রাস্তা-ঘাট প্রায় ফাঁকা।
সবগুলো ভবন আর রাস্তা একই রকম দেখতে, তবে বোঝা গেল এলাকাটা ভালো করে চেনা আছে ড্রাইভারের। তার আচরণে কোনো জড়তা নেই। দিয়াশলাই বাক্সের মতো দেখতে একটা হলুদ বহুতল ভবনের সামনে গাড়ি থামাল সে।
দুমিনিট, প্রতিশ্রুতি দিয়ে নেমে পড়ল, ছুটে চলে গেল পিছন দিকে। ব্যস্ত হাতে বুট খুলল সে, হিঁচড়ে কি যেন একটা সরাল, মৃদু একটা ঝাঁকি খেল মার্সিডিজ, পরমুহূর্তে বন্ধ হয়ে গেল বুট। আবার পিটারের দৃষ্টি সীমার মধ্যে চলে এল সে, হাতে ব্রাউন রঙের একটা প্যাকেট।
পিটারের মুখের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসল সে, অদ্ভুতদর্শন ক্যাপটা ঠেলে দিল মাথার পিছনে, দাঁত দেখিয়ে বলল, এই গেলাম আর এলাম। দরজার দিকে ছুটে গেল সে।
বললেও, ছোকরা ফিরতে দেরি করতে পারে, ভাবল পিটার। এই মুহূর্তের অটুট নিস্তব্ধতাটুকু অমূল্য মনে হলো। চোখ বুজে গভীর মনোযোগ আনার চেষ্টা করল ও।
ব্যারনেস ম্যাগডা যদি খলিফা না হয়, তাহলে-ইঞ্জিন ঠাণ্ডা হচ্ছে, তার শব্দ পাচ্ছে পিটার। নাকি ড্যাশবোর্ড ঘড়ির আওয়াজ? আওয়াজটা ভুলে থাকার চেষ্টা করল ও।
তাহলে, তাহলে ক্যাকটাস ফ্লাওয়ারের অস্তিত্ব আছে! হ্যাঁ, এই তো, এতক্ষণে ব্যাপারটা ধরা পড়ল। ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার আছে, আর সে যদি থাকে তাহলে খলিফার একেবারে কাছাকাছি আছে, এত কাছাকাছি যে স্যার স্টিভেন স্ট্রাইড যে তার পরিচয় ফাস করে দিতে আসছে, এও তার অজানা থাকার কথা নয়।
শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে গেল পিটারের, সেই সাথে অনুভূতিটা আবার ফিরে এল-চামড়ার নিচে পোকা চলছে। ওর বিশ্বাস ছিল, খলিফার সাথে দেখা না হওয়া পর্যন্ত স্টিভেন নিরাপদ। প্রাণঘাতী একটা ভুল ছিল ওটা।
ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার অবশ্যই খলিফার কাছে পৌঁছুতে বাধা দেবে স্টিভেনকে। হায় হায়, এমন সহজ একটা অঙ্ক ওর মাথায় আগে ঢোকেনি! ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার মোসাড আর পিটার বসে আছে জেরুজালেমে-মোসাডের উঠানে, স্টিভেন সেজে।
