এদিকে এমন কি মন্দিরের পবিত্র কালো বাচ্চা মোরগগুলোও পশুটার দূষিত নাড়িভুড়িতে ঠোকর দিতে অস্বীকৃতি জানাল। যাজকরা ঐ বীভৎস বস্তুগুলো মন্দিরের আগুনে নিক্ষেপ করল। কিন্তু নাড়ি ভুড়িগুলোকে তা না পুড়িয়ে যে আগুন যুগ যুগ ধরে প্রজ্জ্বলিত হয়ে আসছে তা হঠাৎ নিভে গেল। ঐ সংকেতও কম অশুভ নয়। তখন প্রধান যাজক নাড়িভুড়ি পুঁতে ফেলার নির্দেশ দিল ও আগুন আবার জ্বালাতে বলল। আমি কখনো এমন অশুভ লক্ষণ দেখি নি। সে তার সহকারীকে বলল। প্রভু হাপি থেকে এরকম ইশারা কেবল কোন ভয়ংকর ঘটনার পূর্বাভাসই হতে পারে। যেমন যুদ্ধ অথবা ফারাও-এর মৃত্যু। ফারাও নেফারের সুস্থতার জন্যে আমাদের অবশ্যই সারারাত ধরে প্রার্থনা করতে হবে।
নদীর তীরে লর্ড টর্ক উজ্জ্বল লাল, হলুদ ও সবুজ রঙের পর্দা দিয়ে রাজ পরিবারের জন্য মঞ্চ তৈরি করেছে। আস্ত বঁড় গর্তের উজ্জ্বল ছাই-এর উপর ঝলসানো হচ্ছে এবং সবচাইতে ভালো মদ নদীর পানিতে ঠাণ্ডা করা হচ্ছে। দাসরা ওগুলোর ভারে তীরের উপর হেলে নুইয়ে পড়ল যখন তারা একজন আরেকজনের হাতে তা দিল এবং অ্যাপেপি নতুন জার আনতে বারবার গর্জন করে আদেশ দিচ্ছিল।
প্রতি বোল গ্রহণের সাথে সাথে রাজার বিষণ্ণতা হালকা হয়ে গেল এবং শীঘ্রই সে তার পুত্রদের সাথে, তার সেনাবাহিনীকে বেফাঁস গান গাইতে যোগ দিতে উৎসাহ দিল। কিছু এতোটাই অকথ্য গালি গালাজ ছিল যে মিনটাকা ক্লান্ত হল ও তার মাথা ব্যথা ধরল এবং সে ও তার দাস মেয়েরা তীর থেকে দূরে নোঙ্গর করা রাজকীয় জাহাজে বিশ্রাম নিতে যাওয়ার জন্যে উঠে দাঁড়াল। সে তার সাথে তার ছোট ভাই খিয়ানকে নেওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু অ্যাপেপি বাধা দিল। ভালো মদ তাকে মন্দিরের কথিত ভবিষ্যৎ বাণী যা ছিল তার আসন্ন অভিশাপ তা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। বালকটিকে ছাড়, বদরাগী মেয়ে। ভালো সঙ্গীত কীভাবে প্রশংসা করতে হয় তা তার শেখা উচিত। সে অতিরিক্ত আদরে ছেলেটিকে তার দিকে জড়িয়ে নিল এবং মদের বোল তার ঠোঁটের কাছে ধরল। এক চুমুক খাও বাছা। এটা তোমাকে আরো ভালো গাওয়াবে, আমার ছোট্ট রাজকুমার।
খিয়ান তার পিতাকে ভক্তি করল এবং এরকম প্রকাশ্য সহমর্মিতা তার মাঝে এক প্রকার অহংকার ও বীর পূজার অনুভূতি নিয়ে এল। অবশেষে তার পিতা তাকে একজন পুরুষ ও যোদ্ধা রূপে বিবেচনা করছে। যদিও তা দেখে সে নাক সিঁটকালো তবুও সে বোলটা কোনভাবে মুখে চালান করে দিল এবং টর্কের নেতৃত্বের সঙ্গ তাকে প্রফুল্ল করল যেন সে যুদ্ধের ময়দানে তার প্রথম শত্রু হত্যা করল।
মিনটাকা ইতস্তত করতে লাগল। সে তার ছোট ভাইকে রক্ষা করার একটা প্রায় মাতৃত্ব পূর্ণ দায়িত্ব অনুভব করল কিন্তু সে বুঝল তার পিতার এখন কোন হুশ নেই। সমস্ত গাম্ভীর্যতা নিয়ে সে তার সহচারীদের নিয়ে নদীর তীরে চলল এবং মাতালদের চিৎকার ছেড়ে তারা দূরে জাহাজে চলে গেল।
মিনটাকা তার গালিচার উপর শুয়ে হৈচৈ-এর আওয়াজ শুনতে লাগল। সে ঘুমানোর চেষ্টা করল কিন্তু নেফার তার মনের পর্দা আড়াল করে আছে। হারানোর ব্যথা এবং নেফারের আঘাতে তার চিন্তা যা সারাদিন তার মনকে আচ্ছন্ন করে ছিল তা আবার ফিরে এল এবং যদিও সে তা বাধা দেয়ার চেষ্টা করল তবুও তার অশ্রু ঝড়তেই লাগল। সে তার কান্নার আওয়াজ বালিশে চেপে গোপন করল।
অবশেষে সে একটা কালো, স্বপ্নহীন ঘুমে ডুবে গেল যেখান থেকে যে খুব কষ্টে জাগল। সে অল্প একটু মদ খেয়ে ছিল কিন্তু তারপরও নিজেকে তার নেশা গ্রন্থের মত লাগছে এবং তার মাথা ব্যথা করছে। সে জেগে ভাবতে লাগল কি এমন যা তাকে এভাবে জাগিয়ে দিল। তারপর সে জাহাজের মধ্য দিয়ে কতগুলো কর্কশ পুরুষ কণ্ঠ শুনল যারা নিচে জাহাজে উঠেছে। তার মাথার উপরের ডেক থেকেও মদ্যপায়ীর হাসি ও কণ্ঠস্বর এবং ভারি পায়ের আওয়াজ শুনল। তাদের কথা থেকে বোঝা গেল তার পিতা ও তার ভাইদেরকে জাহাজে তোলা হচ্ছে। তার পরিবারের লোকেরা মদ খেয়ে এই অবস্থায় যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয় কিন্তু তার ছোট খিয়ানের জন্যে চিন্তা হল।
সে নিজেকে টেনে বিছানা থেকে তুলল এবং দ্রুত পোশাক পড়ে নিল। কিন্তু সে অদ্ভুত রকমের একটা হতোদ্যম দ্বিধান্বিতা অনুভব করল। যখন সে ডেকে উঠে এল তখন সে দুলতে লাগল।
প্রথম যে লোকটির সাথে তার দেখা হল সে হল লর্ড টর্ক। যে লোকগুলো তার পিতাকে বহন করছিল সে তাদের নির্দেশ দিচ্ছিল। তার বিশাল জড় দেহটাকে বহন করতে ছয়জন লোক লেগেছে। তার বড় ভাইয়ের অবস্থাও এর চাইতে ভালো না। তার রাগ হলো ও তাদের কারণে তার লজ্জা হলো। সে দেখল একজন মাঝি খিয়ানকে নিয়ে আসছে এবং সে দৌড়ে তার কাছে গেল, এখন তারা খিয়ানকেও তাদের মতো করেছে। সে তিক্ত ভাবে ভাবল। তারা ততোক্ষণ পর্যন্ত থামবে না যততক্ষণ তারা তাকেও মাতাল বনাবে।
যে মাঝি খিয়ানকে বহন করছে সে তাকে বলল তার পিতার কেবিনের গালিচায় খিয়ানকে নিয়ে যেতে। সেখানে নিয়ে গিয়ে সে তার পোশাক খুলল এবং জোড় করে তার জ্ঞান ফিরাতে তার ঠোঁটের মধ্য দিয়ে গুল্মের তৈরি একটা ওষুধ দিল। ওষুধটা সর্বরোগের যা টাইটা তার জন্য তৈরি করেছে এবং মনে হয় এটা কাজ করবে। অবশেষে খিয়ান বিড়বিড় করল এবং তার চোখ খুলল। তারপর সঙ্গে সঙ্গেই গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু স্বাভাবিক ঘুম। আমি আশা করি এ থেকে সে শিখবে। সে বিড়বিড় করে বলল। তাকে ঘুমাতে ছেড়ে আসা ছাড়া তার পক্ষে আর কিছু করার ছিল না। তাছাড়া এখনো তার অস্বাভাবিক নিদ্রালু ভাবটা লাগছে এবং তার মাথা ব্যথাটা অসহনীয় ছিল। সে তার কেবিনে ফিরে গেল এবং পোশাক খোলার কষ্ট না করে সে তার গালিচার উপর শুয়ে পড়ল এবং তৎক্ষণাৎ আবার ঘুমে ডুবে গেল। পরের বার যখন সে জাগল ভাবল সে দুঃস্বপ্ন দেখছে কারণ সে চিৎকার শুনতে পেল এবং সে ভারি ধোয়ার মেঘে শ্বাস নিচ্ছিল যা তার কণ্ঠের পিছন দিক দগ্ধ করল। পুরোপুরি জেগে ওঠার পূর্বেই সে নিজেকে তার বিছানাকে থেকে অন্যত্র বাঁধা অবস্থা পেল, পশুর চামড়ার কম্বলে জড়িয়ে তাকে ডেকে নিয়ে আসা হয়েছে। সে আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু একটা শক্তিশালী হাতের মধ্যে একটা শিশু যেমন অসহায় থাকে সেও এখন তেমন অবস্থায়।
