ব্যাপারটা শুরু হলো খুনসুটি আর হাসাহাসি দিয়ে। নতুন করে পরস্পরকে আবিষ্কারের আনন্দে আঁতকে ওঠার মতো শব্দ করল ওরা, বিড়বিড় করে আমন্ত্রণ জানাল, উৎসাহ দিল, তারপর হঠাৎ করে বদলে গেল পরিস্থিতি। আবেগের প্রচণ্ড ঝড়ে সমস্ত দ্বিধা, ঘৃণা, সন্দেহ, আর নোংরামি ভেসে গেল।
ভালোবাসি, আমি তোমাকে ভালোবাসি, তুমুল ঝড়কে ছাপিয়ে উঠল ব্যারনেসের চিৎকার, যেন এর আগে যা সে করতে বাধ্য হয়েছে সব অস্বীকার করতে চায়। জীবনে এই প্রথম এবং শুধু তোমাকে। পিটারের মনে হলো ম্যাগডার আত্মার গভীর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসা কান্নারই একটা অংশ তার এই চিৎকার।
ঝড়ের কবলে যেখানে ওরা গিয়ে পড়েছিল সেখান থেকে আবার ফিরে আসতে অনেক সময় লাগল ওদের, এক সময় আবার ওরা আলাদা দুটো অস্তিত্ব লাভ করল। আর দুজনেই উপলব্ধি করল, জীবনে আর কখোনোই ওরা সম্পূর্ণভাবে আলাদা হতে পারবে না। আজকের এই মিলন ওদেরকে শুধু দৈহিক বন্ধনেই জড়ায়নি।
.
স্টার্নের কিনারা থেকে পানিতে অ্যাভন এস ডিঙ্গি নামাল পিটার, তীরে পৌঁছে পাম গাছের সাথে বেঁধে রাখল সেটা।
দ্বীপের ভেতর দিকে হাঁটা ধরল ওরা, পরস্পরের হাত ধরে আছে, পথ করে নিল সামুদ্রিক পাখিদের তৈরি বাসাগুলোর মাঝখান দিয়ে। ছয় কি সাত প্রজাতির পাখি বিশ একর দ্বীপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ডিম পাড়ছে–কোনোটা ম্লান নীল, হাঁসের ডিমের মতো বড়; কোনোটার গায়ে রঙচটে ফোঁটা, লিচুর দানার মতো আকার। গোটা দ্বীপ পাখা ঝাপটানো আর তীক্ষ্ণ কর্কশ আওয়াজে মুখর।
প্রতিটি প্রজাতির জুয়োজিক্যাল নাম জানা আছে ব্যারনেসের, কার কি অভ্যেস বা দোষ সব তার নখদর্পণে। সহিষ্ণু কান পেতে তার কথা শুনে গেল পিটার, বুঝতে অসুবিধে হলো না এই আলাপচারিতার সুযোগ ম্যাগডা আসলে ওর দায়ের করার অভিযোগের উত্তর তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
দ্বীপের শেষপ্রান্তে নিসঙ্গ একটা বিশাল টাকামাকা গাছ রয়েছে, সবুজ পাতাসহ বিশাল ডালগুলো ছায়া ফেলেছে সাদা বালিতে। ইতোমধ্যে তেতে উঠেছে রোদ, যেন গরম পানিতে ভেজানো উলের কম্বল গায়ে জড়িয়ে রেখেছে ওদেরকে।
কৃতজ্ঞচিত্তে টাকামাকার চায়ার আশ্রয় নিল ওরা, পাশাপাশি বসে চোখ মেলে দিল লেগুনের শান্ত স্থির পানিতে। প্রধান দ্বীপটা অনেক, প্রায় পাঁচ মাইল দূরে। এত দূর থেকে বাড়ি বা জেটি কিছুই দেখা গেল না। প্রাগৈতিহাসিক যুগের তাজা আর নির্দোষ পৃথিবীর প্রথম পুরুষ আর প্রথম নারী বলে মনে হলো নিজেদেরকে পিটারের।
জেগে জেগে স্বপ্ন দেখায় বাধা দিল ব্যারনেস, তার একটা প্রশ্ন ধপ্ করে কঠিন বাস্তবে ফিরে এল ও।
কে আমাকে খুন করার নির্দেশ দিয়েছিল, পিটার?
ঘার ফিরিয়ে তাকাল পিটার।
কিভাবে দেয়া হয় নির্দেশটা? আবার জিজ্ঞেস করল ব্যারনেস। নিজের সম্পর্কে বলার আগে এসব আমার জানতে হবে।
কেউ না, বলল পিটার।
কেউ না? পার্কারকে খুন করার নির্দেশসহ একটা চিরকুট পেয়েছিলে তুমি, সে ধরনের চিরকুট পাওনি?
না।
পার্কার, বা কলিনের কাছ থেকে? তারা তোমাকে কাজটা করার অনুরোধ করেনি-বা পরামর্শ দেয়নি?
ডক্টর পার্কার বিশেষভাবে নিষেধ করে দিয়েছিল কাজটা করতে। তোমাকে স্পর্শ করার চলবে না-যতক্ষণ না তুমি হাতেনাতে ধরা পড়ো।
ব্যাপারটা তাহলে তোমার নিজের সিদ্ধান্ত ছিল? ওটা আমার দায়িত্ব ছিল।
মেয়ের ওপর নির্যাতনের প্রতিশোধ?
হ্যাঁ, সেটা একটা কারণ ছিল, বলল পিটার। কিন্তু তার আগে অন্য কারণও তৈরি হয়েছিল। জিরো-সেভেন-জিরো হাইজ্যাক করার পর রক্তপাত ঘটে, যারা দায়ী তাদেরকে শাস্তি দেয়া আমার কর্তব্য বলে মনে করেছিলাম আমি। পরে আরো কারণ যোগ হয়–ব্যারন অল্টম্যান হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ। তাছাড়া, খলিফা অশুভ একটা শক্তি, দুনিয়াকে নিজেদের জন্যে স্বর্গ বানাতে চায়। একজন সৈনিক হিসেবে আমার দায়িত্ব তাকে খতম করা।
খলিফা আমাদের সম্পর্কে জানে। নিজেদের আমরা যতটা বুঝি, আমাদেরকে তারচেয়ে ভালো জানে সে। আমি কাওয়ার্ড নই, পিটার, কিন্তু এখন আমি সত্যি ভয় পাচ্ছি।
তার ব্যবসার মূলধনই তো ভয়, বলল পিটার। লক্ষ্য করল একটু কাছ ঘেঁষে এল ম্যাগডা-শারীরিক সংস্পর্শের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। তার নগ্ন কাঁধে একটা হাত রাখল ও, ওর গায়ের ওপর হালকাভাবে ঢলে পড়ল ব্যারনেস।
কাল রাতে তুমি যা বলেছ সব সত্যি, শুধু অনুমান আর কল্পনাগুলো মিথ্যে। বাবার মৃত্যু, তারপর তার বাড়িতে নিঃসঙ্গ সময় কাটানো-চাদরের তলায় মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার ইতিহাস। পোল্যান্ড ফিরলাম, ওখান থেকে আমাকে ওডেসায় নিয়ে যাওয়া হলো–সবই সত্যি, এবং তিক্ত অভিজ্ঞতা। ওডেসা কলেজে কিভাবে ট্রেনিং দেয়া হয় তুমি জানো, শিউরে উঠল ব্যারনেস। একদিন তোমাকে ওডেসার গল্প শোনাব।
আমার আগ্রহ নেই।
বলতে না হলে বেঁচে যাই। প্যারিসে আসার পর কি ঘটল শুনবে?
শুধু যেটুকু প্রয়োজন।
হ্যাঁ, পিটার, পুরুষমানুষ ছিল। মুগ্ধ করার ট্রেনিংই তো দেয়া হয়েছিল আমাকে। হ্যাঁ, ওদের সাথে মিশেছি বৈকি…থেমে গিয়ে দুহাতে পিটারের গাল ধরল ব্যারনেস, নিজের দিকে ফেরাল মুখটা যাতে ওর চোখ দেখতে পায়। তাতে কি আমাদের সম্পর্কে বদলে যাবে, পিটার?
আমি তোমাকে ভালোবাসি, দৃঢ় কণ্ঠে বলল পিটার।
