কাজে মন বসল না। আবার আমি নিজেকে বোঝাতে লাগলাম, ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার ভুল তথ্য দিয়েছে। তুমি আমাকে খুন করার ষড়যন্ত্র করতে পার না।
এখানে এলাম, শুধু তোমার কাছে হুট করে চলে যাবার ঝোঁকটা কমাবার জন্যে। কিন্তু না, তাতেও কাজ হলো না। অবস্থা আরো খারাপের দিকে গেল। এখানে কাজ নেই, চিন্তা করার জন্যে অঢেল সময় পেলাম হাতে। প্রতিটি মুহূর্ত নির্যাতন করলাম নিজেকে। উদ্ভট সব চিন্তা-ভাবনা পেয়ে বসল আমাকে। বুঝলাম, গোটা ব্যাপারটার একটা সমাপ্তি হওয়া দরকার। কোনো না কোনো উপায় নিশ্চয়ই আছে। তারপর হঠাৎ করেই উপায়টা দেখতে পেলাম।
তোমাকে আমি এখানে ডেকে আনব, সুযোগ দেব আমাকে খুন করার। হেসে উঠল ব্যারনেস, এ ধরনের পাগলামি জীবনে এটাই প্রথম আমার। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, পাগলামিটা করার সুবুদ্ধি দিয়েছিলেন, তিনি আমাকে।
হ্যাঁ, একটুর জন্যে বেঁচে গেছি আমরা, স্বীকার করল পিটার।
পিটার, তুমি আমাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করনি কেন আমি খলিফা কিনা? প্রশ্ন করল ব্যারনেস।
যে কারণে তুমি আমাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করনি আমি তোমাকে খুন করার প্ল্যান করছি কিনা।
হ্যাঁ, একমত হলো ব্যারনেস। খলিফার পাতা জালে দুজনেই আমরা আটকা পড়েছিলাম। আমার আর শুধু একটা প্রশ্ন আছে, পিটার, শেরি। আমি যদি সত্যি খলিফা হতাম, তোমার বিশ্বাস হয় আমি এতই বোকা যে যাদেরকে দিয়ে মেলিসাকে কিডন্যাপ করিয়েছি তাদের একজনকে বঁবুইলের টেলিফোন নম্বর দেব, যাতে সে আমার সাথে খোশ-গল্প করার জন্যে যখন খুশি ডায়াল করতে পারে?
থতমত খেয়ে গেল পিটার। আমি ভেবেছিলাম, শুরু করল ও, তারপর থেমে গেল। না, ভাবিনি। মাথা ঠিক ছিল না, ম্যাগডা। কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। সত্যিই তো, তুমি খলিফা হলে এরকম একটা সূত্র কেন কাউকে দিতে যাবে। তবে মহা ধুরন্ধর ক্রিমিনালরাও এ ধরনের স্থূল ভুল করে, তার রেকর্ড আছে।
ওডেসা থেকে ট্রেনিং পাওয়া ক্রিমিনালরা করে না, পিটার, তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গটা থেকে সরে এল ব্যারনেস। সে যাক, আমার তরফের গল্প তুমি শুনলে। হয়তো কিছু বাদ দিয়ে গেছি, তুমি প্রশ্ন করে জেনে নিতে পার।
আবার ওরা প্রথম থেকে গল্পটা নিয়ে আলোচনা শুরু করল। প্রতিটি ঘটনা বারবার বিশ্লেষণ করল, প্রতিটি সম্ভাবনা নিয়ে বিনিময় হলো মতামত। অবশেষে পিটার মন্তব্য করল, একটা কথা আমাদের ভুললে চলবে না–প্রতিপক্ষের কোয়ালিটি। পশ্চিম আকাশে তখন ঢলে পড়েছে সূর্য, ব্যাঙের ছাতা আকৃতির বিশাল মেঘ গায়ে গোলাপি রঙ মেখে স্থির হয়ে আছে শূন্যে। রহস্যের ভেতর রহস্য আছে, ম্যাগডা। আমাকে দিয়ে ডক্টর পার্কারকে খুন করাবার জন্যেই যে শুধু মেলিসাকে কিডন্যাপ করা হয়েছিল তা নয়। চেষ্টা করা হয়েছিল আমি যাতে তোমাকেও খুন করি। অর্থাৎ এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিল খলিফা। আমি যদি সফল হতাম, তাহলে আরো একটা পাখি মারা পড়ত, তাই না? চিরকালের জন্যে খলিফার জালে আটকা পড়তাম আমি।
এখান থেকে আমরা এখন কোথায় যাব, পিটার? জিজ্ঞেস করল ব্যারনেস, কৌশলে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারটুকু তুলে দিল সে পিটারের হাতে।
বাড়ি ফিরলে কেমন হয়, এখুনি? পরামর্শ দিল পিটার অবশ্য যদি না তুমি আরো এক রাত এখানে কাটাতে চাও।
.
পিটার আবিষ্কার করল ওর সমস্ত জিনিসপত্র চুপিসারে বাংলো থেকে সরিয়ে দ্বীপের উত্তর প্রান্তে ব্যারনেসের প্রাসাদতুল্য বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। টয়লেটে ব্যবহার যোগ্য প্রতিটি জিনিস আয়না মোড়া মাস্টার বাথরুমে সাজানো পেল ও। পাশের– বাথরুমটাই ব্যারনেসের।
পিটারের জন্যে ড্রেসিংরুমও আলাদা, এখানে ওর সবগুলো কাপড় নতুন করে ধোয়া আর ইস্ত্রি করা অবস্থায় পাওয়া গেল। হ্যাঙ্গারে ঝোলাবার জন্যে ফাঁকা জায়গাটা ধরে দুবার হটল পিটার, হিসাবে কষে বের কলল, তিনশ স্যুট অনায়াসে রাখা যাবে। বিশেষভাবে তৈরি, বোতাম টিপে খোলা বা বন্ধ করা যায়, পালিশ ট্রাউজার এবং র্যাকে তিনশ জোড়া জুতো রাখা যাবে। যদিও সবগুলো খালি।
পিটারের হালকা রঙের সুতি স্যুটটাকে বিশাল সাহারায় নিঃসঙ্গ উটের মতো লাগল।
ওর সুইটের সিটিংরুমটা তিন প্রস্থে ভাগ করা, একটার চেয়ে অপরটার মেঝে ছয় ফিট করে উঁচু। বাঁশের তৈরি ফার্নিচার, দুর্লভ প্রজাতির পাতা-গাছ, ফুলগাছ, বিভিন্ন জাতের কোরান, আর অ্যাকুয়ারিয়াম দিয়ে সাজানো। তিনটে ভাগকে পরস্পরের কাছ থেকে আড়াল করেছে কাপড়ের কোনো পর্দা নয়, লতানো গাছের পাতা।
সোনালি বরণ এক পলিনেশিয়ান যুবতী, কিশোরীই বলা চলে, দুহাতে ধরে একটা ট্রে নিয়ে এল পিটারের সামনে। ট্রেতে চারটে গ্লাস, ঠাণ্ডায় ঘেমে গেছে কাঁচ। সবগুলোতেই বিপন্ন ফলের রস, তবে পিটারের নাকে রামের গন্ধও ঢুকল। মনে হলো বেশ কড়াই হবে, তাই বলল, হুইস্কি হলে ভালো হতো।
হতাশার ম্লান ছায়া পড়ল মেয়েটার মুখে। আমি নিজের হাতে তৈরি করেছিলাম, স্যার!
তাহলে তো দেখতে হয়…, পিটার চুমুক দিচ্ছে, ওর দিকে সাগ্রহে তাকিয়ে থাকল মেয়েটা। মাত্র একপ্রস্থ কাপড়ে বুক আর কোমর ঢাকা তার, কাপড়ের ভেতর থেকে উঁচু হয়ে আছে যৌবন, কিন্তু সে দিকে তাকাবার কোনো আগ্রহ হলো না পিটারের। বাহ্ ভারী সুন্দর, দারুণ স্বাদ হয়েছে!
