তোমাকে আমি আগেই বলেছি, খলিফার পরিচয় মোসাডকে জানিয়ে দিয়েছিল অল্টম্যান। ভাবলাম তাহলে মোসাড নিশ্চয়ই এমন কিছু জানে যা মেলিসাকে উদ্ধারে তোমার সাহায্যে লাগবে। কিন্তু প্যারিসে বসে তথ্য সংগ্রহ করা সহজ ছিল না। বাধ্য হয়ে ইসরায়েলে যেতে হলো আমাকে, উদ্দেশ্য আমার কন্ট্রোলারের সাথে সামনা-সামনি কথা বলব…
তুমি ইসরায়েলে গিয়েছিল…
যেতে হয়েছিল, আর কোনো উপায় ছিল না–তোমাকে সাহায্য করার জন্যে আমি তখন মরিয়া হয়ে উঠেছি। আমি জানতাম, মোসাড আমাকে সাহায্য করতে চাইবে না। আমি খালি হাতে যাইনি, সাথে অস্ত্র ছিল। মেলিসাকে ফিরে পেতে ওরা সাহায্য না করলে কি করতে হবে জানা ছিল আমার…।
তুমি–তুমি মোসাড থেকে পদত্যাগ করার হুমকি দিয়েছিলে?
দেব না? তা না হলে ওরা সাহায্য করতে রাজি হবে না জানতাম…
আমার জন্যে তুমি এতটা…
ধোৎ, তুমি বুঝবে না। আমি ভালোবাসি, আর ভালোবাসার জন্যে মানুষ কি না। করতে পারে!
আমি কৃতজ্ঞ বোধ করছি।
উত্তর না দিয়ে আবার প্রসঙ্গে ফিরে এল ব্যারনেস, সব কিছু আমি প্যারিসে রেখে গিয়েছিলাম। প্রয়োজনে অদৃশ্য হবার পরীক্ষিত একটা কৌশল আছে আমার। লীয়ারে করে রোমে নিয়ে গেল আমাকে পিয়েরে, ওখান থকে তোমাকে আমি ফোন করলাম। কিন্তু কি করতে যাচ্ছি তোমাকে বলার উপায় ছিল না। তারপর আমি পরিচয় বদলে একটা কমার্শিয়াল ফ্লাইটে চড়ে তেল আবিবে চলে গেলাম।
ইসরায়েলে আমার কাজটা ছিল কঠিন, যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক কঠিন। আমার সাথে দেখা করতে পাঁচ দিন সময় নিল কন্ট্রোল। তার সাথে আমার বন্ধুত্বের সম্পর্ক, অনেক দিনের। না, হয়তো বন্ধুত্বের সম্পর্ক নয়, তবে পরস্পরকে আমরা অনেক বছর ধরে চিনি। মোসাডের একজন ডেপুটি ডিরেক্টর সে। এরকম একজন গুরুত্বপূর্ণ কন্ট্রোলারের অধীনে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে ওরা আমাকে, এ থেকেই বোঝা যায় ওদের কাছে কতটা মূল্যবান আমি। অথচ তবু পাঁচ দিন বসিয়ে রেখে আমাকে কাজ করতে দেয়া হলো। দেখলাম, কন্ট্রোল ঝিম মেরে আছে, ঠাণ্ডা। বলল, তারা কোনো সাহায্য করতে পারবে না। কারণ, তারা নাকি কিছু জানে না।
আমি যখন সত্যি মরিয়া হয়ে কিছু চাই, আমার তখনকার চেহারা তুমি দেখনি, পিটার। ইসরায়েলের মাটিতে বসে মোসাডের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম আমি। আহ্, কি একখানা যুদ্ধ! মোসাডের এমন অনেক ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে জানি আমি, যা প্রকাশ হয়ে পড়লে ইসরায়েলের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো হাইড্রোজেন বোমার মতো বিস্ফোরিত হবে–যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স। হুমকি দিয়ে বললাম, সোজা নিউ ইয়র্কে গিয়ে প্রেস কনফারেন্স ডাকব। আমার কন্ট্রোল আরো নির্লিপ্ত হয়ে গেল। বলল, কারও ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এরপর আমি শেষ অস্ত্রটা ছাড়লাম, অসম্ভব কিছু কাজ দেয়া হয়েছে আমাকে, সেগুলোর হাত দিয়েছি, কিন্তু ওগুলো চিরকাল অসম্ভবই থেকে যাবে। একটু গরম হলো কন্ট্রোল।
কিন্তু এসবের পিছনে সময় নষ্ট হচ্ছিল–দিনের পর দিন পেরিয়ে গেল, আর আমি ছটফট করতে লাগলাম। মেলিসাকে যাতে তুমি উদ্ধার করতে পার তার জন্যে অনেক প্রার্থনা করেছি আমি, প্রতিটি মুহূর্ত চেয়েছি এই বিপদের সময় তোমার পাশে থাকি। মনে হত শুধু যদি একবার অন্তত তোমার গলা শুনতে পেতাম। কিন্তু তেল আবিব থেকে ফোন করা সম্ভব ছিল না, আমার কাভার ফাঁস হয়ে যেত। কি দুঃসহ সময় যে কাটছিল ওখানে…।
অবশেষে মোসাড আমাকে দু-একটা তথ্য দিতে রাজি হলো। প্রথমে কন্ট্রোল স্বীকারই করল না যে তারা খলিফার নাম শুনেছে। কিন্তু আমি একটা ঝুঁকি নিয়ে মিথ্যে কথা বললাম তাকে। বললাম, অল্টম্যান আমাকে বলে গেছে খলিফার পরিচয় মোসাডকে জানানো হয়েছে। এবার একটু নরম হলো সে। হ্যাঁ, স্বীকার গেল-খলিফা সম্পর্কে তারা জানে, কিন্তু তার পরিচয় জানে না। কিন্তু আমার হাতুড়ি থেমে নেই, জেদ ধরলাম প্রতিদিন কন্ট্রোলকে আমার সাথে দেখা করতে হবে। এক সময় রেগে গেল সে, ভয় দেখাল ইসরায়েল থেকে বের করে দেয়া হবে আমাকে। তবে যত বার দেখা হলো, প্রতিবার এক-আধটা তথ্য তার কাছ থেকে বের করতে পারলাম আমি।
শেষে পরাজয় মানল সে, বলল হ্যাঁ, খলিফাকে তারা চেনে, কিন্তু সে খুব বিপজ্জনক, সাংঘাতিক ক্ষমতাবান…ঈশ্বর চাইলে আরো ক্ষমতা আসতে যাচ্ছে তার হাতে, এককভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে সে এবং লোকটা ইসরায়েলের একজন বন্ধু। অন্তত মোসাড তাই বিশ্বাস করে।
আমি জোকের মতো তাকে ধরে ঝুলে থাকলাম। এরপর সে জানাল, খলিফার কাছাকাছি একজন এজেন্টকে পাঠিয়েছে তারা। এজেন্ট লোকটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু খলিফা তার পরিচয় জেনে ফেললে স্রেফ মারা পড়বে সে। এই পরিস্থিতিতে মোসাড যদি আমাকে কোনো তথ্য দেয়, তথ্যটা কোত্থেকে ফাঁস হলো জানতে চেষ্টা করবে খলিফা এবং স্বভাবতই মোসাডের সেই এজেন্টের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাবে। অর্থাৎ মোসাড নিজের এজেন্টকে রক্ষার জন্যে এ ধরনের কোনো ঝুঁকি নেবে না।
আবার আমি তাকে হুমকি দিলাম। এবার সে এজেন্টের কোড নেম জানাল আমাকে। তার সাথে যদি কখনো আমি যোগাযোগ করি, কোড নেমটা ব্যবহার করব, তাহলে দুজনেরই নিরাপত্তা অটুট থাকবে। কোড নেমটা হলো–ক্যাকটাস ফ্লাওয়ার।
