ব্যস, এইটুকু মাত্র? হতাশ ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল পিটার।
না, আমার কন্ট্রোল আরো দুটো নাম জানাল—সান্ত্বনা হিসেবে। বলল, এদের কাজ থেকে দূরে এবং সাবধানে থাকতে হবে। এই নামের লোক দুজন নাকি খলিফার এত কাছাকাছি, আসলে এদেরকেই খলিফা বলা যেতে পারে। নামগুলো বলার আগে আবার সে স্মরণ করিয়ে দিল, দিচ্ছে শুধু আমার প্রোটেকশনের কথা ভেবে।
নামগুলো…
তোমার নাম, নরম গলায় বলল ব্যারনেস। স্ট্রাইড।
বিরক্তিসূচক শব্দ করে পিটার বলল, সেফ ধোঁকা দিয়েছে তোমাকে। আমি কেন মেলিসাকে কিডন্যাপ করতে যাব? আর, ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার-ছদ্মনাম জানা না জানা সমান কথা।
এবার আমার বলার পালা–দুঃখিত।
চিন্তার লাগাম টেনে ধরল পিটার, হঠাৎ খেয়াল হলো ভালোভাবে বিবেচনা না করেই তথ্যগুলো বাতিল করে দিচ্ছে ও। উঠে দাঁড়িয়ে ক্রীশ-ক্রাফটের ডেকে পায়ে ঝাঁকুনি তুলে পায়চারি করতে শুরু করল, কপালে চিন্তার রেখা। ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার, ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার, বার কয়েক উচ্চারণ করে ব্যারনেসের দিকে তাকাল। আগে কখনো নামটা শুনেছ তুমি?
মাথা নাড়ল ব্যারনেস। না।
তোমাকে জানাবার পর?
আবার, না।
স্মৃতির মাঠ চষে ফেলল পিটার, কিন্তু নামটা আগে কখনো কোথাও শুনেছে বলে মনে পড়ল না। ঠিক আছে। এই মুহূর্তে নামটা অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে ধরে নিল ও। এবার এসো আমার প্রসঙ্গে কন্ট্রোলের মুখে শোনার পর কি মনে হলো তোমার?
প্রথমে অর্থহীন মনে হলো, শুধু প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম। প্রশ্নটা আমার মনেও আসে–পিটার স্ট্রাইড কেন মেলিসাকে কিডন্যাপ করতে যাবে।
শুধু আমার নামটাই বলল তোমাকে, আর কিছু না?
একবার নয়, দুবার–কন্ট্রোল আমাকে তোমার সম্পর্কে দুবার সাবধান করে দেয়, বলল ব্যারনেস।
দুবার? পায়চারি থামিয়ে ব্যারনেসের দিকে ঝুঁকে পড়ল পিটার। দ্বিতীয়বার কখন?
মেলিসাকে উদ্ধার করা হয়েছে এই খবর পাবার পর। সেই মুহূর্তে প্যারিসে ফিরতে চেয়েছিলাম আমি, তোমার পাশে থাকতে হবে আমাকে। খবরটা শোনার ছঘণ্টা পর বেন-গারিয় এয়ারপোর্টে পৌঁছে একটা ফ্লাইট ধরতে পারি আমি। আমার হৃৎপিণ্ড গান গাইছিল, পিটার। মেলিসা সুস্থ আর নিরাপদ, অ্যান্ড আই ওয়াজ ইন লাভ। দেরি নেই, আবার তোমার সাথে থাকব আমি। প্লেনে উঠতে যাচ্ছি, সিকিউরিটি চেকিং চলছে, একজন মহিলা পুলিশ ডেকে নিয়ে গেল আমাকে- সিকিউরিটি অফিসে। আমার কন্ট্রোল ওখানে আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল। আমাকে ধরার জন্যে তেল আবিব থেকে নিজেই ছুটে এসেছে, চেহারা দেখে মনে হলো সাংঘাতিক উদ্বেগের মধ্যে আছে বলল, ক্যাকটাস ফ্লাওয়ারের কাছে থেকে জরুরি একটা মেসেজ পেয়েছে সে। মেসেজটা নাকি হুবহু এই রকম : জেনারেল স্ট্রাইড পিটার এই মুহূর্তে অবশ্যই খলিফা কর্তৃক অনুপ্রাণিত।
কন্ট্রোল আমাকে বলল, পিটার তোমাকে প্রথম সুযোগেই খুন করবে। তার মুখে হাসলাম আমি। কিন্তু তাকে সাংঘাতিক সিরিয়াস দেখল, বলল, মাইডিয়ার ব্যারনেস, ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার প্রথম শ্রেণির একজন এজেন্ট। তার ওয়ার্নিং তোমাকে সিরিয়াসলি নিতে হবে। এক কথা বারবার বলল সে।
তবু আমার বিশ্বাস হয়নি, পিটার। অসম্ভব একটা ব্যাপার। আমি তোমাকে ভালোবাসি, জানি তুমিও আমাকে ভালোবাস-যদিও হয়তো তুমি নিজেও সেটা ভালো করে উপলব্ধি করোনি। স্রেফ পাগলামি মনে হচ্ছিল। কিন্তু প্লেনে চড়ার পর চিন্তা করার অবসর পেলাম আমি আমার কন্ট্রোল এর আগে কখনো ভুল করেনি। পিটার, আমার তখনকার মানসিক অবস্থা তুমি কল্পনা করতে পার? আমার সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে আমি চাইছি তোমার কাছে পৌঁছুতে, অথচ ভূতের মতো ভয় লাগছে তোমাকে। আমাকে তুমি খুন করে ফেলবে সে ভয় নয়-ওটা আমার কাছে কোনো গুরুত্ব পায়নি। ভয় হচ্ছিল সত্যি না তুমি খলিফা হিসেবে আত্মপ্রকাশ কর। এই চিন্তাটাই আমাকে আতঙ্কিত করে তোলে। বুঝতে পারছ তো, তোমার আগে কাউকে আমি ভালোবাসিনি।
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল ব্যারনেস; দ্বিধা, সংশয়, আর ব্যথার কথা মনে পড়ে গেছে। তারপর সে মাথা নাড়ল, ঘন কালো চুল ঢেউ তুলল কাঁধে।
প্যারিস পৌঁছে আমার প্রথম কাজ ছিল মেলিসা আর তুমি কেমন আছো খবর নেয়া। তারপর জানতে চেষ্টা করব, ক্যাকটাস ফ্লাওয়ারের ওয়ার্নিঙে কতটা শাঁস আছে। খবর পেলাম, স্যার স্টিভেনের বাড়িতে তোমরা। কিন্তু কতটা নিরাপদ যতবার তুমি আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে আমি এড়িয়ে গেলাম–আর প্রতিবার এড়িয়ে যাবার সময় মনে হতে লাগল আমার ছোট একটা করে অংশ মরে যাচ্ছে।
পিটারের দিকে ঝুঁকে ওর একটা হাত তুলে নিল ব্যারনেস, আঙুলগুলো খুলল, মাথা নিচু করে চুমো খেল তালুতে, তারপর হাতটা তুলে নিজের গালে চেপে রাখল।
কয়েক হাজার বার নিজেকে বুঝিয়েছি, এ অভিযোগ সত্যি নয়। দিনের মধ্যে পাঁচ-সাতবার ঝোঁক চেপেছে, বেরিয়ে পড়ি, যাই তোমার কাছে। ওহ্ পিটার, এক সময় অসহ্য হয়ে উঠল ব্যাপারটা। সিদ্ধান্ত নিলাম ওরলিতে তোমার সাথে দেখা করব, কারণ সত্যটা আমাকে জানতেই হবে। তোমার মনে আছে, সেদিন আমার সাথে নেকড়েগুলো ছিল, ওদেরকে বলা ছিল বিপদ হতে পারে। তবে বলিনি, বিপদটা তোমার দিক থেকে আসতে পারে।
ওরলির প্রাইভেট লাউঞ্জে তুমি পা রাখতেই আমি বুঝতে পারলাম, কথাটা সত্যি। ব্যাপারটা অনুভব করতে পারছিলাম, মৃত্যুর গন্ধ ছড়াচ্ছিলে তুমি, তোমাকে ঘিরে ছিল অস্বাভাবিক উজ্জ্বল একটা প্রভাব। শুধু ভীতিকর নয়, আমার জীবনের সবচেয়ে ঘৃণ্য মুহূর্তে ছিল সেটা। তোমাকে অন্য এক লোক বলে মনে হচ্ছিল, সম্পূর্ণ অচেনা। তোমাকে চুমো খেয়ে বিদায় জানালাম, কারণ বুঝতে পারছিলাম, জীবনে আর আমাদের দেখা হবে না। এমনকি এই চিন্তাটাও আমার মাথায় খেলে যায় যে তুমি আমাকে খুন করার আগে নিজেকে বাঁচানোর জন্যে আমিই তো প্রথম আঘাত… কথাটা শেষ করল না ব্যারনেস। তোমাকে আমি খলিফা বা খলিফার অংশ বলে মনে করছিলাম বুঝতেই পারছ, তাই সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হচ্ছিল। স্বীকার করছি, পিটার, চিন্তাটা মাথায় এসেছিল। আমাকে খুন করার আগে তুমি মারা যাও–কিন্তু ওটা শুধুই একটা সাময়িক চিন্তা ছিল মাত্র। সেটাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আমি আমার কাজে ফিরে গেলাম। কাজ, ব্যবসা, চিরকালই টনিক হিসেবে উপকার করেছে আমার। কাজের ভেতর ডুবে যেতে পারলে প্রায় সব কিছু ভুলে যেতে পারি আমি। কিন্তু এবার তা হলো না। কথাটা বারবার বলছি, কারণ কথাটায় এত বেশি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় যে ঘন ঘন না বলে পারা যায় না–তোমার আগে আমার জীবনে ভালোবাসা আসেনি, পিটার এবং সেই ভালোবাসাকে অস্বীকার করার সাধ্য আমার ছিল না।
