এমন মারই মেরেছ, গালে একটা চুমো খাওয়ার জায়গা পর্যন্ত রাখনি?
ঝুঁকে ম্যাগডার ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াল পিটার, কিন্তু হাসল না। মেলিসা কিডন্যাপ হওয়ার আগের সব ঘটনা তুমি জানো। সব আমি তোমাকে বলেছিলাম, কিছুই বাদ দিইনি, একটা মিথ্যে কথা বলিনি, একবারও…, শুরু করল পিটার, মেলিসাকে কিভাবে উদ্ধার করা হলো তার বিশদ বর্ণনা দিল। তখন আমার মানসিক অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, যে যা বলে সব বিশ্বাস করতে রাজি, মেলিসাকে উদ্ধার করার জন্যে যে কোনো কাজ করতে পারি। বলল ডক্টর কিংস্টোন পার্কারকে নিজের অজান্তেই খুন করার প্ল্যান করে ও। লারাগের পোডড়াবাড়ির ঠিকানা কিভাবে পেল তাও বলল। কে যে টেলিফোনে খবরটা দিয়েছিল আর জানা যায়নি। তারপর ওরা আমাকে জানাল, তুমি খলিফা।
কে? ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল ম্যাগডা।
অ্যাটলাসের প্রেসিডেন্ট।
পার্কার?
হ্যাঁ, তিনি আর কলিন নোবলস্।
কি বলল ওরা?
তুমি তখন খুব ছোট, বাবা তোমাকে প্যারিসে নিয়ে আসেন। তখনই নাকি তোমার মেধার কথা জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। তারপর বাবা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেলেন। বাবার বন্ধুরা তোমাকে নিয়ে গেল। তোমার প্রতিভা দেখে কারা যেন তোমাকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করল। একজন লোককে কাকা বানিয়ে পাঠাল তারা…।
দশ বছর ধরে বিশ্বাস করেছি সত্যি সে আমার কাকা ছিল…, অনেক কষ্টে নিজেকে থামাল ম্যাগডা, তারপর নিস্তেজ, বিষণ্ণ গলায় আবার বলল, বাবা মারা যাবার পর জানলাম সেই একমাত্র আমার আপনজন…।
তোমাকে ওডেসায় পাঠানোর জন্যে নির্বাচিত করা হলো…
আড়ষ্ট হয়ে গেল ম্যাগডা। তুমি… তুমি ওডেসার ব্যাপারটাও জানো, পিটার?
ওখানে তোমাকে ট্রেনিং দেয়া হয় অনেক বিষয়ে।
হ্যাঁ।
যেমন, খালি হাতে কিভাবে একজন মানুষকে খুন করতে হয়।
পিটার, চেষ্টা করলেও শেষপর্যন্ত আমি তোমাকে খুন করতে পারতাম বলে বিশ্বাস করি না। অন্তত আমার অবচেতন মন থেকে প্রবল একটা বাধা নিশ্চয় আসত। ঘটেছেও ঠিক তাই। আমার যা ট্রেনিং, তোমার বাঁচার কথা ছিল না। বেঈমানী করেছ বলে ঘৃণা হয়েছিল, কিন্তু ভালোবাসার অস্তিত্ব ছিল…
আবার তুমি কথা বলছ।
তারপর যখন জানলাম, তুমি আমাকে খুন করতে যাচ্ছ, প্রায় অবাস্তব মতো লাগল ব্যাপারটা। মৃত্যুকে মেনে নিতে তখন আর খারাপ লাগল না, কারণ ভালবাসা পেয়ে আবার হারানোর ব্যথা…
চুপ করবে?
মুখে একটা কিছু দাও-না, ঠোঁটে।
ম্যাগডাকে চুমো খেয়ে আবার শুরু করল পিটার, ওডেসায় ট্রেনিং নিলে তুমি। রাশিয়ার হয়ে কাজ করার জন্যে তৈরি করা হলো তোমাকে। সব সত্যি, তাই না?
সব। আরো একটু জোরে পিটারের পিঠ জড়িয়ে ধরল ম্যাগডা। তোমাকে আর কখনো মিথ্যে কথা বলব না, পিটার।
তারপর ওরা তোমাকে প্যারিসে পাঠাল? জিজ্ঞেস করল পিটার, উত্তরে মাথা ঝকাল ম্যাগডা। এসেই প্যারিসকে তুমি জয় করে নিলে। কোনো পুরুষের সাধ্য ছিল না তোমাকে এড়িয়ে যায়…।
কোনো মন্তব্য বা প্রতিবাদ করল না ম্যাগডা, তবে চোখ থেকে চোখ সরাল না।
আর তারা সবাই সুদর্শন, শক্তিশালী, ক্ষমতাবান পুরুষ ছিল। সংখ্যায় অনেক, কতজন কেউ বলতে পারে না। তাদের সবার কাছ থেকে রাশিয়ার জন্যে তথ্য সংগ্রহ করতে তুমি…
বেচারা, ফিসফিস করে বলল ম্যাগডা। এ-সব কথা ভেবে নিজেকে তুমি কষ্ট দিচ্ছো?
তোমার ওপর ঘৃণা আরো বেড়ে যায় আমার।
হ্যাঁ, বুঝতে পারি। কিন্তু তোমার অশান্তি দূর করার জন্যে কিছুই বলার নেই আমার শুধু এইটা বাদে! তোমার সাথে পরিচয় হবার আগে কাউকে আমি ভালোবাসিনি।
কথা রাখছে ম্যাগডা। এখন থেকে আর সে মিথ্যে বলবে না, ছলনার আশ্রয় নেবে না। পিটার নিশ্চিতভাবে জানে।
তারপর ওরা তোমাকে নির্দেশ দিল ব্যারন অল্টম্যানের বিশ্বাস অর্জন কর, তার শিল্প সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নাও…
না, নিচু গলায় কথাটা বলে মাথা নাড়ল ম্যাগডা। সিদ্ধান্তটা আমার ছিল। আমার জীবনে সেই একমাত্র পুরুষ ছিল যাকে আমি…, মাথার পিছনে হাত নিয়ে গিয়ে হুইস্কির গ্লাসটা বেঞ্চ থেকে তুলল সে, এক চুমুক খেয়ে গলা ভেজাল,… যে আমাকে জাদু করেছিল। এরকম মানুষ কোথাও আমি দেখিনি। তার গায়ের জোর সম্পর্কে বললে তুমি বিশ্বাস করবে না। আর ছিল ক্ষমতা-টাকার ক্ষমতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, যোগাযোগের ক্ষমতা, প্ল্যানিংয়ের ক্ষমতা। ওহ পিটার, মস্ত একটা আগ্নেয়গিরি মনে হত তাকে আমার।
ইতোমধ্যে একই ধরনের কাজ করে তুমি বোধ হয় একঘেয়েমিতে ভুগছিলে…।
বিভিন্ন লোকের সাথে প্রেমের অভিনয় করা, তারপর সবাইকে ফাঁকি দেয়া, কি যে কঠিন কাজ… এই প্রথম ক্ষীণ একটু হাসল ম্যাগডা, যেন নিজেকে ব্যঙ্গ করল।
অল্টম্যানের বিশ্বাস অর্জন করলে তুমি অসুস্থ ছিল সে, যোগ্য একজন কাউকে হয়তো মনে মনে খুঁজছিল, তোমাকে পেয়ে হাতে যেন স্বর্গ পেয়ে গেল। সে তোমাকে বিশ্বাস করায় তার ব্যবসার গোপন তথ্য জানার সুযোগ হলো তোমার, সব তুমি রাশিয়ায় পাচার করতে লাগলে। ওদের কাছে তোমার দাম একশ গুণ বেড়ে গেল।
কথা বলছে ওরা, আর ওদিকে ধীরে ধীরে রঙ বদলে ফুরিয়ে যাচ্ছে দিনের মেয়াদ, পোর্টহোলের বাইরে গোলাপ রাঙা মেঘ একটু একটু করে ফ্যাকাসে হয়ে এল। কেবিনের ভেতর ম্লান হতে থাকল আলো, এক সময় শুধু ব্যারনেস ম্যাগডার মুখটা কোমল আলো হয়ে ফুটে থাকল পিটারের চোখের নিচে। সুরটা অভিযোগের নয়, মৃদুকণ্ঠে বলে চলেছে পিটার। ম্যাগডা শুধু মাঝেমধ্যে দু-একবার প্রতিবাদের ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল, অথবা আঙুল দিয়ে জোরে হঠাৎ দু-একবার চেপে ধরল পিটারের বাহু। কখনো চোখ বুঝল সে, তিক্ত ঘটনাগুলো স্মরণ করতে চায় না।
