হাত না ছেড়েই বাংলোর ভেতর নিয়ে এল ওকে। এক এক করে এয়ারকন্ডিশন, সুইচবোর্ড, ভিডিও স্ক্রীন, বাথরুম, ইত্যাদি দেখাল সে। ঘোট ঘোট ফরাসি শব্দ উচ্চারণ করে কথা বলল পিটারের সাথে, যেন সমবয়েসী ভাই অনেক দিন পর বাড়ি ফিরেছে। পিটারের হাবভাব লক্ষ্য করে হেসে কুটিকুটি হলো বারবার।
বার আর কিচেন যা কিছু দরকার সব আছে, লাইব্রেরিতে রয়েছে সবগুলো সাম্প্রতিক বেস্টসেলার–শুধু ম্যাগাজিন আর দৈনিক পত্রিকাগুলো দিন কয়েকের পুরানো। ভিডিও ক্যাসেট পাওয়া গেল গোটা বিশেক, প্রতিটি ছবিতে অস্কার বিজয়ীরা অভিনয় করেছে।
রবিনসন ক্রুসোর নাম শুনেছ? তার একবার এখানে আসা উচিত ছিল। পিটারকে হাসতে দেখে মেয়েটাও খিলখিল করে হেসে উঠল।
দুঘণ্টা পর আবার পিটারকে নিতে এল সে। ইতোমধ্যে শাওয়ার সেরে দাড়ি কামিয়েছে পিটার, খানিক বিশ্রাম নিয়ে কাপড় পাল্টেছে। হালকা সুতি ট্রপিকাল স্যুট পরেছ ও, বুকে খোলা শার্ট, পায়ে স্যান্ডেল।
আবার ওর হাত ধরল মেয়েটা। পিটার বুঝল, এই অভ্যেসটাকে কেউ যদি অবাধ লাইসেন্স বলে মনে করে মেয়েটা আহত হবে, হতভম্ব হয়ে পড়বে বেচারি। সরু আর লম্বা পথ ধরে ওকে নিয়ে চলল সে, শুধু দুপাশের ঝোঁপঝাড়গুলো আলোকিত। ঝোঁপের ভেতর এমনভাবে লুকানো আছে আলোর ব্যবস্থা, টিউব বা বালব নজরে আসে না। সাগরের কলকল ছলছল শব্দে ভরাট হয়ে আছে রাত, আর একেবারে কানের কাছে পাম গাছের পাতার সাথে বাতাসের খসখস খুনসুটি।
বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল ওরা, প্লেন থেকে এটাকে দেখছিল পিটার। মৃদু সুর-ঝংকার আর হাসির আওয়াজ কানে এল, তবে আলোর মধ্যে পিটার এসে দাঁড়াতে হাসির শব্দ থেমে গেল। পাঁচ-সাতজন মানুষ চোখে প্রত্যাশা নিয়ে ঘাড় ফেরাল ওর দিকে।
পিটারের ঠিক জানা ছিল না কি আশা করবে সে, কিন্তু আর যাই হোক এই ধরনের আনন্দমুখর সামাজিক সমাবেশ আশা করেনি ও রোদে পোড়া সুঠামদেহী নারী-পুরুষ রুচিসম্মত মূল্যবান কাপড় পরে আছে, বরফ আর ফলের রস ভরা লম্বা গ্লাস হাতে, গ্লাসগুলো ঘেমে ঝাপসা হয়ে গেছে।
পিটার! দল ভেঙে বেরিয়ে এল ব্যারনেস ম্যাগডা, নিতম্বে ঢেউ তুলে যেন উড়ে চলে এল পিটারের সামনে।
ঝলমলে, নরম সোনালি একটা ড্রেস পরেছে সে, গলার কাছে সরু সোনালি চের দিয়ে আটকানো, কিন্তু কাঁধ থেকে গোটা পিঠ একেবারে নিতম্বের এক ইঞ্চি উপর পর্যন্ত সম্পূর্ণ নগ্ন। দৃশ্যটা শ্বাসরুদ্ধকর, কারণ তার শরীর গোলাপ পাপড়ির মতে, আর পরিমিত রোদ পোহানো চামড়ার রঙ চাকভাঙা নতুন মধুর মতো। ঘন কালো চুল মুচড়ে কবজি সমান মোটা রশি পাকানো হয়েছে, তারপর মাথার মাঝখানে স্তূপ করা হয়েছে সযত্নে। প্রসাধন ব্যবহার করেছে সে, হালকা ছায়া পড়েছে যেন, ফলে চোখজোড়া চিকন, সবুজ আর রহস্যময় লাগছে।
পিটার, আবার বলল ম্যাগডা অল্টম্যান, পায়ের পাতায় ভর দিয়ে আলতোভাবে চুমো খেল ঠোঁটে, প্রজাপতি পাখনা ছোঁয়াল যেন। অস্পষ্টভাবে পারফিউমের গন্ধ পেল পিটার, মন মাতানো, মিষ্টি।
বোধশক্তি লোপ না পেলেও টলে গেল পিটারের। ম্যাগডা সম্পর্কে কিছুই তার অজানা নেই, অথচ তাকে দেখে টান পড়েনি পেশিতে।
ম্যাগডা সম্পূর্ণ শান্ত, নিরুদ্বিগ্ন এবং সপ্রতিভ। সদ্য ফোঁটা ফুলের মতো তাজা। নিদারুণ হতাশা বা ভীতিকর নিঃসঙ্গতা, এই মুহূর্তে কিছুই তাকে স্পর্শ করেনি। এই মেয়ে কেঁদেছে বা কাঁদতে পারে বলে বিশ্বাস হয় না।
মাথাটা একপাশে কাত করার জন্যে এক পা পিছিয়ে গেল ম্যাগডা, দ্রুত চোখ বুলিয়ে দেখে নিল পিটারকে, মৃদু হাসল্ ওহ্, শেরি, আগের চেয়ে কত ভালো দেখাচ্ছে তোমাকে। শেষবার যেদিন দেখলাম, ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে আমাকে।
এতক্ষণে উপলব্ধি করল পিটার, শান্ত সপ্রতিভ ভাবটুকু পুরোটাই কৃত্রিম, হালকা ছায়া থাকায় চোখ ভরা বিষাদ সহজে নজরে পড়ছিল না। ঠোঁটের দুই কোণও টান টান হয়ে আছে।
আর তোমাকেও যে এত সুন্দর দেখেছি, আমার মনে পড়ে না।
কথাটা সত্যি, কাজেই কোনো সংকোচ ছাড়াই বলতে পারা গেল। শুনে হেসে উঠল ম্যাগডা, ক্ষণস্থায়ী কোমল একটু আনন্দ-উচ্ছ্বাস।
আগে কখনো কথাটা বলোনি, মনে করিয়ে দিল ম্যাগডা, কিন্তু এখনো তার আচরণ মৃদু হলেও ভঙ্গুর। তার স্নেহ আর বন্ধুত্বের ভাব আরেক সময়ের কথা মনে করিয়ে দিলেও, এখন আর কোনো গুরুত্ব নেই ওগুলোর। সত্যি আমি কৃতজ্ঞ।
আপন করে কাছে টানল ম্যাগডা, পাজর আর বগলের মাঝখানে পিটারের একটা হাত আটকাল, পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল জোট বাধা অতিথিদের দিকে, যেন একবার যখন পেয়েছে তখন এই অমূল্য সম্পদ আর সে হাতছাড়া করতে রাজি নয়।
তিনজন পুরুষ আর তাদের স্ত্রীরা রয়েছে দলটায়। একজন মার্কিন ডেমোক্র্যাট সিনেটর, বেশ ভালো রাজনৈতিক প্রভাব আছে। তার মাথায় প্রচুর চুল, সব সাদা। চোখ জোড়া পাকা লিচুর মতো। পাশে বসা স্ত্রীর বয়স তার চেয়ে অন্তত ত্রিশ বছর কম হবে, খুবই সুন্দরী। লোকটা পিটারের দিকে তাকাল–ঠিক সিংহ যেভাবে হরিণের দিকে তাকায়। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চাপ দিয়ে এক সেকেন্ড অতিরিক্ত ধরে থাকল সে পিটারের হাত।
একজন অস্ট্রেলিয়ান রয়েছে, বিশাল কাঁধ, প্রকাণ্ড হুঁড়ি। তার চোখের চারপাশে স্থায়ীভাবে কুঁচকে আছে মোটা চামড়া, গায়ের রঙ জন্ডিস রোগীর মতো হলদেটে। দৃষ্টি দেখে মনে হবে অনেক দূরে তাকিয়ে আছে। দেখেই চিনেছে পিটার, সারা দুনিয়ায় জানা মতে যত ইউরেনিয়াম আছে তার সিকি ভাগের মালিক সে, আর আছে অসংখ্য ক্যাটল স্টেশন, সবগুলো এক করলে আকারে ব্রিটিশ আইলসের দ্বিগুণ হবে। স্ত্রীটি স্বামীর মতোই রোদে পোড়া তামাটে, দুজনে সমান জোর দিয়ে করমর্দন করল।
