শিশুর মতো আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল সোনালি বরণ মেয়েটা। আমি আছি, ডাকলেই আমাকে পাবেন, বলে লতানো গাছের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল সে।
ব্যারনেস ম্যাগডা এল শিফনের এত পাতলা একটা পোশাক পরে, মনে হলো সবুজ সামদ্রিক কুয়াশা তার চারপাশে টগবগ করে ফুটছে, যদিও আলো পড়লে মাখন যেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তেমনি উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার হাত মুখসহ অনাবৃত অংশগুলো। পিটারের হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে চেখে দেখল সে।
গুড, মন্তব্য করল ব্যারনেস, ফিরিয়ে দিল গ্লাসটা। কিন্তু কিশোরী মেয়েটা পর্দার আড়াল থেকে তার সামনে ট্রে ধরতে মাথা নেড়ে তাকে বিদায় করে দিল সে।
পিটারকে বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নিয়ে সিটিংরুমের এদিক-সেদিক ঘুরতে লাগল ব্যারনেস, দুর্লভ প্রজাতির গাছ আর মাছের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল পিটারের। বলল, এদিকটা আমি তৈরি করেছি অল্টম্যান মারা যাবার পর। পিটার উপলব্ধি করল, ম্যাগডা ওকে জানতে চায় এই স্যুইটের সাথে অন্য কোনো পুরুষমানুষের স্মৃতি জড়িয়ে নেই। জানানোটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ম্যাগডা, এভাবে ভেবে কৌতুক বোধ করল পিটার।
বারোজন চাকর এল ডিনার নিয়ে। টেবিল সাজিয়ে অপেক্ষা করার ভঙ্গিতে দূরে দাঁড়িয়ে থাকল তারা, কিন্তু ব্যারনেস তাদেরকে হাত নেড়ে বিদায় করে দিল। সবাই চলে যাবার পর পিটারকে জিজ্ঞেস করল সে, নিজে খেতে পারবে, নাকি হাতে তুলে খাওয়াতে হবে?
হেসে ফেলল পিটার। হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?
কিন্তু ব্যারনেস হাসল না। ছোটবেলায় আমার কোনো পুতুল ছিল না, পিটার। ডিশ থেকে এটা-সেটা অনেক খাবার নিজের হাতে পিটারের প্লেটে তুলে দিল সে। এটা লে নিউফ পোজাইটির একটা স্পেশালিটি, দুনিয়ার আর কোথাও পাবে না, বলল সে, ধূমায়িত ক্ৰীয়োল সস থেকে ছোট ছোট আনাজের টুকরো তুলল পিটারের প্লেটে, গভীর সমুদ্রের তলদেশ থেকে বহু কষ্টে উদ্ধার করা হয়েছে। নারকেল দুধের সর আর বিভিন্ন জাতের ঝাঁঝালো মশলা দিয়ে তৈরি সস।
ডিনারের পর লম্বা নখ দিয়ে বরফ-ঠাণ্ডা অস্ট্রেলিয়ার আঙুরের খোসা ছাড়াল ব্যারনেস, একটা একটা করে তুলে দিল পিটারের মুখে।
তুমি দেখছি আমাকে নষ্ট করে ফেলবে, হাসতে লাগল পিটার।
বৃত্তাকার পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে ডাইনিংরুম থেকে পঞ্চাশ ফিট নিচে সৈকতে নেমে এল ওরা, শেষ ধাপে জুতো খুলে মসৃণ, ভেজা ভেজা কংক্রিটের মতো শক্ত বালিতে খালি পায়ে হাঁটল। কদিন আগে পূর্ণিমা ছিল, আজও বেশ বড়সড় আকার নিয়ে উদয় হয়েছে চাঁদ, হলদেটে আলো দিগন্তরেখা পর্যন্ত বিস্তৃত।
পরস্পরের গা ছুঁয়ে হাঁটছে ওরা।
খলিফাকে বুঝতে দিতে হবে তার উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে, হঠাৎ করে বলল পিটার, অনুভব করল সামান্য একটু শিউরে উঠল ব্যারনেস।
অন্তত আজ রাতটা তার কথা আমরা ভুলে থাকতে পারি, পিটার।
উচিত নয়। এক মুহূর্তের জন্যেও উচিত হবে না।
না, তা ঠিক। কিন্তু কিভাবে তাকে বিশ্বাস করাবে? জিজ্ঞেস করল ব্যারনেস। অন্তত সবাই জানবে তুমি মরে গেছ। দেখে মনে হবে আমি তোমাকে খুন করেছি।
প্ল্যানটা বল।
তুমি বলেছ, প্রয়োজন অদৃশ্য হবার সেট করার একটা কায়দা আছে তোমার।
হ্যাঁ, আছে।
এখান থেকে অদৃশ্য হবার দরকার হলে কি করবে তুমি? জানতে চাইল পিটার।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করল ব্যারনেস। পিয়েরে আমাকে বোরা-বোরা নিয়ে যাবে, ওখানে আমার বন্ধুরা আছে। বিশ্বস্ত। দ্বীপের নিজস্ব এয়ারলাইন ফ্লাইট করে আরেক পাসপোর্ট নিয়ে তাহিতি-ফায়া চলে যাব। সেই একই পাসপোর্ট দেখিয়ে কোনো শিডিউলড় এয়ারলাইন ফ্লাইট ধরে ক্যালিফোর্নিয়া বা নিউজিল্যান্ড চলে যেতে পারি আমি।
তোমার একাধিক কাগজপত্র আছে?
কেন, থাকবে না কেন! এত অবাক হলো ব্যারনেস, পিটারের মনে হলো এবার না জিজ্ঞেস করে বসে, সবারই কি থাকে না?
গুড, বলল পিটার। এখানে একটা দুর্ঘটনা সাজাতে হবে আমাদের। স্কুবা ডাইভিং অ্যাক্সিডেন্ট হলেই চলবে, গভীর পানিতে হাঙর হামলা করেছিল, লাশ পাওয়া যাইনি।
কিন্তু এ সবের অর্থ কি, পিটার?
মরা মানুষকে খুন করার জন্যে কেউ মানুষ পাঠায় না, বলল পিটার।
ও, হ্যাঁ, তাই তো!
তাহলে এই ঠিক হলো। খলিফা সমস্যার একটা বিহিত না করা পর্যন্ত অফিসিয়ালি তুমি মরে থাকবে, ব্যারনেসকে বলল পিটার, অনেকটা যেন হুকুমের সুরে। খলিফার ইচ্ছায় তোমাকে আমি খুন করায় তার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান একটা সম্পদ হয়ে উঠব আমি। তার কাছে আমার যোগ্যতা প্রমাণ হয়ে যাবে, আমাকে দিয়ে আরো বড় কাজ করাবার কথা ভাবতে পারে সে। আবার একবার তার কাছাকাছি যাবার সুযোগ পেয়ে যাব আমি। অন্তত উদ্ভট কিছু সন্দেহ যাচাই করার সুযোগ আমি পাবই।
আমার মৃত্যুটা খুব বেশি বিশ্বাসযোগ্য করার চেষ্টা কর না, শেরি, মাই লাভ। তাহিতি পুলিশ আমার সাংঘাতিক ভক্ত, বিড়বিড় করে বলল ব্যারনেস ম্যাগডা। চোয়ারু-র গিলোটিনে তুমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ কর তা আমি চাই না।
.
ব্যারনেসের আগে ঘুম ভাঙল পিটারের, কনুইয়ের ওপর উঁচু হয়ে তার অনাবৃত কাঁধ আর মুখের দিকে ঝুঁকে তাকিয়ে থাকল ও। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যতই দেখল, আনন্দদায়ক ফলুধারায় আপ্লুত হয়ে উঠল সারা শরীর। নারীসুলভ সৌন্দর্য আর অভিজাত ব্যক্তিত্বের এমন সংমিশ্রণ আগে আর কোনো মেয়ের মধ্যে লক্ষ্য করেনি পিটার। ঘুমন্ত ব্যারনেসের চওড়া চোয়ালেও দৃঢ় মানসিকতার ছাপ সুস্পষ্ট, কিন্তু বন্ধ চোখ আর ঠোঁটের চারপাশে কোমল ভাবের মোলায়েম প্রলেপ লেগে রয়েছে। চামড়া এত মসৃণ আর লালিত্যে ভরপুর যে কয়েক ইঞ্চি দূর থেকে লোমকূপের গোড়া দেখা যায় না। পিটার গ্রোগ্রাসে গিলছে, কিভাবে যেন টের পেয়ে গেল ব্যারনেস, চোখে ঘুম নিয়ে পাতা খুলল সে। এই প্রথম লক্ষ্য করল পিটার, ম্যাগডার চোখ কেবল সুবজ নয়, সবুজের সাথে ক্ষীণ সোনালি আর বেগুনী আভা লেগে আছে। বার কয়েক চোখ পিট পিট করল ব্যারনেস, পিটারকে তার ওপর ঝুঁকে থাকতে দেখে ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল চেহারা, হাত দুটো মাথার পিছনে নিয়ে গিয়ে পরম পুলকে পিঠ বাকা করল যেন অলস একটা অজগর আড়মোড়া ভাঙার ভঙ্গিটা প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি সময় ধরে রাখল সে, ইচ্ছে করে দেখতে দিল শরীরটা, কাঙালের মতো তাকিয়ে থাকল পিটারের চোখ।
