আবার মাথা ঝাঁকাল ম্যাগডা, চেহারা দেখে মনে হলো পরবর্তী প্রশ্ন কি করবে ভাবছে। কিন্তু আবার সেই একটাই শব্দ বেরুল মুখ থেকে। কেন?
এই কেনর কোনো উত্তর দিতে পারল না পিটার।
তারপর কতটা সময় বয়ে গেল ওরা বলতে পারবে না। পিটারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ম্যাগডার দুচোখ ভরে উঠল পানিতে। চোখ উপচে শিশিরের মতো স্বচ্ছ ফোঁটাগুলো গড়াতে শুরু করল। চিবুক থেকে ঝরে পড়ল ডেকের ওপর। আবার সে ক্রল করে এগোবার চেষ্টা করল, কিন্তু ফোঁপাতে শুরু করায় জোর পেল না গায়ে। ডেকের ওপর মুখ থুবড়ে নেতিয়ে পড়ল সে। চাইছে, কিন্তু পিটারও শক্তি পাচ্ছে না তার দিকে এগোয়। পেশিগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে বেশ অনেকগুলো সেকেন্ড লেগে গেল, হাড়হীন কাঠামো নিয়ে একটা বস্তা যেন ঢলে পড়ল ডেকের ওপর, ম্যাগডার পাশে স্থির হয়ে গেল পিটার। স্থির হয়ে গেছে ম্যাগডাও। যাক তাহলে সফল হওয়া গেছে ভেবে খুশি হবার চেষ্টা করল পিটার, কিন্তু তার বদলে আতঙ্ক গ্রাস করল ওকে। হঠাৎ কোত্থেকে যেন শক্তি ফিরে এল, ব্যস্ত হাত বাড়িয়ে ম্যাগডার মাথাটা তুলে নিল কোলের ওপর।
মৃদু ঝাঁকি দিল পিটার, ম্যাগডার মাথা ওর কোলের ওপর অবলম্বনহীন নারকেলের মতো দোল খেল। এতক্ষণে কথাগুলো আবার স্মরণ হলো ওর।
ওরা আমাকে সাবধান করে দিয়েছিল।
তারপর, কিন্তু আমি ওদের কথা বিশ্বাস করিনি।
সবশেষে, তুমি নও।
কথাগুলো মনে পড়ল, সেই সাথে নিজের ব্যর্থতার কারণও আবিষ্কার করল পিটার। অর্থ না বুঝলেও, কথাগুলো ম্যাগডা বলেছিল বলেই তাকে খুন করতে পারেনি ও। খুন করার দৃঢ় সিদ্ধান্তে চিড় ধরেছিল।
ম্যাগডাকে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে রেখেছে পিটার, অসাড় শরীরটা নড়ে উঠল একটু। ঘাড়টা এখনো নড়বড় করছে, যেন কোনো হাড় নেই। মনে হলো বিড়বিড় করে ওর নাম উচ্চারণ করল ম্যাগডা। শব্দটা বাস্তবে ফিরিয়ে আনল ওকে। বিরাট ক্রীশ-ক্রাফট এখনো সগর্জনে ছুটে চলেছে। খোলা সাগরে আগেই বেরিয়ে এসেছে ওরা।
আস্তে করে শরীরটা ডেকে নামিয়ে রাখল পিটার, টলতে টলতে মই বেয়ে উঠল। প্রথমবার পিটার ছুরি চালাবার পর থেকে ম্যাগডার হাল ছেড়ে দেয়া পর্যন্ত গোটা ব্যাপারটা দুই মিনিটও স্থায়ী হয়নি।
কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে এসে পিটার দেখল, ক্রীশ-ক্রাফট অটোমেটিক পাইলটে চলছে। তার মানে বোট নিয়ন্ত্রণ করার ভান করছিল ম্যাগডা, আসলে ও আক্রমণের অপেক্ষায় তৈরি হয়ে ছিল।
গোটা ব্যাপারটার অর্থ এখনো পরিষ্কার নয়। পিটার শুধু বুঝল, হিসেবে কোথাও একটা মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে ওর। অটোমেটিক স্টিয়ারিংয়ের সুইচ অফ করে দুটো থ্রটলই বন্ধ করে দিল ও, ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে এল ইঞ্জিনের আওয়াজ। গতি স্থির হবার পর বাতাস আর স্রোতের মধ্যে পড়ে ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করল বোট।
স্টার্নের ওপর দিয়ে পিছন দিকে একবার তাকাল পিটার। দিগন্তরেখার কাছে দ্বীপটা মোটা একটা রেখার মতো লাগল। আবার টলতে টলতে মই বেয়ে নেমে এল
মাথা তুলেছে ম্যাগডা, আধশোয়া অবস্থায় উঁচু হয়ে রয়েছে ডেকে। কিন্তু পিটারকে দেখেই কুঁকড়ে গেল, এবং এই প্রথমবার তার চোখে আতঙ্ক বাসা বাঁধতে দেখল পিটার।
ভয় পেয়ো না, বলর পিটার, নিজের কানেই কর্কশ শোনাল। ম্যাগডা ওকে ভয় পাচ্ছে দেখে নিজের ওপর ঘৃণা বোধ করল ও। চায় না ম্যাগডা আর কখনো ভয় পাক ওকে।
পাশে বসে ম্যাগডাকে দুহাতের ওপর তুলে নিল পিটার, ওর হাত আর বুকের ওপর আড়ষ্ট হয়ে থাকল ব্যারনেস–এখন কি ঘটবে জানা নেই তার। তৃতীয়বারের চেষ্টায় ম্যাগডাকে বুকে নিয়ে সিধে হয়ে দাঁড়াতে পারল পিটার। ভয় পেয়ো না, আবার বলল কথাটা, তাকে নিয়ে ক্রীশ-ক্রাফটের সেলুনে ঢুকল। ওর নিজের শরীরও দুমড়েমুচড়ে কাহিল হয়ে পড়েছে, যেন কোনো একটা হাড়ও আগের মতো শক্ত নেই। ম্যাগডাকে এত যত্নের সাথে আর আলতোভাবে বয়ে নিয়ে এল যে ধীরে ধীরে তার পেশিতে ঢিল পড়ল, ওর শরীরের সাথে মোমের মতো গলে গেল সে।
লেদারের প্যাড লাগানো বেঞ্চে তাতে শুইয়ে দিল পিটার। সিধে হতে যাবে, এক হাতে ওর গলা জড়িয়ে ধরে ঝুলে পড়ল ম্যাগডা, সরতে দেবে না।
ছুরিটা আমিই ওখানে রেখেছিলাম, খসখসে গলায় বলল ম্যাগডা। পরীক্ষা করার জন্যে।
মেডিকেল চেষ্টটা খুলতে দাও, নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করল পিটার।
না। মাথা নাড়াল ম্যাগডা, অমনি চোখ কুঁচকে মুখ বিকৃত করল গলায় ব্যথা পেয়ে। কোথাও যেয়ো না, পিটার। থাকো আমার সাথে, প্লিজ। কি রকম হচ্ছে আমার বুঝতে পারছি না। ছুরিটা নিয়ে ডেকে তুমি উঠে এলে, তোমাকে আমি খুন করব-বুঝতে পারছ কি বলছি? প্রায় ঘটে গিয়েছিল ব্যাপারটা, ওহ গড়! কি হয়েছে আমাদের, পিটার। আমরা এমন করছি কেন? দুজনেই কি পাগল হয়ে গেছি?
মরিয়া হয়ে পিটারকে জড়িয়ে রাখল ম্যাগডা, ডেকে হাটু গেড়ে তার মুখের দিকে ঝুঁকে পড়ল পিটার। বোধ হয় তাই। গোটা ব্যাপারটা আমার কাছেও দুর্বোধ্য, নিজেকেও বুঝতে পারছি না।
কেন, পিটার–কেন ছুরিটা নিতে গেলে তুমি? প্লিজ, বল আমাকে। মিথ্যে বোল না, সত্যি কথা বল। আমাকে জানতে হবে কেন।
কারণ মেলিসাকে তুমি নির্যাতন করেছ, কারণ…
বাধা দিয়ে কিছু বলতে গিয়েও পারল না ম্যাগডা, তার গলা বুজে এল।
