আরেকটু ব্যাখ্যা করল পিটার, কারণ আমি যখন জানলাম তুমিই খলিফা তখন তোমাকে খুন না করে আমার কোনো উপায় ছিল না…
মনে হলো প্রাণপণ চেষ্টা করে শক্তি সঞ্চয় করছে ম্যাগডা, যেন কি একটা জরুরি কথা তাকে বলতে হবে। গলায় আওয়াজ ফুটল, কিন্তু অস্পষ্ট। কিন্তু করলে না কেন, পিটার? মেরেই তো ফেলেছিলে, শেষ মুহূর্তে বাঁচালে কেন?
কারণ…. কারণটা হঠাৎ করেই উপলব্ধি করল পিটার, কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর কিছু কোনো ব্যাপার নয়।
ডুকরে উঠল ম্যাগডা, ত্রিশ সেকেন্ড ঘনঘন হাঁপাল। তারপর জিজ্ঞেস করল সে, এখনো তুমি মনে কর আমি খলিফা?
জানি না। না জানায় এই মুহূর্তে কিছু এসেও যায় না। শুধু জানি তোমাকে আমি ভালোবাসি।
কেন এমন হলো, পিটার? বিড়বিড় করে উঠল ম্যাগডা। ঈশ্বর, এমন হলো কেন?
তুমি খলিফা, ম্যাগডা?
কিন্তু পিটার, তুমি আমাকে খুন করতে যাচ্ছিলে! ছুরিটা তো সেই পরীক্ষাই ছিল। খলিফা তো তুমি!
৬. কোরাল রীপের ভেতর
ব্যারনেসের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা পেয়ে কোরাল রীপের ভেতর সরু একটা প্যাসেজ ধরে ক্রীশ-ক্রাফট চালাল পিটার, রীফটা ঘিরে আছে ইল দ্র ইউসিউ-কে। পাখিদের পাখা ঝাপটানোর আওয়াজে কান পাতা দায় হলো, ঝাঁক বেঁধে মেঘের মতো ওদের মাথার ওপর আকাশ ঢেকে দিল ওগুলো। দ্বীপটার যেদিকে টানা বাতাস লাগছে তার উল্টো দিকে পাঁচ ফ্যাদম গভীরতায় নোঙর ফেলল পিটার, তারপর ভি.এইচ.এফ, রেডিওর সাহায্যে প্রধান দ্বীপটার সাথে যোগাযোগ করল, কথা বলল হেড, বোটম্যানের সাথে। ব্যারনেস সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাতটা তিনি বোটে কাটাবেন, ব্যাখ্যা করল ও। দুশ্চিন্তা কোরো না।
সেলুনে ছিল পিটার, ইতোমধ্যে নিজের চেষ্টায় ওঠা বসার মতো সুস্থতা ফিরে এসেছে ব্যারনেস ম্যাগডার। লকার থেকে টাওয়েলিং ট্র্যাক স্যুট বের করে পরেছে। সে, কুৎসিত দাগটা ঢাকার জন্যে গলায় একটা ভোয়ালে জড়িয়েছে। লকার খুলে মেডিসিন বক্স বের করল পিটার, আপত্তি সত্ত্বেও দুটো ক্যাপসুল আর দুটো ট্যাবলেট গিলতে করতে হলে ম্যাগডাকে। তারপর তার গলা থেকে তোয়ালে নামাল পিটার, আঙুলের ডগা দিয়ে আন্টিসেপটিক মলম মাখিয়ে দিল কালচে দাগের ওপর।
এখন আর জ্বালা করছে না, আরাম লাগছে, অস্ফুট বলল ম্যাগডা, চিচি করে আওয়াজ বেরুল। একটা শব্দও পরিষ্কার করে উচ্চারণ করতে পারছে না সে, ভেঙ্গে গেছে গলা।
এবার দেখি পেটের কি অবস্থা। প্যাড লাগানো বেঞ্চে ধীরে ধীরে ম্যাগডাকে শুইয়ে দিল পিটার, টাউয়েলিং স্যুটের চেইন খুলল কোমর পর্যন্ত। ওর জোড়া পায়ের লাথিটা ম্যাগডার শুধু পেটে নয়, বুকেও লেগেছিল–স্তনের ঠিক নিচ থেকে নাভি পর্যন্ত লম্বা লালচে দাগ ফুটে আছে, ফুলে আছে মাংস। চামড়ায় মলমের প্রলেপ পড়তেই চোখ বুজল ব্যারনেস, আরাম পেয়ে অকুট-উ-আহ করতে লাগল। পিটারের কাজ শেষ হতে ধীরে ধীরে দাঁড়াল সে, একটু কুঁজো হয়ে পনেরো মিনিটের জন্যে বাথরুমে ঢুকল। এই ফাঁকে নিজের ক্ষতগুলোর যত্ন নিল পিটার। মুখ ধুয়ে, চুলে চিরুনি চালিয়ে বেরিয়ে এল ম্যাগডা, দেখল তার জন্যে গ্লাসে হুইস্কি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পিটার। বেঞ্চের ওপর পাশাপাশি বসল ওরা।
তুমি, পিটার? হঠাৎ উদ্বেগে অধীর দেখাল ম্যাগডাকে। তোমার কি অবস্থা?
মাত্র একটা কথা বলার আছে আমার। আগাম নোটিস দিয়ে দেখবে, যাতে পালিয়ে বাঁচার একটা সুযোগ পাই। ওরে বাপরে বাপ!
হঠাৎ হাসতে গিয়ে গলায় ব্যথা পেল ম্যাগডা, পিটারকে ধরে ঝুলে পড়ল, বার কয়েক কাশল খক খক করে।
ম্যাগডা শান্ত হতে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল পিটার, কথা হবে কখন? হওয়া দরকার, তাই না?
হ্যাঁ, জানি, কিন্তু এখন নয়, পিটার। আরো কিছুক্ষণ আমাকে ধরে থাকো। এবং আজ যেন নতুন করে উপলব্ধি করল পিটার প্রিয় নারীদেহ শরীরের সাথে সেঁটে থাকলে ব্যথা-বেদনা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। ওর গলায় নাক ঘষল ম্যাগডা, আর ম্যাগডার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল পিটার। বললে, কিছুক্ষণ পর মুখ খুলল ম্যাগডা, আমাকে তুমি ভালোবাস। প্রশ্নের সুরে কথাটা বলা হলো, নতুন করে আশ্বস্ত হতে চাইছে, যা প্রতিটি প্রেমিক-প্রেমিকারই হতে চাওয়া একান্ত উচিত।
হ্যাঁ, ভালোবাসি তোমাকে। প্রথম থেকেই ব্যাপারটা জানতাম, কিন্তু যখন বুঝলাম তুমি খলিফা, মনের অনেক গভীরে মাটি চাপা দিয়েছিলাম ওটাকে-কিন্তু ছিল।
আমি খুশি, সাদামাঠা স্বীকারোক্তি ম্যাগডার। কারণ তুমি দেখেছ আমিও তোমাকে ভালোবাসি। ধরে নিয়েছিলাম, ও জিনিস কখনো আমার জীবনে আসবে না। নিজেকেই দোষ দিতাম, আমি ভালোবাসতে জানি না। তারপর তোমাকে দেখলাম, পিটার। থেমে গেল সে, যেন তোমাকে দেখলাম আর তোমাকে ভালোবাসলাম সমার্থক। কিন্তু তারপরই ওরা আমাকে বলল তুমি নাকি আমাকে খুন করবে। বলল, তুমি খলিফা। ইস, মনে হচ্ছিল আমি মারা যাব। তোমাকে পেলাম কিন্তু হারাতে হবে। নিয়তির এই নিষ্ঠুরতা আমার সহ্য হচ্ছিল না, পিটার। ব্যাপারটা যে মিথ্যে সেটা প্রমাণ করার একটা সুযোগ তোমাকে না দিয়ে আমার উপায় ছিল না।
কথা বোল না, ম্যাগডাকে কোলের আরো ভেতরে টেনে নিয়ে প্রায় শুইয়ে দিল পিটার। আমার গলা ভাঙেনি, কাজেই প্রথমে আমি বলি–কি জানি, কিভাবে জানলাম তুমি খলিফা।
