চাতুর্য বা ছলনার সন্ধানে অনেকক্ষণ পিটারের চোখে তাকিয়ে থাকল ব্যারনেস, কিন্তু কিছুই না পেয়ে বিড়বিড় করে বলল, হ্যাঁ। ব্যাপারটা তাই। মনের কথাই বলেছ। স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলে পিটারের কাঁধে মাথা ঠেকাল সে, মৃদু কণ্ঠে কথা বলে গেল, যেন গুনগুন করছে।
কিন্তু ওদের কাউকে আমি পছন্দ করতাম না পিটার। সেজন্যেই আমি অল্টম্যানকে বেছে নেই। অনেক পুরুষের সাথে মিশছি, কিন্তু কারো কাছ থেকে না। কিছু পাচ্ছি, না কাউকে কিছু দিতে পারছি–তারচেয়ে একজন লোককে যদি বেছে নিতে পারি, নিজের ওপর শ্রদ্ধা ফিরে আসবে। মৃদু কাঁধ ঝাঁকাল ব্যারনেস। অল্টম্যানকে বেছে নিলাম, মস্কো আমাকে সমর্থন করল। কাজটা ভারী জটিল ছিল। প্রথমে আমাকে তার শ্রদ্ধা অর্জন করতে হয়েছে। অল্টম্যান আগে কখনো কোনো মেয়েকে শ্রদ্ধা করেনি। ধীরে ধীরে আমি প্রমাণ করলাম, সম্ভাব্য যে-কোনো কাজে পুরুষের মতোই যোগ্য আমি, আমাকে দিয়ে সব কাজ করাতে পারে সে, তা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক। তার শ্রদ্ধা অর্জনের পর বাকি সব পানির মতো সহজ হয়ে গেল।
নিয়তি কাকে যে কিভাবে নিয়ে খেলে। প্রথম আবিষ্কার করলাম, লোকটাকে আমি পছন্দ করি। তারপর দেখলাম, তার প্রতি আমারো শ্রদ্ধা জন্মাচ্ছে। কুৎসিতদর্শন একটা ষাঁড়, গায়ে হারকিউলিসের মতো জোর, আর ব্যক্তিত্বের শক্তি ছিল কসমিক পাওয়ারের সমান। তার এই শক্তি, প্রভাব, আর ক্ষমতাকে আমি পুজো করতে শুরু করি। মুখ তুলে পিটারের চোয়ালে আঙুল বুলাল ব্যারনেস, তারপর মাথাটা আরো একটু তুলে ওর ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াল। না, পিটার, তার প্রতি আমার ভালোবাসা জন্মায়নি। তোমার আগে কাউকে আমি ভালোবাসিনি। অল্টম্যানকে আমার জাদুকর বলে মনে হত, ভয় মেশানো শ্রদ্ধা ছিল তার প্রতি। বর্বর আদিবাসী যেমন বজ্রপাত আর বিদ্যুৎচমকের দিকে সভয়ে তাকিয়ে ভাবে ঈশ্বরের লীলা, আমিও ঠিক তেমনি অল্টম্যানের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম লোকটার ক্ষমতার কি কোনো শেষ-সীমা নেই? সে আমার অস্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। একজন বাবা, একজন শিক্ষক, একজন গুরুর মতো, প্রায় একজন ঈশ্বরের মতো। কিন্তু কখনোই একজন প্রেমিকের মতো নয়।
অল্টম্যান শক্তিশালী ছিল, কিন্তু তার শক্তি সে ক্ষয় করতে জানত না–এরকম একটা মানুষ কাউকে ভালোবাসবে কিভাবে! নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গম্ভীরভাবে পিটারের দিকে তাকাল ব্যারনেস। কি বলতে চাইছি বুঝতে পারছ কি, পিটার? নাকি ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারলাম না?
না, আশ্বস্ত করল পিটার, ভালোই বলতে পেরেছ।
শারীরিকভাবে সে আমাকে টানতে পারত না—তার গন্ধ বা গা ভরা লোম। বিশাল ভুঁড়ি ছিল, লোহার মতো শক্ত, মুহূর্তের জন্যে শিউড়ে উঠল ব্যারনেস। তবে এসব অগ্রাহ্য করার ট্রেনিং নেয়া ছিল আমার। কিন্তু সে আমাকে আলাদা একটা জগৎ দেখবার সুযোগ করে দেয়। সেটা ক্ষমতা আর টাকার জগৎ। স্বীকার করছি, পিটার এই দুটো জিনিস পছন্দ করি আমি। অল্টম্যান আমাকে শেখাল, কিভাবে টাকা থেকে ফায়দা লুটতে হয়। শেখাল, বিলাসিতা কাকে বলে। সুন্দর জিনিস কিভাবে অর্জন করতে হয়, কিভাবে ব্যবহার করতে হয়, কিভাবে অন্য সবার চেয়ে সুন্দর আর ভালোভাবে বাঁচতে হয়। প্রায়ই সে আমাকে হাসতে হাসতে বলত, আমার প্রিয় কমিউনিস্ট লেডি।
হ্যাঁ, পিটার, আমি নই, সেই আমাকে বোকা বানায়। আমি কে, প্রথম থেকেই জানত সে। জানত, ওডেসায় ট্রেনিং দেয়া হয়েছে আমাকে। আমাকে সে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল। অবশ্যই ভালোবাসত–অন্তত এ কথা বলা যায়, সে তার মতো করে ভালোবাসত। কিন্তু জেনেশুনেই তার সাম্রাজ্যের ভেতরে আমাকে ঢুকতে দিয়েছিল সে, চেয়েছিল আমার আদর্শ আর রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণায় ফাটল ধরাবে। শুধু তখনই জানতে পারলাম, মস্কোয় পাঠানো আমার প্রতিটি তথ্যের ওপর চোখ বুলিয়েছে অল্টম্যান, নিজে সেন্সর করেছে। অল্টম্যান মোসাড ছিল, তাও তুমি জানো। জানো, সে ইহুদি ছিল। এবং আমাকে সে ভাবতে শেখাল আমিও একজন ইহুদি।
অল্টম্যান যত দিন বেঁচে ছিল, তার শিক্ষা আমি ভুলিনি–একজন ইহুদি হয়েই তার সাথে ছিলাম। ইউনিভার্সাল কমিউনিজমের গুরুতর গলদগুলো আমার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সে, পরিচয় করিয়ে দেয় গণতন্ত্র তো আর পশ্চিমা জগতের ক্যাপিটালিস্টিক সিস্টেমের সাথে। আর তারপর ইসরায়েলি ইন্টেলিজেন্স মোসাডের একজন এজেন্ট বানাল আমাকে… আবার থামল ব্যারনেস, ঘন ঘন মাথা নাড়ল।
তার কাছে আমি চিরঋণী হয়ে আছি, পিটার। কি করে তাকে আমি ধ্বংস করার কথা ভাবতে পারি। আমি তাকে কিডন্যাপ করব কি করে। শেষ দিকে, যখন তার আয়ু ফুরিয়ে আসছে, লোকটা ভারী দুর্বল হয়ে পড়েছিল-প্রচণ্ড ব্যথা হত, চাইত সারাক্ষণ আমি তার পাশে থাকি। তখন, পিটার, বলতে পার প্রায় ভালোবেসে ফেলেছিলাম–মা যেমন তার সন্তানকে ভালোবাসে। বেচারা এমন নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল আমার ওপর, দেখে মায়া হত-সে বলত, শুধু আমার স্পর্শ পেলে তবু কিছুটা ব্যথা কমে তার।
তার সেই লোমে ঢাকা পেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাত বুলাতাম, অনুভব করতাম কুৎসিত জিনিসটা তার ভেতর প্রতিদিনই একটু একটু করে বড় হচ্ছে। কাটাছেঁড়া করতে রাজি করানো যায়নি। ওদেরকে সে দুচোখে দেখতে পারত না, বলত ব্যাটারা সব কসাই।
