স্টিভেন বিজ্ঞাপন ছেপেছে মঙ্গলবারে, আজ রোববার। পাঁচ দিন পেরিয়ে যাচ্ছে, অথচ স্টিভেনের কোনো ফোন পাচ্ছে না পিটার।
রোজকার মতো আজও খবরের কাগজ নিয়ে বসল পিটার। হিলটন হোটেলে রুম সার্ভিসকে দিয়ে দেশী-বিদেশি যত কাগজ পাওয়া যায় সব আনাবার ব্যবস্থা করেছে ও। শুধু হেডিংগুলোর ওপর চোখ বুলায়, কৌতূহল হলে কোনো খবরের সবটুকু পড়ে। খলিফা নতুন কোনো তৎপরতা চালাচ্ছে কিনা ইঙ্গিত পেতে চায় ও।
ইটালিতে তুমুল উত্তেজনা। চীনা বংশোদ্ভূত পাঁচজন বিলিওনিয়ার ব্যবসায়ীকে কিডন্যাপ করার পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার আগে সন্ত্রাসবাদীরা
মুক্তিপণ হিসেবে চল্লিশ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আদায় করে। সন্দেহ করা হচ্ছে কিডন্যাপাররা রেড ব্রিগেড নামে কুখ্যাত টেরোরিস্ট গ্রুপের সদস্য। পুলিশ কোনো সূত্র পায় নি। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই, খলিফা আছে এর পিছনে। ইতালির একজন মিলিওনিয়ার নিজ দেশে সবচেয়ে বিপদে থাকে। নির্ঘাত তারাই খলিফাকে ইন্ধন জুগিয়েছে।
কন্টিনেন্টাল পত্রিকা শেষ করে স্বস্তির সাথে ইংরেজি এবং আমেরিকান পত্রিকা খোলে পিটার। আগামীকালের আগে স্টিভেনের রিপোর্ট পাচ্ছে না–সে সুনিশ্চিত। এতটা সময় কাটবে কেমন করে?
সময় কাটাতে ইংরেজ পত্রিকা পড়া শুরু করল পিটার।
ব্রিটিশ লিল্যান্ড মোটর কোম্পানির স্ট্রাইক পনেরোতম সপ্তাহে গড়িয়েছে। স্টিভেনের সাথে আলোচনা থেকে পিটার জানে, এতে খলিফার অবদান থাকা বিচিত্র নয়।
সকালের পত্রিকার আরো একটা খবরে আগ্রহ বোধ করল পিটার।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডক্টর কিংস্টোন পার্কারকে তাঁর বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ করেছেন। ডক্টর পার্কারের দায়িত্ব হবে ইসরায়েল কর্তৃক দখলীকৃত আরব ভূমি উদ্ধারে নতুন প্রচেষ্টা চালানো। ভদ্রলোকের পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছে, ডক্টর পার্কার প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত বন্ধু, এবং সিনিয়র ও প্রিয় উপদেষ্টাদের একজন, যাকে দলমত নির্বিশেষে সবাই পছন্দ করে, এবং এ ধরনের জটিল কাজে একমাত্র যোগ্য লোক তিনি।
ডক্টর পার্কারের ক্ষমতা ও প্রভাব, যোগাযোগ ও জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। মনে মনে তার প্রশংসা করল পিটার, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিতে কখনোই তিনি দ্বিধা করেন না।
হাত থেকে পেপার ফেলে দিল পিটার। দারুণ বোর হচ্ছে সে। বিছানার পাশে তিনটি বই পড়ার অপেক্ষায় পড়ে আছে। নামকো দলিলের কোনো শেষ নেই। কিন্তু পিটার জানে, এক খলিফা ছাড়া আর কিছুতে এখন মনোনিবেশ করা তার দ্বারা সম্ভব নয়।
বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করল পিটার, ব্ল্যাক থেকে প্লাস্টিকের একটা প্যাকেট নামিয়ে খুলল। শহরের সবচেয়ে বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের কসমেটিক সেকশন থেকে কাল কিছু টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনেছে ও।
উইগটা মানুষের চুল দিয়ে তৈরি, নাইলন নয়, ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি আর গোঁফটাও তাই। নতুন পোলারয়েড ক্যামেরা দিয়ে মেলিসার তোলা একটা ফটো সামনে নিয়ে আয়নার দিকে মুখ করে বসল পিটার। উইগ, দাড়ি, গোঁফ, তিনটেই কাঁচি দিয়ে কেটে-হেঁটে সাইজ করে নিতে হলো, তারপর পরল পিটার। ছবিটা গত ক্রিসমাসের, অ্যাবোটস ইউ-তে তোলা। ফটোর দিকে বারবার তাকাল ও, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাসছে স্যার স্টিভেন স্ট্রাইড আর স্ট্রাইড পিটার, দুই ভাই। দুজনের চুলের রঙ দুরকম; কৃত্রিম উইগ, দাড়ি, আর গোঁফের সাথে মেলে না। কাজেই ওগুলো রঙ করতে বসল পিটার। পিটারের চেয়ে আধ কি এক ইঞ্চি বেশি লম্বা হবে স্টিভেন, তবে সেটা কারও চোখে পড়বে বলে মনে হয় না। ওদেরকে খলিফা বা তার ঘনিষ্ঠ সাঙ্গপাঙ্গরা চামড়ার চোখে কাছাকাছি থেকে দেখেছে কিনা সন্দেহ আছে পিটারের।
বিকেল হয়ে এল, তবু চেহারা বদলের কাজে সন্তুষ্ট হতে পারল না পিটার। পোশাকে তেমন সমস্যা হলো না। ওরা দুই ভাই বহুকাল থেকে একই টেইলরের কাছে কাপড় বানায়। পোশাক পরে, আয়নার সামনে স্টিভেনের হাবভাব নকল করে হাঁটাহাঁটি করল কিছুক্ষণ। অলস, চনমনে ভঙ্গিতে হাঁটে স্টিভেন। সবশেষে কোবরা প্যারাবেলাম পিস্তলটা ব্রিফকেস থেকে বের করল ও।
খানিক চিন্তা করে অনিচ্ছাসত্ত্বেও সিদ্ধান্ত নিল পিটার, পিস্তলটা নিয়ে যাবে না। প্রায় নিশ্চিতভাবে বলা যায় দেখা-সাক্ষাতের ব্যাপারটা লন্ডনে ঘটবে। বৃহস্পতিবারে স্টিভেনের সাথে যে যোগাযোগটা হয়েছিল, বোঝাই যার লন্ডন থেকে করা হয়েছিল সেটা। সাথে বিপজ্জনক একটা অস্ত্র নিয়ে ব্রিটিশ কাস্টমসকে বোকা বানাবার ঝুঁকি নেয়ার কোনো মানে হয় না। অস্ত্র রাখার দায়ে ওকে যদি থামানো হয়, ব্যাপারটা। রটে যাবে। সাথে সাথে সতর্ক হয়ে যাবে খলিফা। দরকার কি, ইংল্যান্ডে পৌঁছে থোর কমান্ড থেকে একটা অস্ত্র জোগাড় করে নিতে পারবে ও। প্রয়োজনটা ব্যাখ্যা করে বললে ঠিকই একটা ব্যবস্থা করে দেবে কলিন নোবলস।
হোটেলের রিসেপশন ডেস্কে সেফ ডিপোজিট বক্সে অস্ত্রটা রেখে এল পিটার। রুমে ফিরে আবারো সেই অপেক্ষার পালা। সৈনিকের এই একটা দায়িত্ব সে কখনই স্বস্তির সঙ্গে পালন করতে পারেনি।
যা হোক, রবার্ট অ্যাসপ্রের ওয়ার ইন দ্য শ্যাডোস পড়তে বসল সে। যুদ্ধের উন্মত্ততার প্রাচীন কাহিনি। হঠাৎ ঘড়িতে চোখ পড়তে দেখে আটটা বাজে দেখে খুশি হলো মনে মনে। রুম সার্ভিসের ফোনের রিসিভার তুলে ওমলেট আর কফির অর্ডার দিল পিটার। রিসিভার নামিয়ে রেখেছে দশ সেকন্ডেও হয়নি, বেল বাজল। সম্ভবত কিচেন থেকে জানতে চাইবে ডিনারের জন্যে স্পেশাল কিছু ওর দরকার হবে কিনা।
