দুজনেই কেবিন বাল্কহেডের ওপর ছিটকে গিয়ে পড়ল, মরিয়া হয়ে মুঠোর ভেতর ম্যাগডার কিছু একটা ধরতে চেষ্টা করল পিটার। মখমলের মতো পিচ্ছিল এক গোছা চুল পেয়ে ভেতরে আঙুল ঢোকাল ও।
আহত পশুর মতো বেপরোয়া শক্তিতে ধস্তাধস্তি শুরু করল ম্যাগডা। শরীরের সমস্ত জোর দিয়েও তাকে নিচে চেপে রাখা অসম্ভব বলে মনে হলো। এলোপাতাড়ি ঘুষি খেল পিটার, থেঁতলে গেল সারা মুখ, নখের আঁচড়ে ছিঁড়ে গেল গলার চামড়া। তবু মাথাটা ম্যাগডাকে তুলতে দিল না ও, হাতে পেঁচানো চুলের গোছা ছাড়ল না। শুধু শরীরের ভার চাপিয়ে তাকে এই প্রথম কোণঠাসা করে ফেলেছে পিটার।
বুকের নিচে ম্যাগডাকে সিধে করল ও, দুটো শরীরের মাঝখানে একটা হাত ঢুকিয়ে রেখেছে। অপর হাতটা এখনো চুলের গোছা ধরে আছে, অদ্ভুতভাবে বেঁকে আছে মাথাটা, সাদা গলা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং অরক্ষিত। থেকে থেকে নিঃশ্বাস ফেলছে ম্যাগডা, ঠোঁটের কোণে ফেনা। কাঠের লগিটাও জোড়া লেগে থাকা দুটো শরীরের মাঝখানে আড়াআড়িভাবে আটকে আছে।
তার এই মৃত্যু চাক্ষুষ করা পিটারের জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্যে সবচেয়ে ভীতিকর।
দুজনের কেইই কথা বলছে না, ফেস ফস শব্দের সাথে নিঃশ্বাস ফেলছে শুধু, পরস্পরের দিকে তকিয়ে আছে চোখে খুনের নেশা আর ঘৃণা নিয়ে। ইতোমধ্যে গোটা শরীর ম্যাগডার ওপর তুলে ফেলেছে পিটার, হঠাৎ একটু উঁচু হয়ে বোট হুকটাকে সামান্য সরাল ও, বুক থেকে গলায় নেমে গেল সেটা। মাথাসহ গলাটা সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলেও দেরি করে ফেলল ম্যাগডা, এটা সে আশা করেনি। বা হাতে এখনো ম্যাগডার চুল ধরে আছে পিটার, দুজোড়া চোখের মাঝখানে ছয় ইঞ্চি ব্যবধান, ওর নাক আর মুখ থেকে রক্তের ফোঁটা চিবুক গড়িয়ে ম্যাগডার গলায় আর স্তনে পড়ছে।
ম্যাগডার চুল ধরা হাতটা ব্যবহার করল পিটার, কনুই দিয়ে বোট-হুঁকের গায়ে চাপ দিতে লাগল। ধীরে ধীরে গলায় চেপে বসল সেটা।
হেরে যাচ্ছে বুঝতে পারলেও হাল ছাড়ল না ব্যারনেস। কিন্তু যতই সে ধস্তাধস্তি করল ততই ক্ষয় হতে লাগল শক্তি। বোট-হুঁকের ওপর আরো বেশি চাপ দিতে পারল পিটার। ম্যাগডার মুখে আটকা পড়ছে রক্ত, প্রথমে লাল তারপর কালচে হয়ে গেল চামড়া। ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে।
অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীরটা আবার একটু নাড়ল পিটার, জানে একটু ঢিল দিলেই মোচড় খেয়ে বেরিয়ে যাবে ম্যাগডা তলা থেকে। পিটারের এই নড়াচড়ার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারল ব্যারনেস। বোট-হুঁকটা আর যদি এক ইঞ্চির আট ভাগের এক ভাগ গলার ভেতর দেবে যায়, চিরকালের জন্যে নিঃশ্বাস ফেলা বন্ধ হয়ে যাবে তার। পিটারের চোখে তাকাল ম্যাগডা, সেখানেও দেখতে পেল নিজের মৃত্যু।
এই প্রথম কথা বলল সে। শুধু ঠোঁট নড়ল, আওয়াজ যেটা বেরুল তার কোনো অর্থ পিটারের কানে ধরা পড়ল না। তারপর আবার শব্দগুলো উচ্চারণ করল সে, পিটারের মনে হলো ভুল শুনছে ও।
ওরা আমাকে সাবধান করে দিয়েছিল।
প্রবল একটা ঝাঁকির সাথে ঝামেলা শেষ করতে যাচ্ছে পিটার। কানে এল, কিন্তু আমি ওদের কথা বিশ্বাস করিনি, অস্কুট ধ্বনি, কোনো রকমে শোনা গেল। নট ইউ।
তারপরই বাধা দেয়ার শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল ম্যাগডার, তার শরীর সম্পূর্ণ নেতিয়ে গেল। অবশেষে মৃত্যুকে চরম নিয়তি বলে মেনে নিয়েছে সে। তার সেই মায়াভরা চোখ থেকে নিভে গেল সবুজ আলো, একেবারে শেষ মুহূর্তে তার বদলে এমন গাঢ় বিষণ্ণতা ফুটল যেন গোটা দুনিয়া তার সাথে বেঈমানী করেছে, কেউ তার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখেনি।
পিটারকে এখন কেউ বাধা দিচ্ছে না, শেষ একটা ধাক্কার সাথে বোট-হুঁকটা গলায় আরেকটু দাবিয়ে দিলেই কাজ ফুরোয়। কিন্তু পারল না ও। একটা গড়ান দিয়ে ডেকে নামল, বোট-হুঁকটা তুলে ছুঁড়ে দিল ককপিটের দিকে। বাল্কহেডে গিয়ে বাড়ি খেল সেটা। ম্যাগডার দিকে সম্পূর্ণ পিছন ফিরে ক্রল করে এগোল পিটার, জানে এখনো বেঁচে আছে ম্যাগডা, গোক্ষুরের মতোই বিপজ্জনক-অথচ কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না। রেইলের নিচে পৌঁছে সিধে হলো ও। ধীরে ধীরে ঘুরল ম্যাগডার দিকে। থরথর করে কাঁপছে পিটার, খটাখট বাড়ি খাচ্ছে দুসারি দাঁত। রেইল ধরে টলতে লাগল। ঝাপসা চোখে দেখল, ক্রল করে এগোচ্ছে ম্যাগডা! প্রতিবার এক ইঞ্চি এগোতে পারছে সে। তার একটা হাত গলায়, তাকিয়ে আছে ওর দিকেই।
ম্যাগডার নগ্ন ধড় পিটারের রক্তে পিচ্ছিল হয়ে আছে। আগের চেয়ে বড় দেখাল মুখটা, ফুলে গেছে। মাথার বিশৃঙ্খল চুলে প্রায় ঢাকা পড়ে আছে মুখ। ককপিটের মাঝখানে যেন একটা জটাবুড়ি হামাগুড়ি দিচ্ছে। বোট-হুঁকের দাগ লাল আর কালচে হয়ে ফুটে আছে গলার ওপর, নিঃশ্বাসের সাথে স্তন জোড়া উঁচু আর নিচু হচ্ছে ঘন ঘন।
পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে ওরা, কথা বলার শক্তি নেই, দুজনেই ক্লান্তির শেষ ধাপে পৌঁছে গেছে।
মাথা ঝাঁকি দিল ম্যাগডা, যেন গোটা ব্যাপারটা অস্বীকার করার চেষ্টা করল। তারপর মুখ খোলার জন্যে হাঁ করল সে। জিভ আর ঠোঁট নড়ল, আওয়াজ বেরুল না। মুখের ভেতর পুরে ঠোঁট চুষল সে, গলায় আবার একটা হাত রেখে ব্যথাটা যেন কমাবার চেষ্টা করল।
আবার মুখ খুলল সে, এবার একটা মাত্র শব্দ বেরুল। কেন?
পুরো ত্রিশ সেকেন্ড জবাব দিতে পারল না পিটার, ওর নিজের গলাও বুজে গেছে। ও জানে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি, কিন্তু সেজন্যে নিজের ওপর কোনো রাগ নেই। দ্বিতীয়বার চেষ্টা করার পর গলায় স্বর ফুটল, কর্কশ আর ভারী। তোমাকে খুন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
