লাল রঙের ইসরায়েলি ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্টটা এনভেলাপে ভরে রাখল ব্যারনেস। টাইপ করা একটা কাগজ বাড়িয়ে দিল পিটারের দিকে। এটায় মোসাডের টেলিফোন নম্বর থাকল, আমাকে মেসেজ পাঠাতে পারবে-রুথ লেভি নামটা ব্যবহার কোরো।
নম্বরটা মুখস্ত করে নিল পিটার, ওর কাছ থেকে নিয়ে কাগজটা ছিঁড়ে ফেলল ব্যারনেস।
আমার যাবার ব্যাপারটা একটু বদলেছে, বলল ব্যারনেস ক্রীশ-ক্রাফট নিয়ে বোরা-বোরা যাব আমরা। মাত্র একশ মাইল। আগেই রেডিওতে খবর পাঠাব। রাতের অন্ধকারে সৈকত থেকে বেশ খানিক দূরে বন্ধুরা অপেক্ষা করবে আমার জন্যে।
কোরালের মাঝখানে সরু প্যাসেজ, সাবধানে এগোল ক্রীশ-ক্রাফট, সব আলো নিভিয়ে রাখা হয়েছে। ক্ষয়িষ্ণু চাঁদের মৃদু আলোয় পথ দেখে বোট চালাচ্ছে ব্যারনেসের বোটম্যান, এদিকের জলপথ হাতের তালুর মতোই পরিচিত তার।
আমি চাই হাপিতি আমাকে জ্যান্ত চলে যেতে দেখুক, পিটারের গায়ে হেলান দিয়ে ফিসফিস করে বলল ব্যারনেস, শেষ কটা মুহূর্ত থেকে যতটুকু পারে আদায় করে নিতে চাইছে। আমি চাই না আমাকে তুমি মেরে ফেলেছ ধরে নিয়ে স্থানীয় লোকজন খেপে উঠুক। হাপিতি মুখ বন্ধ রাখবে, পিটারকে আশ্বাস দিল সে। তবে তুমি হুকুম করলে মুখ খুলবে।
ভাবতে দেখছি কিছু বাকি রাখনি।
মশিয়ে, এইমাত্র আবিষ্কার করেছি তোমাকে, আনন্দঘন সুরে বলল ব্যারনেস। এখুনি তোমাকে হারাতে আমি রাজি নই। এমন কি তাহিতির পুলিশ প্রধানের সাথেও কথা বলব বলে ঠিক করেছি। তিনি আমার পুরানো বন্ধু। লে নিউফ পোইজোতে ফিরে এসে আমার সেক্রেটারিকে দিয়ে রেডিও মেসেজ পাঠাবে তুমি…
শান্তভাবে বলল ব্যারনেস, আয়োজন করা ব্যবস্থাপনার প্রতিটি খুঁটিনাটির দিকে নজর দেয়া হয়েছে। কোথাও কোনো ফাঁক দেখল না পিটার। অন্ধকার সাগর থেকে ভৌতিক কণ্ঠস্বরের মতো একটা হাঁক-ডাকের আওয়াজ পাওয়া গেল, চোখ খোলা রেখে পিটারের ঠোঁটে চুমো খেল ব্যারনেস। ক্রীশ-ক্রাফটের গতি কমিয়ে দিল। হাপিতি, তারপর এক সময় থামাল। দূরে একটা দ্বীপের কালো কাঠামো ফুটে আছে তারাজ্বলা আকাশের গায়ে। ক্ৰীশ-ক্রাফটের পাশে ধাক্কা খেল একটা ভেলা। পিটারের বাহুবন্ধনের ভেতর দ্রুত ঘুরে গেল ব্যারনেস ম্যাগডা, দুটো মুখ এক হলো।
প্লিজ বী কেয়ারফুল, পিটার, শুধু এই একটা কথা বলে আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হলো ব্যারনেস, মই বেয়ে নেমে গেল ভেলায়। হাপিতি হাত বাড়িয়ে একমাত্র হ্যান্ডব্যাগটা ধরিয়ে দিল তাকে। সাথে সাথে রওনা হলো ভেলা। হারিয়ে গেল অন্ধকারে। চ্যানেলে ঢোকার জন্যে ফিরতি পথ ধরল ক্রীশ-ক্রাফট, স্টার্নে দাঁড়িয়ে অন্ধকারের দিকে চোখ মেলে থাকল পিটার। পাঁজরের নিচে শূন্য একটা অনুভূতি, যেন ওর নিজেরই একটা অংশ হারিয়ে গেছে। ব্যারনেসের স্মৃতি দিয়ে সেই শূন্যতা ভরাট করার চেষ্টা করল পিটার। ক্ষীণ কৌতুকের হাসি ফুটল ওর ঠোঁটে।
তোমার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর, আজ সকালে আলোচনায় বসে হঠাৎ প্রসঙ্গটা মনে পড়ে গিয়েছিল পিটারের, শেয়ার মার্কেটে কি প্রতিক্রিয়া হবে ভেবে দেখেছে? আর অল্টম্যানের স্টক ঝপ করে নেমে যাবে।
জানি। সহাস্যে বলেছিল ব্যারনেস। খবর ছড়াবার পর প্রথম সপ্তাহ হয়তো প্রতিটি শেয়ারের দাম একশো ফ্রাঙ্ক করে কমে যাবে।
তোমার চিন্তা হচ্ছে না।
হচ্ছে না। হঠাৎ ব্যারনেসের চোখ দুষ্টামির ঝিলিক খেলে গেল। একটু আগে জুরিখে টেলেক্স পাঠিয়ে শেয়ার কেনার অর্ডার দিয়েছি। আবার যখন স্টক তুঙ্গে উঠে আসবে, আশা করছি একশ মিলিয়ন ফ্রাঙ্ক লাভ করব আমি। এত দৌড়-ঝাঁপ, তোমার কাছ থেকে দূরে সরে থাকা, এসবের জন্যে ক্ষতিপূরণ নেব না?
ঘটনাটা মনে পড়তে আসল বটে পিটার, কিন্তু বুকের ভেতর শূন্য ভাবটা থেকেই গেল।
.
ট্রীই-আইল্যান্ডারে করে তাহিতিয়ান পুলিশকে লে নিউফ পোইজোতে নিয়ে এল পিয়েরে, তারপর দুদিন ধরে চলল জবানবন্দী আর বিবৃতি দেয়ার পালা। দ্বীপবাসীদের প্রায় সবাই একটা করে বিবৃতি দিতে চায়, এ ধরনের উত্তেজনাকর ঘটনা এদিকের দ্বীপগুলোয় বড় একটা ঘটে না। তাছাড়া, সবাই ওরা ব্যারনেস অল্টম্যানকে ভালোবাসত, তাদের কাছে সে ছিল মহীয়সী সম্রাজ্ঞীর মতে, প্রায় দেবীর সমতুল্য। কেঁদে বুক ভাসাল সবাই তারা।
হাপিতি তার ভূমিকায় একটু বেশি অভিনয় করে ফেলল। ডেড হোয়াইট হাঙরের বিশদ বর্ণনা পর্যন্ত দিয়ে ফেলল সে, ব্যারনেসকে যখন ওগুলো আক্রমণ করে সে নাকি একেবারে কাছ থেকে নিজের চোখে দেখেছে।
দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায় ব্যারনেসের পুণ্য স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার জন্যে সৈকতে একটা ভোজের আয়োজন করা হলো। দ্বীপবাসিনী যুবতী মেয়েরা শোকগাথা গাইতে গাইতে পানিতে ভাসাল তাজা ফুলের মালা, গানের সুরের সাথে একযোগে আগুপিছু দুলতে লাগল তাদের প্রায় নগ্ন শরীর।
পরদিন সকালে পুলিশের সাথে তাহিতি-ফায়া এল পিটার। সবার অলক্ষ্যে ওর আশপাশে থাকল পুলিশ বাহিনির কয়েকজন সাদা পোশাক পরা সদস্য, পথ দেখিয়ে ওকে নিয়ে আসা হলো শহরের পুলিশ হেডকোয়ার্টারে। পুলিশ প্রধানের সাথে ওর সাক্ষাৎকারটা সৌজন্যমূলক এবং সংক্ষিপ্ত হলো, বোঝাই যায় ওর আগে এখান থেকে হয়ে গেছে ব্যারনেস ম্যাগডা। চোখ টিপে ইঙ্গিত প্রধান বা সবজান্তার হাসি যদি বিনিময় নাও হয়ে থাকে, পুলিশ প্রধানের বন্ধুত্বপূর্ণ করমর্দন থেকে প্রকৃত পরিস্থিতির আঁচ পাওয়া যায়। মহীয়সী ব্যারনেসের যে-কোনো বন্ধু আমাদেরও বন্ধু। ভদ্রলোক প্রেজেন্ট টেন্স ব্যবহার করলেন, তারপর এয়ারপোর্টে ফিরে যাবার জন্যে অফিসের একটা গাড়ি দিলেন পিটারকে।
