প্লেনের টিকেটের ভাজ খুলল পিটার, গন্তব্যটা দেখতে চায়। পরমুহূর্তে শিরশির করে উঠল শরীর, চামড়ার নিচে যেন বিষাক্ত পোকা ঢুকে গেছে, কিলবিল করছে মন্থরবেগে। লিমুসিন আর হোটেল ভাউচার চেক করার সময় লক্ষ্য করল, ওর হাত কাঁপছে।
সন্দেহ আর অবিশ্বাসের তীক্ষ্ণমুখ কাঁটা আবার ওকে খোঁচাতে শুরু করেছে। অসুস্থ বোধ করল পিটার।
কি হলো, পিটার?
কিছু না, সংবিৎ ফিরে পেয়ে বলল পিটার। প্লেনের টিকেটটা ওরলি থেকে বেন গারিয়, ইসরায়েলে নিয়ে যাবে ওকে। ভাড়াটে গাড়ির ভাউচার ওকে সেখান থেকে নিয়ে যাবে জেরুজালেম, আর শেষ ভাউচারটা প্রাচীন ও পবিত্র নগরীর একটা হোটেলের। কিং ডেভিড হোটেল।
জেরুজালেম, বিড়বিড় করে উঠল ও। খলিফা তোমার সাথে জেরুজালেমে দেখা করবে। আর, পিটার জানে, এই মুহূর্তে একজনই আছে জেরুজালেমে। যাকে বোরা-বোরাতে শেষবার আলিঙ্গন করেছিল পিটার, যার কথা মুহূর্তের জন্যে ভুলে থাকাও ওর জন্যে কষ্টকর।
খলিফা জেরুজালেমে। ব্যারনেস ম্যাগডা অল্টম্যানও জেরুজালেমে।
সত্যিই কি ওকে বোকা বানানো হচ্ছে? বারবার? নাকি এটা খলিফারই একটা কূট-কৌশল? তাহলে কি সবকিছু অভিনয়?
পিটার, কি হলো? উদ্বেগে অস্থির হয়ে কাছে সরে এল স্টিভেন।
মৃদু হাসল পিটার, শোনো, তোমার বদলে আমি যাচ্ছি।
কি! আকাশ থেকে পড়ল স্টিভেন। কোথায়? জেরুজালেমে?
আমরা জায়গা বদল করছি, স্টিভেন, মানে ভূমিকা বদল করছি।
তীব্র প্রতিবাদের সাথে মাথা নাড়ল স্টিভেন। পাগল নাকি! খলিফা তোমাকে মেরে ফেলবে।
প্রতিবাদ কানে না তুলে কাজ শুরু করল পিটার।
ব্রিফকেস খুলে কাপড়, উইগ, দাড়ি, আর গোঁফ বের করল ও, সব নিয়ে বাথরুমে ঢুকল। খানিক পর সেখান থেকে ডাকল স্টিভেনকে, শুনে যাও।
বাথরুমে ঢুকে হতভম্ব হয়ে গেল স্টিভেন। মাই গড! আরেকজন আমি।
কাজ হবে কিনা বল, জিজ্ঞেস করল পিটার।
হবে, রায় দিল স্টিভেন। কিন্তু তুমি জানলে কিভাবে আজ আমি ব্লেজার আর গ্ৰে মোজা পরব?
জানতে হয়, হাসল পিটার। এবার এসো কাগজপত্রগুলো ঠিকঠাক করা যাক।
যে যার কাগজপত্র বিছানার ওপর আলাদাভাবে রাখল ওরা।
পাসপোর্টের ফটোগ্রাফ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। তবে পিটারের পাসপোর্ট স্টিভেনের কাছে থাকবে, ফলে তার চেহারা একটু বদল করতে হবে।
করুণ স্বরে স্টিভেন বলল, আমার এত সাধের দাড়িটা কেটে ফেলতে বলছ!
পিটার অন্যমনস্ক, স্টিভেনের পাসপোর্ট দেখে অন্য একটা কাগজে সই নকল করার চেষ্টা করছে ও। দুমিনিটের মধ্যে আয়ত্তে এনে ফেলল।
এই ছদ্মবেশ নিয়ে তুমি আমাকে পথে বসাতে পার, আশঙ্কা প্রকাশ করল স্টিভেন। আমার ব্যাংকে গিয়ে সব টাকা তুলে নেবে, তারপর বাড়ি গিয়ে বিছানায় উঠবে প্যাটের সাথে…
আরে, দারুণ আইডিয়া তো! চিন্তামগ্ন হবার ভান করল পিটার।
আরে ভাই, দোহাই লাগে, এ ধরনের ব্যাপার নিয়ে জোক কর না!
এরপর ওরা ক্রেডিট কার্ড, ক্লাব মেম্বারশিপ কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ অন্যান্য কার্ড বদলাবদলি করল। সই নকল করার ব্যাপারে পিটারের দ্বিগুণ সময় নিল স্টিভেন।
সবচেয়ে ভালো হয় তুমি যদি ব্রাসেলসে গিয়ে দিনকতক একটা হোটেলে লুকিয়ে থাকো, বলল পিটার। কারও সাথে যোগাযোগ করবে না, বাইরে কোথাও বেরুবে না।
জানতাম এ ধরনের হুকুমই করবে তুমি… মুখ হাঁড়ি করল স্টিভেন। এখুনি বেরিয়ে পড়ো, তাগাদা দিল পিটার। তার আগে এটা পরো… ট্রেঞ্চ কোটটা দেখিয়ে দিল ও তারপর, এসো টাই বদল করি।
বিদায়ের সময় পিটারের হাত ধরে একটু চাপ দিল স্টিভেন।
স্টিভেন, একটা ব্যাপার জানতে চাইতে পারি? পিটার জানে না, এত বছর পর কেন এই কথাটা বলছে সে।
অফকোর্স, ওল্ড বয়, স্টিভেনের আমুদে স্বর ওকে আমন্ত্রণ জানায়।
স্যান্ডহার্স্ট, গলার সরে অস্বস্তি লুকিয়ে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করল পিটার। তুমি কর নি ওটা, তাই না?
ওর চোখে চোখে চাইল স্টিভেন। নির্ভয়ে। আমি করি নি। বিশ্বাস কর।
ভাইয়ের ডান হাত নিজের হাতে নিয়ে একটু চাপ দেয় পিটার। অনেকটা সময় পর নিজকে ভারমুক্ত লাগছে।
আমি আনন্দিত, স্টিফেন।
টেইক কেয়ার, ওল্ড বয়।
রাখব, পিটার বলে। কিন্তু আমার কিছু হলে, অস্বস্তিভরে যোগ করে সে, মেলিসা জেইন
বলতে হবে না। নিশ্চিত থাকো।
কেন যে মনের ভাব প্রকাশে ইংলিশম্যানদের এত কার্পণ্য, পিটার ভেবে পায় না। এরা পরস্পরের প্রতি এমনকি কৃতজ্ঞ হতেও জানে না।
তো, আমি ঠিক থাকব, চিন্তা কর না। স্টিফেন বলে।
মিডল স্ট্যাম্পে গার্ড নাও, স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বসো না যেন!, পুরানো দিনের মতো করে ভাইকে সাবধান করে পিটার।
আরে না, ওকে রুমে একা রেখে বেরিয়ে যায় স্টিভেন।
৮. নাম বদল
শুধু নামটা লড থেকে বদলে বেন গারিয় হয়েছে, অ্যারাইভালস হলসহ এয়ারপোর্টের কিছুই বদলায়নি। বেন গারিয়র মতো যথেষ্ট সংখ্যক লাগেজ ট্রলি আর কোথাও দেখেনি ও, ফলে জিনিসপত্র নিয়ে আরোহীদের হিমশিম খেতে হয় না।
এক ইসরায়েলি যুবক কান পর্যন্ত বিস্তৃত হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অ্যারাইভাল হলে, দুহাতে ধরা বুকের কাছে একটা স্লেট, তাতে সাদা চক দিয়ে লেখা,
মি, স্যার স্টিভেন স্ট্রাইড।
অদ্ভুত একটা ক্যাপ পরে আছে যোকরা ড্রাইভার–নেভী ব্লু, মাঝখানটা কালো চামড়ার, মিনারের মতো ক্রমশ সরু হয়ে আধ হাত উঠে গেছে খাড়া। ইউনিফর্মের এই একটাই অংশ পরেছে সে, গায়ের শার্টটা সাদা পপলিনের, পায়ে কালো স্যান্ডেল। বেশ ভালোই ইংরেজি বলতে পারে, মার্কিন ঘেঁষা উচ্চারণ। সপ্রতিভ আচরণ দেখে মনে হতে পারে পিটারকে যেন কত যুগ ধরে চেনে সে। আজ এই ছেলেটাকে ড্রাইভার হিসেবে দেখা যাচ্ছে, কালই হয়তো দেখা যাবে কন্ট্রোল সামনে নিয়ে বসে আছে একটা সেঞ্চুরিয়ান ট্যাংকের ভেতর।
