নৌকাটা টর্কের জাহাজের পাশে ভিড়ল এবং সে কোন প্রতিবাদ করল না যখন সে তাকে এমনভাবে তুলল যেন সে একটা পুতুল। তাকে নৌকায় তুলে প্রধান। কেবিনে নিয়ে আসা হল। অস্বাভাবিক ভদ্রতা নিয়ে সে তাকে গালিচার উপর বসাল। আপনার দাসীরা নিরাপদ। আমি তাদের আপনার কাছে পাঠিয়ে দেব। সে বলল এবং চলে গেল। সে দরজায় তালা লাগানোর আওয়াজ শুনল। তারপর মই বেয়ে তার উপরে উঠে যাওয়ার শব্দ শুনল এবং তার মাথার উপরের ডেক পার হবার শব্দ শুনল।
আমি কি তাহলে একজন বন্দী, তারপর? সে ফিসফিস করে বলল। কিন্তু এই মাত্র সে যা অবলোকন করে এসেছে তার কাছে এ বিষয়ের গুরুত্ব অনেক কম। সে বালিশে মুখ ঢাকল যাতে টর্কের ঘামের গন্ধ লেগে আছে, এবং চোখের জল না। শুকানো পর্যন্ত সে কাঁদতে থাকল। তারপর একসময় নিজের অজান্তে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
*
অ্যাপেপির পোড়া রাজকীয় জাহাজ হাপির মন্দিরের অপর তীরে ভাসছিল। ভোরে স্থির বাতাসে ধোয়া অনেক উপরে উঠে গেল যা পোড়া মাংসের দুর্গন্ধে ভরপুর ছিল। যখন মিনটাকা জাগল গন্ধ তখন কেবিনে প্রবেশ করেছে এবং তাকে তা অসুস্থ করে তুলল। ধোয়াটা মনে হল সংকেতের মতো কাজ করল, কারণ পূর্ব দিকের পাহাড়ে সূর্যটা উঁকি দিতে না দিতেই লর্ড নাজার জাহাজকে নদীর বাঁকে দেখা গেল।
দাসীরা মিনটাকার কাছে সংবাদটা নিয়ে এল। লর্ড নাজা তার পুরো বাহিনী নিয়ে এসেছে, তারা উত্তেজিতভাবে তাকে বলল। অথচ গতকাল সে আমাদের থেকে বিদায় নিয়ে থেবস এর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। এটা কি অদ্ভুত নয় যে সে এতো দ্রুত এখানে পৌঁছতে পারল, যেখানে সে নদীর উজানে বিশ ক্রোশের মত গিয়েছিল?
বিস্ময়কর অদ্ভুত, মিনটাকা গম্ভীরতার সাথে সম্মত হলো। আমাকে নিশ্চয়ই কাপড় পড়তে হবে এবং তৈরি হতে হবে নতুন কোন জঘন্য নাটকের জন্য যা এখন আমার জন্যে অপেক্ষা করছে।
তার মালপত্র সব জাহাজে আগুনে পুড়ে গেছে কিন্তু তার সহচারীরা অন্য সম্মানীয় মহিলাদের কাছ থেকে তার জন্যে কাপড় ধার করে আনল। তারা তার চুল ধৌত করল ও কোঁকড়ানো করে তা বিনি করল, তারপর একটা সাধারণ লিনেনের কামিজ, স্বর্ণের কোমর বন্ধ এবং স্যান্ডেল তাকে পড়িয়ে দিল।
দুপুরের আগে একদল সশস্ত্র সৈন্যদল জাহাজে এল এবং সে তাদের ডেকের উপর অনুসরণ করল। তার চোখ প্রথমে গেল কালো হয়ে যাওয়া রাজকীয় জাহাজের কাঠগুলোর দিকে যেগুলো দূরে তীরের অন্য দিকে পড়ে আছে, জলসীমায় পুড়ে ভেঙ্গে আছে। ভগ্নাংশ থেকে কাউকে উদ্ধার করার কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এটা তার পরিবারের চিতা। হিকস্দের রীতি হলো দাহ করা; মমি কিংবা অন্য সব শব সকার পদ্ধতির ন্যায় অনুষ্ঠান দীর্ঘায়িত করা নয়। মিনটাকা জানত তার পিতাও তার নিজের শেষ যাত্রাটা এভাবেই করত এবং তা তাকে একটু শান্তি দিল। তারপর সে খিয়ানের কথা ভাবল এবং তার চোখ ফিরিয়ে নিল। খুব কষ্টে সে তার কান্না আটকাল। সে অপেক্ষারত নৌকায় নামল এবং তাকে হাপির মন্দিরের নিচের তীরে নিয়ে যাওয়া হল।
লর্ড নাজা তার সকল সাথীদের নিয়ে তার সাথে সাক্ষাতের অপেক্ষায় ছিল। নাজা যখন তার সাথে আলিঙ্গন করল তখন সে উদাসীন ও বিমর্য রইল। এটা আমাদের সবার জন্য একটা তিক্ত সময়, রাজকন্যা। সে বলল, আপনার পিতা, রাজা অ্যাপেপি ছিলেন একজন মহান যোদ্ধা ও শাসক। দুই রাজ্যের মধ্যে নতুন সাম্প্রতিক চুক্তির জন্যে এবং এই মিশরকে একটা পবিত্র ও ঐতিহাসিক রাজ্যে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তিনি একটা বিপদজনক শূন্যতা তৈরি করলেন। সকলের ভালোর জন্য এই শূন্যতা অতি শীঘ্রই পূরণ করতে হবে।
সে তার হাত ধরে তাকে মঞ্চে নিয়ে গেল যা গত সন্ধ্যায় ছিল ভোজ ও উৎসবের স্থান। কিন্তু এখন সেখানে দুই রাজ্যের অধিকাংশ উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি ও আমলাবর্গ নীরবে জমায়েত হয়েছেন।
সে টর্ককে এই ভিড়ের একেবারে সামনে দেখল। পুরোদমে সামরিক সাজে সে একজন লক্ষণীয় অবয়ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার তলোয়ারটা স্বর্ণের আংটা লাগানো বেল্টের সাথে ঝুলিয়েছে এবং কাঁধে তার যুদ্ধের ধনুকটা রাখা। তার পিছনে দাঁড়ানো তার সকল পদস্থ অফিসারেরা গম্ভীর ও শীতল দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে এবং উজ্জ্বল ফিতায় তাদের দাড়ি সাজানোর পরও তাদের নিষ্ঠুর দেখাচ্ছিল। তাদের মুখে হাসি দেখা গেল না এবং সে তিক্তভাবে সচেতন ছিল যে সে-ই অ্যাপেপির বংশের শেষ ব্যক্তি, একা ও অরক্ষিত।
সে ভেবে বিস্মিত হলো এখন কার কাছে সে আবেদন করবে ও কার আনুগত্যের উপর সে নির্ভর করতে পারে। সে লোকজনের মাঝে পরিচিত বন্ধুত্বপূর্ণ মুখ খুঁজল। সেখানে যারা এখন আছে তার সবাই বলতে গেলে তার পিতার সভাসদ এবং উপদেষ্টা ছিল এবং তার যুদ্ধের ময়দানের সেনাপতি ও সহচরেরাও এখানে রয়েছে। সে দেখল তারা কেউই তার মুখের দিকে সরাসরি তাকাচ্ছে না। তার উদ্দেশ্যে কেউ হাসল না কিংবা কেউ তাকে আশ্বস্ত করল না। তার জীবনে এতো একাকীত্ব সে আর কখনো অনুভব করেনি।
নাজা তাকে মঞ্চের একপাশের একটা গদির টুলের কাছে নিয়ে গেল। সে বসতেই নাজা ও তার লোকেরা তার চতুর্দিকে একটা মানব পর্দা তৈরি করে আসন নিল, লোকজনের চোখ থেকে তাকে আড়াল করতে। সে নিশ্চিত এটা ইচ্ছে করেই। করা হয়েছে।
