তৃতীয়জন স্প্যানিয়ার্ড, পৃথিবী বিখ্যাত একটা শেরির সাথে তার পরিবারের নাম জড়িয়ে আছে। চশমা পরা অধ্যাপকের চেহারা, রোগা-পাতলা, ভঙ্গুর। কোথায় যেন পড়েছে পিটার, এই লোকের সেলারে পাঁচশ মিলিয়ন ডলারের শেরি আর কনিয়্যাক, মজুদ থাকে, অঙ্কটা নাকি তাদের পরিবারের মোট বিনিয়োগের ক্ষুদ্র একটা ভগ্নাংশ মাত্র। সুন্দরী বউ, তবে মোটা আরেকটু কম হলে পিটার বোধহয় নিজের অজান্তেই আরো দু-একবার তার দিকে তাকাত।
পরিচয় এবং কুশল বিনিময়ের পর দলটা আজকের মাছ ধরা নিয়ে আলোচনা শুরু করল। অস্ট্রেলিয়ান লোকটা সকালে প্রকাণ্ড একটা মারলিন তুলেছে বোটে, হাজার পাউন্ডের বেশি তার ওজন, মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত পনেরো ফিট লম্বা। বর্ণনা শুনে সবাই, বিশেষ করে মেয়েরা রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল।
আলোচনায় যোগ দিলেও খুব কম কথা বলল পিটার, তবে চোরাচোখে সারাক্ষণ লক্ষ্য রাখল ম্যাগডার ওপর। সব কথা আর কারও জানা নেই, কাজেই ওদের চোখে তার মানসিক উত্তেজনা ধরা পড়ছে না। প্রয়োজনের সময় সহজভাবেই হাসছে সে, পিটারের দিকেও দু-একবার তাকাল, প্রতিবার হাসিমুখে-শুধু চোখের তারায় ম্লান ছায়া।
অবশেষে হাততালি দিল সে। এসো সবাই, মাটি খুঁড়ে গুপ্তভোজ বের করি। দুহাতের ভঁজে সিনেটর আর অস্ট্রেলিয়ান লোকটাকে বন্দী করল সে, সবাইকে নিয়ে নেমে এল সৈকতে। ওদের তিনজনের পিছনে পিটারের ঘাড়ে চাপল সিনেটরের স্ত্রী, সে ওর বাহুর সাথে বুক ঘষল, তারপর আঁকড়ে ধরে প্রায় ঝুলে পড়ার সময় ঠোঁটের ওপর হালকাভাবে জিভ বুলিয়ে দিল দুবার।
লম্বা একটা বালির স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুজন পলিনেশিয়ান ভূত্য, ম্যাগডার সঙ্কেত পেয়ে কোদাল নিয়ে পটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা! বালির নিচ থেকে বেরুল সীউইড আর কলাপাতার মোটা স্তর, ওগুলোর ভেতর থেকে সাদাটে ধোঁয়া উঠতে লাগল। পরের স্তরে রয়েছে ফালি করা কাঠ আর পাম গাছের শুকনো ডাল, শেষ স্তরে আরেক প্রস্থ সীউইড আর জ্বলন্ত কয়লা।
মুরগি, মাছ আর খাসির মাংসের সাথে মিশে থাকা ব্রেড-ফ্রট, কলা আর মশলার গন্ধ উঠে এল নাকে, উল্লাসে হাততালি দিল সবাই।
কার ভাগ্যে কে জানে, সমস্ত আয়োজন সফল হয়েছে, ঘোষণা করল ব্যারনেস ম্যাগডা। খাবারের ভেতর একটু যদি বাতাস ঢুকত, পুড়ে কয়লা হয়ে যেত সব।
শুরু হলো ভোজ, হাসি-আনন্দে মুখর সবাই, দামি শ্যাম্পেন আর হুইস্কি গ্লাসের পর গ্লাস ধরেছে, তাও সবটুকু হুইস্কি শেষ করেনি। শান্তভাবে অপেক্ষা করছে ও, আলোচনায় যোগ দিচ্ছে না। বার কয়েক কটাক্ষ হানলেও, সিনেটরের বউকে হতাশ করল ও, কোনো রকম উৎসাহ দিল না।
আঘাতটা আসবে, জানে পিটার। কখন, কোন দিক থেকে আসবে জানে না। আভাস আর লক্ষণের খোঁজে রয়েছে ও। এখানে নয়, জানে, লোকজনের সামনে কিছু ঘটবে না। আঘাতটা যখন আসবে, খলিফার আর সব কাজের মতো সেটাও হবে দ্রুতগতি এবং মোক্ষম। হঠাৎ নিজের অহমবোধ উপলব্ধি করে বিস্মিত হলো পিটার–নিজেকে নিয়ে অহঙ্কার না থাকলে এভাবে কেউ শত্রুর ফাঁদে নিরস্ত্র অবস্থায় পা দেয়? এটা শুধু বধ্যভূমি নয়, শত্রুর নির্বাচিত নিজস্ব বধ্যভূমি। ও জানে, আত্মরক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায় প্রথমে আঘাত হানা, সুযোগ পাওয়া গেলে আজ রাতেই। যত তাড়াতাড়ি হয় ততই নিরাপদ, উপলব্ধি করল ও এবং ঠিক তখনই দেখল পাম গাছের নিচে ফেলা টেবিলের ওদিক থেকে ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে ম্যাগডা অল্টম্যান, সামনে সুস্বাদু খাদ্যবস্তুর বিপুল সমারোহ। উত্তরে পিটারও মৃদু হাসল, ছোট্ট করে মাথা ঝাঁকিয়ে সাড়া দিল ম্যাগডা।
নারী-পুরুষ সবাই কথা বলছে, বিড়বিড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করল ব্যারনেস, বিশেষভাবে কারও দৃষ্টি আকর্ষণ না করে আলো থেকে ছায়ায় গিয়ে দাঁড়াল।
পঞ্চাশ পর্যন্ত গুনল পিটার, তারপর পিছু নিল।
সৈকতে অপেক্ষা করছিল সে। চাঁদের আলোয় তার নগ্ন পিঠ আলোকিত হয়ে আছে, দূর থেকে দেখতে পেল পিটার। সৈকতের কিনারায় দাঁড়িয়ে লেগুনের পানির দিকে তাকিয়ে আছে ব্যারনেস। পিছনে পায়ের আওয়াজ পেল, কিন্তু ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল না। তার কণ্ঠস্বর অস্পষ্ট শোনাল।
তুমি আসায় আমি খুব খুশি হয়েছি, পিটার।
আমি খুশি হয়েছি, তুমি আসতে বলায়।
ব্যারনেসের গলার পিছনে আস্তে করে হাত রাখল পিটার, খুলির নিচে চুলগুলো আঙুলের ডগায় সিল্কের মতো লাগল। এখুনি ইচ্ছে করলে অ্যাকসিসটা খুঁজে নিতে পারে পিটার। খুলির গোড়ায় ওটা একটা হালকা হাড়, ফাঁসির রশিতে কাউকে ঝুলিয়ে দেয়ার সময় জল্লাদ আশা করে মট করে ভেঙে যাবে ওটা। আঙুলের চাপ দিয়ে কাজটা করতে পারে পিটার, ফাসের মতোই দ্রুত হবে।
ওরা থাকায় সত্যি আমি দুঃখিত, বলল ব্যারনেস। তবে ওদের আমি বিদায় করে দিচ্ছি–হোক একটু দৃষ্টিকটু। হাতটা নিজের কাঁধে তুলল সে, পিটারের হাত আস্তে করে ঘাড় থেকে নামাল। ছাড়ল না, আঙুলগুলো সমান করে নিজের গালে চেপে ধরল তালুটা। কাল খুব সকালে চলে যাবে ওরা, পিয়েরে ওদের পাপেটেতি পৌঁছে দিয়ে আসবে। তারপর… তারপর গোটা লে নিউফ পোইজে আমাদের একার হয়ে যাবে-শুধু তোমার আর আমার হাসি নাকি কান্না চাপল ম্যাগডা ঠিক বোঝা গেল না, গলার আওয়াজ খসখসে, অস্কুট শোনাল, অবশ্য ত্রিশ-বত্রিশ জন চাকর-বাকর থাকবে।
