তার মানে, আন্দাজ করে নিল পিটার, সম্ভবত একটা দুর্ঘটনায় পড়ে প্রাণ হারাতে হবে ওকে। সাক্ষী থাকবে শুধু বেতনভুক বিশ্বস্ত কর্মচারীরা।
এবার আমাদের ফিরতে হবে। দুর্ভাগ্য, আমার অতিথিরা সবাই প্রভাবশালী, বেশিক্ষণ ওদের এড়িয়ে থাকতে পারি না–কিন্তু রাত পোহাবে। রাতটা আমার জন্যে খুব দীর্ঘ হবে, পিটার–তবে পোহাবে। পিটারের বাহু-বন্ধনের ভেতর ঘুরল ম্যাগডা, আকস্মিক উন্মাদনার সাথে চুমো খেল, দাঁতের সাথে পিষে গেল পিটারের ঠোঁট। নিজেকে ছাড়িয়ে নিল ম্যাগডা, পিটারের কানের কাছে ফিসফিস করে, যা ঘটার তা তো ঘটবেই, পিটার–কিন্তু ভুলো না মনের গহীনে পরস্পরের জন্যে অমূল্য কিছু অনুভূতি ছিল আমাদের। সারা জীবনে এত মূল্যবান কিছু জোটেনি আমার কপালে। মনে হলো ফুঁপিয়ে উঠল সে, কিন্তু আওয়াজটা এত তাড়াতাড়ি চাপা দিতে পারল যে সন্দেহ হলো শোনার ভুল। সেটা ওরা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।
পরমুহূর্তে প্রায় বিদ্যুৎবেগে পিটারের নাগালের বাইরে চলে গেল ম্যাগডা, সৈকত ধরে আলোকিত সরু পথের দিকে ছুটছে। ধীরপায়ে তাকে অনুসরণ করল পিটার, চিন্তায় নুয়ে আছে মাথাটা। ম্যাগডার শেষ কথাগুলো বিমূঢ় করে তুলেছে ওকে, ঠিক কি বোঝাতে চাইল ধরতে পারছে না। হঠাৎ ধারণা হলো, ঠিক এটাই চায় ম্যাগডা–ওকে বিমুঢ় আর দ্বিধাগ্রস্ত করাই তার উদ্দেশ্য ছিল। শব্দটা ঠিক শোনেনি পিটার, অনুভূতি দিয়ে টের পেল–পিছনে কিসের একটা নড়াচড়া। চোখের পলকে পাঁই করে আধপাক ঘুরে গেল ও, কোমর বাঁকা করে ঝাঁপ দেয়ার ভঙ্গি করল।
লোকটা ওর দশ কদম পিছনে, বিড়ালের মতো নিঃশব্দে এগিয়ে এল। পথের পাশে ঝোঁপের ডাল দুলছে দেখে পিটার বুঝতে পারল ওখানে গা ঢাকা দিয়ে ছিল সে।
গুড ইভনিং, জেনারেল স্ট্রাইড।
ডাইভ দিতে যাচ্ছিল পিটার, গলার আওয়াজ চিনতে পেরে সামলে নিল নিজেকে। ধীরে ধীরে সিধে হলো ও, যদিও হাত দুটো শরীরের দুপাশে বাঁকা হয়ে থাকল।
কার্ল! তার মানে নেকড়েগুলো ওদের কাছাকাছিই ছিল, মাত্র কয়েক ফিট দূরে–পাহারা দিচ্ছিল বিবি সাহেবাকে।
আমি কি আপনাকে চমকে দিলাম? দেহরক্ষীর মুখ দেখতে না পেলেও তার কণ্ঠস্বরে ক্ষীণ একটু ব্যঙ্গ রয়েছে টের পেল পিটার। সন্দেহ যদিও একটু থেকেও থাকে, এখন তা সম্পূর্ণ দূর হয়ে গেল। রোমান্টিক কোনো মুহূর্তে শুধু খলিফারই দরকার হতে পারে বডিগার্ড।
নিঃসন্দেহ হলো পিটার, কাল সূর্য ডোবার আগে হয় সে, না হয় ম্যাগডা অল্টম্যান, দুজনের একজন মারা যাবে।
.
বাংলোয় ফেরার আগে আশপাশের ঝোঁপ আর গাছগুলো পরীক্ষা করল পিটার, সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া গেল না। ঘরে ফিরে দেখল, বিছানাটা তৈরি করা হয়েছে, পরিষ্কার করা হয়েছে শেভিং গিয়্যার, টুকিটাকি জিনিসগুলো সুন্দরভাবে গুছিয়ে রাখা হয়েছে টেবিলে। ছেড়ে যাওয়া কাপড়গুলো পাওয়া গেল না, সম্ভবত ধোয়ার জন্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নতুন কিছু শার্ট আর ট্রাউজার পেল পিটার, সদ্য ইস্ত্রি করা। কাজেই জোর করে বলা যায় না, ওর অন্যান্য জিনিসে হাত দেয়া হয়নি। ধরে নিতে হবে বেশ ভালোভাবেই সার্চ করা হয়েছে গোটা বাংলো।
দরজা-জানালার তালাগুলো যথেষ্ট মজবুত নয়, সম্ভবত অনেক দিন ব্যবহার না করায় মরচে ধরে গেছে। ব্যবহার করার দরকার পড়েনি, কারণ দ্বীপে চোর-ডাকাত বা সাপ-বিছে আছে বলে শোনা যায়নি–এখনকার কথা অবশ্য আলাদা। কাজেই চেয়ার টেবিলগুলো দরজার সামনে মেঝেতে এমনভাবে সাজাল পিটার, ঘরে কেউ ঢুকলে অন্ধকারে যাতে ধাক্কা খেতে হয়। বিছানাটা খানিক এলোমেলো করল ও, চাদর ঢাকা বালিশগুলো এমনভাবে সাজাল দেখে মনে হবে কেউ ঘুমাচ্ছে। একটা কম্বল নিয়ে প্রাইভেট লাউঞ্জে চলে এল ও, সোকায় শোবে।
অতিথিরা দ্বীপ ছেড়ে চলে যাবার আগে আক্রমণ আসবে বলে মনে হয় না, তবে সাবধানের মার নেই।
ভালো ঘুম হলো না। একবার ঘুম ভাঙল পাম গাছের মরা ডাল খসে পড়ার শব্দে। আরেক বার মুখে চাঁদের আলো পড়ায়। ঠিক ভোরের আগে আবার ঘুম পেল ওর, অর্থহীন আর উদ্ভট স্বপ্ন দেখল, চোখ মেলার পর আতঙ্কে বিকৃত ম্যাগডার মুখ ছাড়া আর কিছুই মনে করতে পারল না।
সূর্য তখনো ওঠেনি, সৈকতে চলে এল পিটার। রীফ ছাড়িয়ে এক মাইল পর্যন্ত সাঁতার কাটল, স্রোতের সাথে লড়াই করে ফিরে এল তীরে। সম্পূর্ণ সতর্ক আর প্রস্তুত মনে হলো নিজেকে ওর। কোনো দিক থেকে কি আসবে আসুক, সেও তৈরি।
বিদায়ী অতিথিদের জন্যে ফেয়ারওয়েল ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাতের জোয়ারে সৈকতের বারি মসৃণ হয়ে উঠেছে, রঙিন ছাতার নিচে বসে লরেত পেরিয়ার শ্যাম্পেনের বোতল ভোলা হলো, নিউজিল্যান্ড থেকে এসেছে হট-হাউস স্ট্রবেরি। ব্যারনেস ম্যাগডার পরনে ছোট্ট সবুজ প্যান্ট, সুগঠিত পা আর হাঁটু সহ প্রায় সবটুকু ঊরু দেখা গেল, ঊর্ধ্বাঙ্গে ম্যাচ করা টিউব আকৃতির বক্ষবন্ধনী–তবে তলপেট, কাঁধ আর পিঠ উদোম। সযত্নলালিত একজন অ্যাথলেটের শরীর, মহান কোনো শিল্পীর অবদান।
আজ একটু যেন বেশি হাসাহাসি করছে ম্যাগডা এবং কয়েকবার সময়ের আগেই হেসে ফেলল, যেন আগে থেকেই ভেবে রেখেছিল হাসতে হবে। পিটারের দিকে যতবার তাকাল, প্রতিবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল চেহারা। তার হাবভাব দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক, কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিতে পেরে উল্লাস বোধ করছে সে, এখন শুধু কাজটা করার জন্যে পুলকের সাথে অপেক্ষা করছে।
