কাঠের চাকা লাগানো গাড়ি করে এয়ারপোর্টে এল ওরা। গরু না থাকায় ওটাকে গরুর গাড়ি বলা যাবে না, গরুর বদলে ছোট একটা ইঞ্জিন চালাচ্ছে ওটাকে। সিনেটর লোকটা প্রচুর শ্যাম্পেন খেয়ে মহা ফুর্তিতে আছে, বিদায়ের মুহূর্তে আদর করে আলিঙ্গন করার চেষ্টা করল, কিন্তু কৌশলে তাকে ফাঁকি দিয়ে সরে দাঁড়াল ম্যাগডা অল্টম্যান, পিঠে ধাক্কা দিয়ে অন্যান্য আরোহীদের সাথে তুলে দিল ট্রাই-আইল্যান্ডারে।
প্লেনটা আকাশে অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত সেদিকে তাকিয়ে থাকল ম্যাগডা, তারপর ফিরল পিটারের দিকে। কাল রাতে ভালো ঘুমাতে পারিনি আমি, কথাটা বলে চুমো খেল সে।
আমিও, মুখে বলল পিটার, মনে মনে বলল, বাজি ধরে বলতে পারি, একই কারণে।
বিশেষ একটা প্রোগ্রাম করেছি, বলল ম্যাগডা। শুধু তোমার আর আমার জন্যে। এসো, এসো-আমি আর এক মিনিটও দেরি করতে রাজি নই।
জেটির মাথায় ম্যাগডার পঁয়তাল্লিশ ফুট লম্বা ক্রীশ-ক্রাফট ফিশারম্যান নিয়ে অপেক্ষা করছিল হেড বোটম্যান। অদ্ভুত সুন্দর একটা বোট, রঙে কোথাও এক বিন্দু ময়লা নেই, স্টেনলেস স্টিলের ফিটিংস পালিশ করে ঝকঝকে আয়না করে তোলা হয়েছে।
ব্যারনেসকে দেখে বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হাসল বোটম্যান। সব ট্যাংক ভর্তি, মাই ব্যারনেস। স্কুবা বটল চার্জ করা হয়েছে, লাইট রডগুলোও টোপসহ তৈরি। ওয়াটার স্কি পাবেন মেইন র্যাকে। শেফ নিজে এসে আইস বক্স চেক করে গেছে।
কিন্তু তার গাল ভরা হাসি মিলিয়ে গেল যখন শুনল ব্যারনেস একাই বোট নিয়ে রওনা হবে।
কি, আমার উপর তোমার বিশ্বাস নেই? হেসে উঠল ম্যাগডা।
না-না, তা কেন, মাই ব্যারনেস… অপ্রতিভ বোধ করল বোটম্যান। রশিগুলো নিজের হাতে খুলল সে, জেটি আর বোটের মাঝখানে ফাঁকটা বড় হতে শুরু করল, শেষবারের মতো চেঁচিয়ে কিছু উপদেশ দিল ব্যারনেসকে।
ভেব না, বহাল তবিয়তে ফিরে আসব, পিটারের দিকে না তাকিয়ে জেটিতে দাঁড়ানো বোটম্যানকে বলল ম্যাগডা, সকৌতুকে হাসছে। তারপর দুটো ডিজেল ইঞ্জিনই চালু করল সে, ধীরে ধীরে থ্রটল খুলল। প্লেনের মতো ছুটল ক্রীশ-ক্রাফট, পানির গা ছুঁলো কি ছুঁলো না। বাঁক নিয়ে চ্যানেল মার্কারগুলোর মাঝখানে ঢুকল বোট, রীফের ভেতর দিয়ে প্যাসেজ তৈরি করে এগোবে। তারপরই খোলা প্যাসিফিক।
কোথায় যাচ্ছি আমরা?
রীফের পিছনে আশ্চর্য একটা জিনিস আছে। একশ ফিট পানির নিচে পুরানো একটা জাপানি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার। চুয়াল্লিশ সালে আমেরিকানরা ডুবিয়ে দিয়েছিল। স্কুবা ডাইভিংয়ের জন্যে ভারি সুন্দর স্পট। প্রথমে আমরা ওখানে যাব…
কিভাবে? আন্দাজ করার চেষ্টা করল পিটার। হয়তো একটা স্কুবা বলে খানিকটা কার্বন মনোঅক্সাইড গ্যাস ভরা আছে। ডিজেল জেনারেটরের এগজস্টে একটা হোস লাগিয়ে সহজেই কাজটা করা যায়-একটা চারকোল ফিল্টারের ভেতর দিয়ে এগজস্ট গ্যাসকে আসতে দিলে অব্যবহৃত হাইড্রোকার্বনের স্বাদ আর গন্ধ দূর হয়ে যাবে, বাকি কার্বন মনোঅক্সাইড গ্যাস যেটা থেকে যাবে তার অস্তিত্ব ফাঁস হবে না। প্রথমে এই গ্যাস ত্রিশ অ্যাটমোসফেয়ার প্রেশার দিয়ে ভরতে হবে বোতলে, তারপর অপারেটিং প্রেশার একশ দশ অ্যাটমোসফেয়ারের সাহায্যে ক্লিয়ার অক্সিজেন ভরতে হবে। কিছু টের পাবে না ভিকটিম, ঘুমিয়ে পড়বে সে। তারপর মুখ থেকে মাউথপীস খসে পড়ার পর বাকি গ্যাস আপনা থেকেই বেরিয়ে যাবে বোতল থেকে, কোনো প্রমাণই থাকবে না।
তারপর আমরা ইল দে উইসিউ যাব। আমার স্বামী অল্টম্যান কড়া নির্দেশ দিয়েছিল, দ্বীপবাসীরা কেউ ডিম চুরি করতে পারবে না–তার নির্দেশ এখনো বহাল আছে, সবাই মেনেও চলে। ফলে সাউদার্ন প্যাসিফিকের সবচেয়ে বড় পাখির কলোনি পেয়ে গেছি আমরা। টার্ন, নডি, ফ্রিগেট–কত রকমের যে পাখি।
সম্ভবত একটা স্পিয়ার গান। সরাসরি, অব্যর্থ এবং নিশ্চিত। অল্প রেঞ্জে, এই ফিট দুই-এক দূর থেকে, এমনকি পানির তলাতে থাকলেও স্পিয়ার অ্যারো মানুষের ধড় ভেদ করে যাবে–শোল্ডার ব্লেডের মাঝখান দিয়ে ঢুকে বেরুবে বুকের পাজর ভেঙে।
পরে আমরা ওয়াটার-স্কির জন্যে তৈরি হব…
স্কি নিয়ে পানিতে থাকবে পিটার, অপেক্ষা করবে কখন টান পড়ে লাইনে, এই সময় শক্তিশালী জোড়া ইঞ্জিন নিয়ে যদি ওর দিকে তেড়ে আসে বোট, কি করার থাকবে ওর? স্টিল বডি যদি বা ওকে থেঁতলাতে নাও পারে, ছুরি দিয়ে রুটি কাটার মতো নিখুঁতভাবে ফালি করবে জোড়া স্কু, প্রতি মিনিটে পাঁচশ বার ঘুরবে ওগুলো।
এসব আন্দাজ করতে করতে নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে উঠল পিটার, বুঝল আসলে কি করবে খলিফা সেটা জানার কোনো উপায় নেই। জানবে, কিন্তু তখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে ক্ৰীশ-ক্রাফটের লম্বা ফ্লাইং ব্রিজে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে ওরা, ঘাড় ফিরিয়ে পিছন দিকে তাকাল পিটার। প্রধান দ্বীপটা এরই মধ্যে অনেক নিচু হয়ে গেছে, তার মানে অনেক দূর চলে এসেছে ওরা। বিনকিউলার না থাকলে কেউ ওদেরকে দেখতে পাচ্ছে না।
পাশে দাঁড়িয়ে চুল থেকে একটা রিবন খুলল ম্যাগডা, কালো স্কার্ফটা ঢিল করে দিল একটু, তার মাথার পিছনে পতাকার মতো উড়তে লাগল সেটা। এসো, সারা জীবন ধরে এই করি আমরা, তীব্র বাতাস আর কর্কশ ইঞ্জিনের আওয়াজকে ছাপিয়ে উঠল তার গলা।
