না তাকিয়েও, শুধু ব্যারনেসের ধরা গলা শুনে পিটার বুঝতে পারল, তার চোখ পানিতে ভরে উঠেছে। আরো দৃঢ়ভাবে তাকে আলিঙ্গন করল ও, অপেক্ষা করে থাকল কখন নিজেকে সামলে নেবে।
নিশ্চয় ওই সময়টাতেই তার সাথে যোগাযোগ করেছিল খলিফা। এখন স্মরণ করতে গিয়ে মনে পড়ছে, তখন হঠাৎ করে দুশ্চিন্তায় ভুগতে শুরু করে অল্টম্যান। ব্যাপারটা আমার বোধগম্য হয়নি। ইন্টারন্যাশনাল টেরোরিজম সম্পর্কে কথা বলত, এত রেগে যেত যে ভয় পেয়ে যেতাম আমি। শত্রু তখন বোধ হয় খলিফা নামটা ব্যবহার করেনি। বেঁচে থাকলে অল্টম্যান আমাকে যোগাযোগের ব্যাপারটা জানাত, আমি জানি। কিন্তু সে সুযোগ খলিফা তাকে দেয়নি।
মুখ দেখার জন্যে পিটারের আলিঙ্গন থেকে বেরিয়ে চোখ তুলল ব্যারনেস।
তোমাকে বুঝতে হবে, শেরি, এসব আমি ইদানিং জেনেছি–গত কয়েক সপ্তাহ হয়। বিচ্ছিন্নভাবে জেনেছি, এখন জোড়া লাগাচ্ছি–তবে ঘটেছিল ঠিক এরকমই। একটা প্রস্তাব নিয়ে অল্টম্যানের সাথে যোগাযোগ করে খলিফা। সহজ একটা প্রস্তাব-খলিফার পার্টনার হতে পারে অল্টম্যান। খলিফার যুদ্ধ-খাতে অল্টম্যানকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হবে, আর তার প্রভাব, প্রতিপত্তি, যোগাযোগ এবং তথ্য সংগ্রহের উৎস ব্যবহার করতে হবে খলিফার স্বার্থে। বদলে খলিফার স্বপ্ন নতুন জগৎটাকে গড়ার কাজে পরামর্শ দিতে পারবে অল্টম্যান, জগৎটার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে খলিফার পাশাপাশি তার নামও স্থান পাবে।
হিসেবে ভুল করেছিল খলিফা, সম্ভবত এখন পর্যন্ত এটাই তার একমাত্র ভুল। অল্টম্যান তাকে প্রত্যাখ্যান করে। সাথে সাথে বিপদটা দেখতে পেল খলিফা। অল্টম্যানকে কনভিন্স করানোর জন্যে নিজের আসল পরিচয় প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছিল সে। কারণ ছদ্মনাম, গোপন পরিচয় ইত্যাদি ছেলেমানুষি ব্যাপার সহ্য করার লোক অল্টম্যান ছিল না। কাজেই অল্টম্যানের সামনে সশরীরে আসতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু আলোচনায় কোনো ফল হলো না, ফিরে গেল খলিফা। এরপর অল্টম্যানকে দুনিয়ার বুক থেকে সরিয়ে না দিয়ে তার কোনো উপায় ছিল না।
তাকে টরচার করা হয় গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্যে, আমার ধারণা। সম্ভবত মোসাড সম্পর্কে সব কথা জানতে চায় খলিফা। স্বামীকে ফেরত পাবার জন্যে মুক্তিপণের টাকা নিয়ে একাই গেলাম আমি, আর কারও ওপর আমার বিশ্বাস ছিল না। এক ঢিলে দুটো পাখি মারল খলিফা–অল্টম্যানকে সরাল, যুদ্ধ খাতের জন্যে পঁচিশ মিলিয়ন ডলারও হাতিয়ে নিল।
এসব তুমি জানলে কিভাবে? আরো আগে যদি জানাতে আমাকে,-তিক্ত কণ্ঠে শুরু করল পিটার।
আমাদের যখন প্রথম দেখা হলো, এ-সব কিছুই আমি জানতাম না, শেরিকসম! কিভাবে জানলাম বলব, কিন্তু প্লিজ, তাড়া দিয়ো না। যেভাবে ঘটেছে। সেভাবে বলতে দাও আমাকে।
আমি দুঃখিত, মৃদু কণ্ঠে বলল পিটার।
মুক্তিপণের টাকা দিতে গিয়ে প্রথম আমি খলিফা নামটা শুনলাম। আগেই তোমাকে জানিয়েছি, তাই না?
হ্যাঁ।
এবার তাহলে তোমার প্রসঙ্গে আসা যাক। জিরো-সেভেন-জিরো হাইজ্যাক হওয়ার পর প্রথম শুনলাম নামটা। এই দেখ, রিয়্যাকশনটা স্মরণ করে আবার আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। পিটারের চোখের সামনে একটা হাত তুলল ব্যারনেস, পিটার দেখল লোমকূপের গোড়া থেকে সূক্ষ্ম সুঁচের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওগুলো।
প্রচণ্ড আকর্ষণ বোধ করেছিলাম তোমার প্রতি। তারপর তোমার পেশা আর গুণেরও পরিচয় পেলাম। তখনই চিন্তাটা এল মাথায়–খলিফাকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে তুমি আমাকে সাহায্য করতে পার। তোমার সম্পর্কে আরো খোঁজ-খবর নিতে শুরু করলাম। এমনকি একটা কম্পিউটার প্রিন্ট-আউটও জোগাড় করে ফেলি। থামল ব্যারনেস, চোখের তারায় দুষ্টামির ঝিলিক খেলে গেল। তোমার বান্ধবীর সংখ্যা আর তাদের স্ট্যাটাস সত্যি আমাকে মুগ্ধ করেছিল…
এ প্রসঙ্গ থাক…
হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল পিটার। যা হবার হয়েছে, আর হবে না। এ প্রসঙ্গে আর একটাও কথা নয়–রাজি?
রাজি। হি হি করে হেসে উঠল ব্যারনেস। বকবক করে ব্যথা এনে ফেলেছি গলায়। খিদেও পেয়েছে ভীষণ…
আবার ওরা হাত ধরাধরি করে দ্বীপের আরেক প্রান্তে চলে এল, ডিঙ্গিতে চড়ে ফিরে এল ক্রীশ-ক্রাফটে। শেফ দুনিয়ার উপাদেয় খাবার দিয়ে ভরে দিয়েছে রেফ্রিজারেটর, নিজের হাতে ভিউভ ক্লিকোৎ শ্যাম্পেনের একটা বোতল খুলল ব্যারনেস।
তোমার রুচি ভীষণ খরুচে, মন্তব্য করল পিটার। আমার যা বেতন তাতে তোমাকে পুষতে পারব কিনা সন্দেহ হয়।
দুজন মিলে তোমার বসকে বেতন বাড়াবার জন্যে চাপ দেব, চোখে কৌতুকের ঝিলিক নিয়ে বলল ব্যারনেস, বস বলতে নিজেকেই বোঝাল সে। অলিখিত চুক্তির মতো খাবার সময়টা ভুলেও কেউ ওরা খলিফার নাম উচ্চারণ করল না।
অবশেষে আবার ওরা পাশাপাশি বসল, বাল্কহেড়ে হেলান দিল পিটার, ওর কাঁধে মাথা ঠেকাল ব্যারনেস। একটা সিগারেট ধরিয়ে নিজে দুটান দিল, তারপর পিটারের ঠোঁটে গুঁজে দিল সেটা।
আরেকটা ব্যাপার তোমাকে বুঝতে হবে, পিটার। আমি মোসাডের একজন, কিন্তু ওদের আমি নিয়ন্ত্রণ করি না। ওরা আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে। অল্টম্যানের ব্যাপারটাও তাই ছিল। দুজনেই আমরা অত্যন্ত মূল্যবান এজেন্ট ছিলাম, আমি এখনো আছি, কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার আমার নেই, ওদের সমস্ত গোপন তথ্য জানার সুযোগ আমি পাই না।
