ধীরে ধীরে শক্তি ক্ষয় হচ্ছে, একটু একটু করে দুর্বল হয়ে পড়ছে পিটার। ভাগ্য, উপস্থিত বুদ্ধি, আর বাঁচার সহজাত প্রবৃত্তির সাহায্যে এতক্ষণ বাধ্য দিয়েছে ও, এখন থেকে যেকোনো মুহূর্তে নির্ঘাত ওকে ঘাতক ট্রাকের মতো চাপা দেবে ম্যাগডা। একটা মুহূর্ত স্থির থাকছে না সে হাত আর পা সামনে চালাচ্ছে দুটো, ভারসাম্য ফিরে পাবার কোনো সুযোগই দেবে না পিটারকে।
এখন পর্যন্ত পিটার তাকে আঘাত করতে পারেনি, কনুই আর আঙুল দিয়ে দুএকবার চেষ্টা করলেও স্পর্শ করা সম্ভব হয়নি। গায়ে জোর থাকলে কি হবে, জোর খাটাবার অস্ত্র হাত দুটো এখনো প্রায় অসাড় হয়ে আছে। একটা অস্ত্র দরকার ওর, একটু দম ফেলার ফুরসত দরকার। পিছনে ককপিটে পড়েছে ছুরিটা, বারবার সেটার কথা ভাবছে পিটার।
আবার হামলা করল ম্যাগডা, পিছিয়ে এসে তাকে সামনে বাড়তে দিল পিটার। কোমরে ব্রিজ রেইল ঠেকল। একটা ঘুষি আসছিল, গলার নরম অংশে লক্ষ্যস্থির করা হয়েছে-হাতের কিনারায় লেগে আরেক দিকে সরে গেল, থেতলে গেল নাকটা। চোখ থেকে হড়হড় করে পানি বেরিয়ে এল, সেই সাথে রক্ত। ঠোঁটের ভেতর দিকে দাঁত বসে গিয়ে কেটে গেছে, গলার ভেতর উষ্ণ, লোনা স্বাদ পেল পিটার। নাকে ঘুষি খেয়ে, ঘুষির ধাক্কার সাথেই, পিছন দিতে হেলে পড়ল ও, কোমরে ঠেকে থাকা রেইলটা পিছন দিকে ডিগবাজি খেতে সাহায্য করল ওকে। শূন্যে মাত্র একবার ডিগবাজি খেল ও, পরমুহূর্তে ককপিটের ডেকে দুপা দিয়ে পড়ল, ব্রিজ থেকে দশ ফিট নিচে। চোখ পিটপিট করে পানি সরাল ও, রক্ত চলাচল চালু করার জন্যে ঝাঁকাতে লাগল হাত দুটো। তারপর পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে দেখতে পেল ছুরিটা। ককপিট থেকে ছিটকে স্টার্নের একটা নর্দমায় পড়েছে ওটা। সেদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল পিটার।
ওকে ডাইভ দিতে দেখে বিস্মিত হলো ম্যাগডা, ওর নগ্ন ঘাড়ে মরণ আঘাত হানার প্রস্তুতি শেষ করেছিল মাত্র। লম্বা দুটো লাফ দিয়ে মইয়ের মাথায় পৌঁছে গেল সে, নিচে ঝাঁপ দেয়ার জন্যে টান পড়ল পেশিতে, ঠিক তখন তার দশ ফিট নিচে কুৎসিত নিনজা ছুরির নাগাল পাবার চেষ্টা করছে পিটার।
অতটা ওপর থেকে খালি পায়ে পিটারের পিঠের ওপর পড়ল ম্যাগডা, সামনের দিকে প্রচণ্ড ঝাঁকি খেল পিটার, বাল্কহেডের সাথে ধাক্কা খেয়ে খুলিটা যেন খুঁড়িয়ে গেল ওর। চোখের সামনে অন্ধকার ছেয়ে এল, অনুভূতি হারিয়ে ফেলছে। আর কোনো আশা নেই জানে পিটার, তবু শেষ চেষ্টা হিসেবে সবটুকু শক্তি এক করে গড়ান দিল একটা, ভাজ করে বুকের ওপর তুলল হাঁটু জোড়া। ম্যাগডা যে মরণ আঘাত হানতে চাইছে, টের পেয়ে গেছে ও।
পরবর্তী লাথিটা হাঁটুর নিচে লম্বা হাড়ে লাগল, তার আগেই হাত চলে গেছে ওর। হাতটা অবশ বলেই চুরির হাতল অসম্ভব মোটা আর কর্কশ ঠেকল আঙুলে, খপ করে সেটা মুঠোর মধ্যে নিয়েই ছেড়ে দেয়া প্রিঙের মতো ভাঁজ খুলে ডেকের ওপর লম্বা হয়ে গেল শরীরটা। জোড়া পা এক করে বিদ্যুৎবেগে লাথি চালিয়েছে পিটার। লক্ষ্যস্থির করে মারেনি, বেপরোয়া অন্ধের মতো মেরেছে।
এই প্রথম একটা আঘাত করতে পারল পিটার। আঘাতটা লাগল ঠিক যখন আবার ওর দিকে লাফ দিয়ে বসেছে ম্যাগডা। তার পাঁজরের নিচে পেটে লাগল জোড়া পা। ওখানে তার মাংস যদি নরম হতো, বোটে পিটারের প্রতিপক্ষ কেউ থাকত না। কিন্তু সমতল শক্ত পেশি ধাক্কাটা সামলে নিল। তবে পিছন দিকে ছিটকে পড়ল ব্যারনেস, হুস করে বেরিয়ে এল ফুসফুসের বাতাস, অসহ্য ব্যথায় ভাজ হয়ে গেল শরীরটা।
পিটার বুঝল, এই ওর শেষ সুযোগ। কিন্তু শরীরটা কাতর হয়ে পড়েছে, চোখের সামনে থেকে অন্ধকার দূর হয়নি এখনো, কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে মাথা তোলার শক্তিও যেন অবশিষ্ট নেই। মুখের ভেতর রক্ত, চোখের কোণ গড়িয়ে আবার পানি নামছে।
কিভাবে সম্ভব হলো বলতে পারবে না পিটার, সম্ভবত প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির কল্যাণে, দুপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারল ও, হাতে ছুরি। ফলাটা ডান উরুর পিছনে আড়াল করে রেখেছে, ব্যবহার করার আগ পর্যন্ত সংরক্ষিত অবস্থায় রাখতে চায়। বাঁ হাতটাকে ঢালের মতো তুলল সামনে, তারপর সামনের দিকে ঝুঁকে এগোল। জানে, খুব তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে কাজটা। বেশিক্ষণ দম পাবে না ও। এটাই হবে ওর শেষ চেষ্টা।
কিন্তু ম্যাগডার হাতেও একটা অস্ত্র চলে এল। যন্ত্রণার বিকৃত চেহারা নিয়ে ঝড়ের বেগে নড়ে উঠল ব্যারনেস, কেবিনে ঢোকার মুখে একটা র্যাকে ক্লিপ দিয়ে আটকানো বোর্ট হুক ছিল, খুলে হাতে নিল সেটা। অ্যাশ কাঠের আট ফিট লম্বা ভারী লগি, কুৎসিতদর্শন মাথাটা তামার পাত দিয়ে মোড়া। শূন্যে তুলে পিটারের মাথার দিকে নামিয়ে আনল ম্যাগডা সেটা, খুব দ্রুত নয় ওকে শুধু দূরে ঠেকিয়ে রাখতে চাইছে সে আপাতত, এই সুযোগে বাতাস ভরে নিচ্ছে খালি ফুসফুসে।
দ্রুত শক্তি ফিরে পাচ্ছে ম্যাগডা, পিটারের চেয়ে অনেক দ্রুত। তার চোখে নতুন করে ঠাণ্ডা খুনের আলো জ্বলে উঠতে দেখল পিটার। আবার লড়াই বেধে গেলে বেশিক্ষণ টিকতে পারবে না জানে ও, সমস্ত ঝুঁকি আর শক্তি নিয়ে শেষ চেষ্টা এখুনি করতে হবে ওকে।
ছুরিটা ছুঁড়ল পিটার, ম্যাগডার মাথা লক্ষ্য করে। নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র হিসেবে তৈরি করা হয়নি নিনজাটাকে, নির্দিষ্ট পথে না থেকে ডিগবাজি খেয়ে ছুটল সেটা, বোঝাই গেল ম্যাগডার মাথার পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাবে। তবে আত্মরক্ষার জন্যে বোট হুকসহ হাত দুটো মাথার ওপর তুলে সরে যাবার চেষ্টা করল ম্যাগডা। মুহূর্তের জন্যে তার মনোযোগ অন্য দিকে সরে গেল, আর সেটাই দরকার ছিল পিটারের। ছুরি ছোঁড়ার পর শরীরের ঝাঁকিটা কাজে লাগাল পিটার, স্যাৎ করে বোট-হুঁকের তলায় চলে এল ও, কাঁধ দিয়ে আঘাত করল ম্যাগডাকে, তার হাত দুটো যখন মাথার ওপর তোলা।
