বেশ, তাহলে বল এরপর তোমার অপারেশন কি ছিল?
কোনো অপারেশন ছিল না…
সাবধান, স্টিভেন, কঠোর সুরে বলল পিটার। মিথ্যে কথা বলবে না। প্রিন্স হাশিদ আবদেল খুন হবে, তুমি জানতে না?
জানতাম, হ্যাঁ, সব ব্যবস্থা আমাকে করতে হয়। খলিফা আমাকে হুকুম করেছিল।
তারপর তুমি মেলিসাকে কিডন্যাপ করাও, তার আঙুল কেটে…।
না-না-না-! তুমি জেনেশুনে কষ্ট দিচ্ছ আমাকে। গলা ভেঙে গেছে স্টিভেনের, জবা ফুলের মতো লাল হয়ে উঠেছে চোখ জোড়া।
আমি যাতে ডক্টর পার্কারকে খুন করতে বাধ্য হই…
না, পিটার, না!
তারপর তুমি চাইলে আমি যেন ব্যারনেস ম্যাগডাকেও খুন করি…
পিটার, তুমি আমার নিজেরই অংশ–তোমার বা তোমার প্রিয় কারো ক্ষতি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বিশ্বাস কর, প্লিজ বিশ্বাস কর! মেলিসাকে তুমি কি রকম ভালোবাসো আমি জানি। সত্যি বলছি, ওর ব্যাপারটায় খলিফার হাত আছে আমি জানতাম না। জানলে আমি বাধা দিতাম, অবশ্যই বাধা দিতাম…
পিটারের চেহারায় ভীতিকর নিষ্ঠুরতা ফুটে আছে। স্টিভেনের মনে হলো, এর কাছ থেকে ক্ষমা আশা করা বৃথা।
মেলিসার ব্যাপারে আমি কিছুই জানতাম না, কথাটা প্রমাণ করার জন্যে তুমি যা বলবে তাই করব, পিটার-যে-কোনো ঝুঁকি নিতে আমি প্রস্তুত।
মৃদু মাথা ঝাঁকাল পিটার, যেন কি ঝুঁকি নিতে বলবে ভাবছে। দেখল, রক্ত নেমে গিয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে স্টিভেনের চেহারা, ঠোঁট কাঁপছে। স্টিভেন যে মিথ্যে কথা বলছে না, বুঝতে পারল। একটাও কথা না বলে শটগানটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিল ও।
স্তম্ভিত হয়ে গেল স্টিভেন, হাত বাড়িয়ে শটগানটা ধরল বটে, কিন্তু হাত ফিরিয়ে নেয়ার কথা মনে থাকল না কিছুক্ষণ। তুমি মস্ত বিপদের মধ্যে আছো, স্টিভেন, শটগানটা বুকের সামনে এনে ভাজ করল, কার্ট্রিজগুলো বের করে পকেটে ভরল।
পুরো এক কেস হুইস্কি দরকার আমার। ভাঙা গলায় বলল স্টিভেন।
.
স্টিভেনের স্টাডি, ফায়ারপ্লেসে গনগনে আগুন জ্বলছে। স্টাডির জানালা দরজা ঘোড়শ শতাব্দীর, একটা জার্মান চার্চে ব্যবহার হত, স্প্যানিশ এক ডিলারের কাছ থেকে নিলামে কিনে সুইটজারল্যান্ড থেকে চোরা পথে আনিয়েছে স্টিভেন। জানালার বাইরে কাঁচমোড়া গোলাপ বাগিচা। স্টাডির দুদিকের দেয়ালে বুক শেলফ, প্রতিটি বই সোনালি এনগ্রেভ করা। ফায়ারপ্লেসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে স্টিভেন, লকলকে শিখার দিকে পিঠ। আঁচ পাবার জন্যে কাঁধ থেকে নিচের দিকে একটু নামিয়ে দিয়েছে জ্যাকেট, হাতে ক্রিস্টাল টাম্বলার, এখনো হুইস্কিতে ভরে আছে অর্ধেকটা। কামরার আরেক প্রান্তে একটা ভিক্টোরিয়ান আমলের আর্ম চেয়ারে বসে আছে পিটার, পা দুটো কাশ্মীরী কার্পেটের ওপর লম্বা করা, হাত দুটো পকেটে ঢোকানো।
খলিফার যুদ্ধখাতে কত টাকা চাঁদা দিয়েছ? হঠাৎ জানতে চাইল পিটার।
ব্যারন অল্টম্যান আর আমি তো আর এক সারিতে পড়ি না, শান্তভাবে জবাব দিল স্টিভেন, পাঁচ মিলিয়ন স্টার্লিং দিতে বলা হয় আমাকে, ভাগ ভাগ করে পাঁচ বছরে দিয়েছি।
তার মানে খলিফা পুরানো পাপী!
স্টিভেন কোনো কথা বলল না।
তার মানে আন্তর্জাতিক সীমারেখা ছাড়িয়ে সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে তার সমিতি। সব দেশেই তার প্রভাবশালী সদস্য আছে, প্রত্যেকে মোটা টাকা চাঁদা দিচ্ছে, স্রোতের মতো চারদিক থেকে আসছে ইনফরমেশন…
মাথা ঝাঁকাল স্টিভেন। গাঢ় রঙের হুইস্কি খেল আরো এক ঢোক।
কোনো দেশে কজন সদস্য, সংখ্যাটা জানো?
মাথা নাড়ল স্টিভেন।
প্রতি দেশে একজন বা দুজন সদস্য আছে তা মনে করার কোনো কারণ নেই। হয়তো শুধু ইংল্যান্ডেই আছে বিশজন। জার্মানিতে আরো বেশি থাকার কথা। আর আমেরিকাতে বোধ হয় একশর ওপর…
সম্ভব।
কাজেই অন্য একটা লিঙ্ককে দিয়ে মেলিসাকে কিডন্যাপ করিয়ে থাকতে পারে…
তোমাকে বিশ্বাস করতে হবে, পিটার, এ ব্যাপারটার সাথে আমি ছিলাম না।
অসহিষ্ণু একটা ভঙ্গি করে স্টিভেনের প্রতিবাদ এড়িয়ে গেল পিটার, আপন মনে কথা বলে উঠল, এমনো হতে পারে খলিফা হয়তো প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একটা কমিটি-একজন লোক নাও হতে পারে।
আমার তা মনে হয় না,–ইতস্তত করল স্টিভেন, প্রথম থেকে খুব জোরালো একটা অনুভূতি হয়েছে আমার, সে একা একজন। কোনো কমিটির পক্ষে এত দ্রুত আর দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়।
চুপ করে তাকিয়ে থাকল পিটার, স্টিভেনকে কথা বলার সুযোগ দিতে চায়।
খলিফা সম্পর্কে মাত্র একজন লোকের সাথে আলাপ করার সুযোগ হয় আমার, যে আমাকে রিক্রুট করেছে। বুঝতেই পারছ, আস্থা না আসা পর্যন্ত পাঁচ মিলিয়ন স্টার্লিং দিতে রাজি হইনি আমি। খলিফার প্রভাব আর ক্ষমতা সম্পর্কে পরিষ্কার একটা ধারণা দেয়া হয় আমাকে। সে যে একা একজন মানুষ, তখনই আমি বুঝতে পারি। সমস্ত বিষয়ে সে একা সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সকলের স্বার্থে।
কিন্তু সব সদস্য তার সিদ্ধান্তের কথা জানতে পারে না।
না। সবাইকে সব জানানো তো পাগলামি। সাফল্যের চাবিকাঠিই তো গোপনীয়তা।
জীবনে কখনো দেখনি, যার পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে, তাকে তুমি এত টাকা দিয়ে বিশ্বাস করতে পার? বিশ্বাস করতে পার, পৃথিবীর মঙ্গল চায় সে? রাগ চেপে রেখে জিজ্ঞেস করল পিটার।
অবতারের মতো তার একটা প্রভা আছে, পিটার। তার জগৎত্রাতা ভূমিকায় মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। যে লোক আমাকে রিক্রট করেছিল তার প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা ছিল। খলিফার প্রতি তার আস্থা দেখে আমিও…
