এ ধরনের দেহ-তল্লাশির অভিজ্ঞতা আগে কখোনো হয়নি পিটারের। একজন ওর পিঠ, পাঁজর, বুক, আর পেট করল। অপর জন পেট থেকে শরীরের নিচের অংশ-ঊরুসন্ধি, হাঁটুর পিছনটা, নিতম্বের খাজ, পায়ের পাতা, কিছুই বাদ দিল না।
ব্রাসেলের হিলটনে কোবরাটা রেখে এসেছে পিটার, আগেই আন্দাজ করছিল এ ধরনের একটা পদক্ষেপ নিতে পারে খলিফা।
সন্তুষ্ট? জিজ্ঞেস করল ও।
সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ, স্যার। হ্যাড এ লাভলি স্টে অন আওয়ার আইল্যান্ড।
মেইন কনকোর্সে ম্যাগডার ব্যক্তিগত পাইলট অপেক্ষা করছিল ওর জন্যে করমর্দনের জন্যে শশব্যস্ত হয়ে ছুটে এল সে। আমি তো ভাবলাম এই ফ্লাইটে আপনি বোধ হয় আসেননি, স্যার!
কাস্টমসে একটু দেরি হয়ে গেল, ব্যাখ্যা করল পিটার।
এখুনি আমাদের রওনা হতে হয়, মানে লে নিউফ পোইজোতে যদি অন্ধকারে ল্যান্ড করতে না চাই। একেবারে যা তা অবস্থা স্ট্রিপের।
সার্ভিস এরিয়ার কাছাকাছি পার্ক করা হয়েছে লিয়ার জেট, সেটার পাশে নরম্যান ব্রিটেন ট্রাই-আইল্যান্ডারকে ছোট্ট আর কুৎসিত দেখাল। প্লেনটার বৈশিষ্ট্য হলো অল্প জায়গায় ওঠা-নামা করতে পারে।
এরই মধ্যে অনেকগুলো কাঠের বাক্স আর প্যাকেট তোলা হয়েছে প্লেনে, টয়লেট রোলস থেকে শুরু করে ভিউট ক্লিকোৎ শ্যাম্পেন, কিছুই বাদ পড়েনি। সবগুলো বাক্স আর প্যাকেট একটা জালের ভেতর আটকানো।
ডান দিকের সিটে বসল পিটার। স্টার্ট দিয়ে টাওয়ারের অনুমতি নিল পাইলট, তারপর পিটারকে বলল, এক ঘণ্টার পথ, স্যার। দেখতে দেখতে কেটে যাবে।
অস্তগামী সূর্য ওদের পিছনে, পশ্চিম দিক থেকে পৌঁছল ওরা। নীল মখমলের মতো সাগরে লে নিউফ পোইজো যেন পান্না বসানো অমূল্য নেকলেস।
নয়টা দ্বীপ একটা বৃত্ত রচনা করেছে, মাঝখানে আটকে থাকা লেগুনের পানি এত স্বচ্ছ যে কোরালের প্রতিটি শাখা স্রোতের সাথে সাথে কিভাবে মোচড় খাচ্ছে। পরিষ্কার দেখা যায়, যেন পানির ওপর রয়েছে।
ব্যারন পঁচাত্তর সালে দ্বীপগুলো কেনার সময়, বলল পাইলট, ওগুলোর একটা পলিনেশিয়ান নাম ছিল। পুরানো এক রাজার কাছ থেকে একজন মিশনারী উপহার পেয়েছিল, তার বিধবা স্ত্রীর কাছ থেকে কিনে নেন ব্যারন। তিনি পলিনেশিয়ান নামটা উচ্চারণ করতে পারতেন না, তাই বদলে ফেলেন। শ্রদ্ধাভরে হাসল পাইলট।
সাতটা দ্বীপ স্রেফ বালির বিস্তৃতি, এখানে সেখানে সার সার পাম গাছ। বাকি দুটো আকাড়ে বড়, জমাট বাঁধার নিরেট লাভায় মোড়া, নিস্তেজ রোদে চকচক করছে।
নিচের দিকে নামতে শুরু করল প্লেন। জানালা দিয়ে একটা বাড়ি দেখতে পেল পিটার, পাম গাছের পাতা দিয়ে ঢাকা ছাদ। বাড়িটার চারপাশে ফুলবহুল বাগানের আড়ালে অন্যান্য আরো কয়েকটি ছোট বাংলো দেখা গেল। পরমুহূর্তে লেগুনের উপর চলে এল প্লেন, লম্বা জেটির দুপাশে অনেকগুলো ছোট ছোট জলযান রয়েছে। জেটিটা সুরক্ষিত জল সীমা পর্যন্ত লম্বা। নগ্ন মাস্তুল সহ সাধারণ বোট রয়েছে একটা, পাশেই বড় একটা পাওয়ার স্কুনার—-ওটা বোধ হয় পাপেটি থেকে ভারী জিনিসপত্র আনার কাজে ব্যবহার করা হয়–যেমন, ডিজেল। স্কিইং, ডাইভিং, আর ফিশিং এর জন্যে রয়েছে বেশ কয়েকটা পাওয়ার বোট। ওগুলোর একটাকে লেগুনের মাঝখানে দেখা গেল, তীরবেগে ছুটছে আর পিছনে রেখে যাচ্ছে অস্ট্রিচ পাখির পালকের মতো তুষার ধবল দুসারি পানির উত্থান, আরো পিছনে স্কির উপর খুদে একটা মনুষ্য আকৃতি আকাশের দিকে মুখ তুলে ওদের উদ্দেশে অভ্যর্থনাসূচক হাত নাড়াল। মুহূর্তের জন্যে পিটারের মনে হলো, ম্যাগডা হতে পারে কিন্তু হঠাৎ বাক নিল ট্রাই-আইল্যান্ডার, চোখের সামনে হরেক রকম লাল আর গোলাপি মেঘমালা ও দিগন্ত ছোঁয়া সূর্য ছাড়া আর কিছু থাকল না।
রানওয়েটা ছোট আর সরু, সৈকত আর পাহাড়ের মাঝখানে সমতল জমি থেকে পাম গাছের সারি কেটে তৈরি করা হয়েছে। স্ট্রিপের মেঝে বানানো হয়েছে কোরালের টুকরো দিয়ে। একঝাঁক পাম গাছের দিকে নামল ওরা, দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে ধেয়ে আসা বাতাসের তীব্রগতি প্রতি মুহূর্তে ঝাঁকি দিয়ে গেল প্লেনটাকে। পাম গাছগুলোকে পিছনে রেখে রানওয়ে স্পর্শ করল চাকা।
স্ট্রিপের কিনারায় ইলেকট্রিক গলফকার্ট নিয়ে অপেক্ষা করছিল একটা পলেশিয়ান যুবতী, পাম গাছের ছায়া আর রোদ পড়েছে তার গায়ে। পরনে এক প্রস্থ কাপড়, বগলের নিচ থেকে উরুর মাঝামাঝি পর্যন্ত ঢাকা। পা খালি, কিন্তু মাথায় পরেছে তাজা ফুলের তৈরি মুকুট–এ দিকের সব মেয়েই পরে।
সরু মেঠোপথ, আঁকাবাঁকা, দুপাশে বাগান। পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা বাগান কিনা বলতে পারবে না পিটার, তবে বৈচিত্র্যের দিক থেকে বিশেষ একটা স্থান পেয়ে যেতে পারে। প্রতিটা বাকের পর আলাদা আলাদা ফুল বা গাছ, বেশিরভাগই দুর্বল প্রজাতির। প্রতিটি বাকেই অপেক্ষা করছে বিস্ময় আর চমক।
বারান্দার নিচে সাদা বালি নিয়ে পিটারের বাংলো সৈকতের বেশ খানিক ওপরে, বারান্দা থেকে অবাধ দৃষ্টি চলে দিগন্তরেখায় বিলীন সাগর-সীমা। পর্যন্ত, চারপাশে এমন ভাবে গাছপালা সাজানো হয়েছে, মনে হয় গোটা দ্বীপে এটাই বুঝি একমাত্র বাড়ি। বাঁকের পর বাক পেরিয়ে বেপরোয়া বেগে গাড়ি চালিয়ে এল মেয়েটা, ব্রেক কষে লাফ দিয়ে নিচে নামল, তারপর নিরীহ খুকির মতো সাদরে হাত ধরে নামাল পিটারকে।
