ডেকের উপর চাঁদহীন রাতটা প্রজ্জ্বলিত আগুনের শিখায় আলোকিত। তারা রাজকীয় জাহাজের সামনের খোলা দরজায় গর্জন তুলছে। লাফিয়ে তা মাস্তুলের উপর উঠছে এবং এক নারকীয় কমলা বর্ণে মাস্তুলটা সজ্জিত করছে। সে পূর্বে কখনো কাঠের নৌ-তরী পুড়তে দেখেনি এবং আগুনের শিখার গতি ও হিংস্রতা তাকে হতভম্ব করে দিল।
সে বেশিক্ষণ ওটার তাকিয়ে থাকতে পারল না কারণ নিজেকে সে দ্রুত ডেকের পাশে বয়ে নিয়ে যেতে দেখল এবং পাশে অপেক্ষারত ছোট নৌকার মধ্যে তাকে নামানো হচ্ছে বুঝল। দ্রুত তার বাস্তব জ্ঞান ফিরে এল এবং সে আবার ধস্তাধস্তি ও চিৎকার করতে শুরু করল। আমার পিতা! আমার ভাইয়েরা! খিয়ান! তারা কোথায়?
নৌকা নদীতে ভাসল এবং সে তার সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে মুক্ত করার জন্যে যুদ্ধ শুরু করল। কিন্তু যে হাতগুলো তাকে ধরে ছিল তা ছিল অনুকম্পাহীন। কোনো রকমে সে তার মাথা ঘোরাল এবং যে তাকে ধরেছিল তার চেহারাটা দেখল।
টর্ক! সে তার দৃষ্টতায় রেগে গেল। সে তার সাথে যাচ্ছে-তাই ব্যবহার করছে। এবং তার চিৎকার এড়িয়ে যাচ্ছে। আমাকে যেতে দাও। আমি তোমাকে আদেশ করছি।
সে সাড়া দিল না। এখন সে তাকে হালকাভাবে ধরে আছে, কিন্তু জ্বলন্ত জাহাজটা সে শান্ত, নির্বিকার অভিব্যক্তি নিয়ে দেখছিল।
ফিরে চল! সে তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করল। আমার পরিবার! ফিরে যাও এবং তাদের উদ্ধার করো!
তার একমাত্র সাড়া ছিল চিৎকার করে মাঝিদের আদেশ দেয়। জোরে চালিয়ে যাও! তারা বৈঠা চালাল এবং নৌকা স্রোতে দুলতে লাগল। নাবিকার বিমুগ্ধ হয়ে জ্বলন্ত জাহাজ দেখছিল এবং ফাঁদে পড়া জাহাজের ডেকগুলো থেকে আর্তনাদের চিৎকার ভেসে আসছিল। হঠাৎ করে ডেকের পিছনটা আগুনের শিখা ও স্ফুলিঙ্গে বিশাল ভবনের ন্যায় ভেঙে পড়ল। নোঙ্গর করে রাখা রশিগুলো পুড়ে গেল এবং জাহাজটা ধীরে স্রোতের টানে নদীর ভাটিতে ভেসে গেল।
দয়া কর। মিনটাকা তার কণ্ঠ পরিবর্তন করল। দয়া কর, লর্ড টর্ক, আমার পরিবার! তুমি তাদের পুড়তে দিতে পারো না।
এখন আর জাহাজের ভেতর থেকে আসা চিৎকার নেই এবং তার জায়গায় আগুনের নিচু গর্জন শোনা যাচ্ছে। মিনটাকার চোখের পানি গাল বেয়ে চিবুক দিয়ে গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু এখন সে শয়তানটার হাতের মুঠোয় অসহায়।
হঠাৎ করে জ্বলন্ত ডেকের প্রধান দরজা খুলে গেল এবং নৌকার নাবিকরা ভয় পেয়ে গেল যখন দেখল একটা অবয়ব বেরিয়ে এল। লর্ড টর্ক মিনটাকাকে শক্ত করে ধরল যতক্ষণ না সে তার পাজরে চাপ দিল। এটা হতে পারে না! সে খসখস করে বলল।
ধোঁয়া ও আগুনের ভেতর দিয়ে মনে হল একটা পাতালপুরীর ছায়া থেকে কোন প্রেতাত্মা–নগ্ন ও চুলে ঢাকা, যার বড় পেটটা ফাঁপানো, অ্যাপেপি জাহাজের কিনারে দিকে হেলে দুলে চলল। সে তার হাতে তার ছোট ছেলের দেহটা বহন করছে, এবং আগুনের ধবংস যজ্ঞের মধ্যে বাতাস টানার জন্যে তার মুখ পুরোটা ভোলা।
দৈত্যটাকে খুন করা কঠিন। টর্কের রাগটা ভয় মিশ্রিত। এমনি নিজের দুর্দশার মধ্যেও মিনটাকা তার কথার অর্থ বুঝতে পারল।
তুমি, টর্ক। সে ফিসফিসাল। শেষ পর্যন্ত তুমি তাদের সাথে এরকম করলে। টর্ক অভিযোগটা এড়িয়ে গেল।
অ্যাপেপির দেহের ঘন নোম এক মুহূর্তের জন্য তাকে নগ্ন ও কালো করে দিয়ে তাপের এক ঝাঁপটায় ঝলসে চলে গেল। তারপর তার চামড়ায় ফোঁসকা পড়তে শুরু করল এবং চামড়া কুঁচকাতে লাগল। তার দাড়ির ঝোঁপ ও মাথার চুল তেলে চোবানো মশালের ন্যায় জ্বলছে। সে আর সামনে এগোচ্ছে না, কিন্তু পায়ের পাতায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং খিয়ানকে তার মাথার উপরে তুলে ধরে রেখেছে। বালকটিও তার মতই ঝলসানো এবং যেসব জায়গায় চামড়া পুড়ে গেছে সেখানে কাঁচা মাংস লাল ও ভেজা দেখাল। সম্ভবত অ্যাপেপি আগুন থেকে বাঁচানোর জন্যে তাকে জাহাজের পাশে নদীতে ফেলার চেষ্টা করছে। কিন্তু তার শক্তি অবশেষে তাকে ব্যর্থ করল এবং মাথায় আগুন নিয়ে সে অতিকায় মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল। তার ছেলেকে নিরাপদে নীলের ঠাণ্ডা পানিতে নিক্ষেপ করার জন্যে শেষ শক্তিটুকু এক করতে সে ব্যর্থ হল।
মিনটাকা নড়তে পারল না এবং ঐ দৃশ্যের ভয়াবহতায় সে চুপসে গেল। তার মনে হলো এটা অনন্ত কাল ধরে চলল যতোক্ষণ না অ্যাপেপির পায়ের নিচের ডেক পুড়ে ভেঙ্গে পড়ল। সে ও তার ছেলে তার মধ্য দিয়ে পড়ে গেল এবং লম্বা আগুনের ঝর্ণা, ফুলিঙ্গ ও ধোয়া সহকারে জাহাজটা নীলের পেটের মধ্যে চলে গেল।
সব শেষ। টর্কের কণ্ঠ নিরাবেগ ও নিরাসক্ত। সে মিনটাকাকে এতো আকস্মিকভাবে ছেড়ে দিল যে সে নৌকার মেঝেতে পড়ে গেল। সে তার ভয়ার্ত নাবিকদের দিকে তাকাল। আমার জাহাজের দিকে বৈঠা বাও। সে আদেশ দিল।
তুমি আমার পরিবারের এই হাল করলে? মিনটাকা আবার বলল। সে তার পায়ের কাছে পড়ে ছিল। তোমাকে এর জন্যে খেসারত দিতে হবে। আমি তোমাকে কসম খেয়ে বলছি। আমি তোমাকে এর খেসারত দিতে বাধ্য করবো।
কিন্তু তার নিস্তেজ শরীরে সে বলি শিরের দাগ অনুভব করল যেন তাকে শক্ত হাতলওয়ালা গিটযুক্ত চামড়ার চাবুক দিয়ে পেটানো হয়েছে। তার পিতা নেই, যা তার জীবনের স্মরণীয় বিশাল এক অবয়ব যাকে সে একটু ঘৃণা করেছে এবং তার চেয়ে অনেক বেশি ভালোবেসেছে। তার পরিবার নেই। তার সকল ভাইয়েরা এমনকি ছোট্ট খিয়ান যে তার কাছে সহোদরের চেয়ে পুত্ৰই বেশি ছিল তাকে সে পুড়তে দেখেছে এবং সে জানে এই ভয়ংকর দৃশ্যটা তার জীবনের বাকি সব দিনগুলোতে তার সাথে থাকবে।
