নেফার ভাবল তীরটা পশুর হৃদপিন্ডে আঘাত লেগেছে। কেননা বিশাল আলোড়ন তুলে সিংহটা অনেক উঁচুতে লাফ দিল এবং তার ঘোঁত ঘোঁত একটা অবিরাম গর্জনে পরিণত হয়েছে। তার মাথার উপরের কাটা গাছের শাখায় একটা শুকনো পাতার আলোড়ন সে সৃষ্টি করল। তারপর পশুটা বৃত্তাকারে ঘুরতে লাগল ও নিজের বুকে খাবলা মারতে মারতে তীরের ফলার বাইরের অংশটুকু চিবিয়ে টুকরো টুকরো করল। মিনটাকা অনেকটা প্রায় তার উড়ন্ত বাঁকা থাবার নিচে পড়ে আছে। ওটা থেকে দূরে সরো। নেফার ভয়ে চিৎকার দিল, দৌড় দাও।
নেফার নিচু হয়ে পায়ের কাছে রাখা খাপ থেকে আরেকটা তীর তুলে নিল এবং সামনে দৌড়ে গেল। কাছাকাছি গিয়ে সে তীরটা ছুঁড়ল। মিনটাকা লাফ দিয়ে উঠল। সে বুঝতে পেরেছে নিরাপত্তার জন্যে তার দিকে দৌড়ে গিয়ে তার লক্ষ্যে বাধা দেওয়া ঠিক হবে না। তাই সে নিকটস্থ কাঁটা গাছের গুঁড়ির পিছনে সরে গেল। আহত সিংহটার মনোযোগ তার দিকে ফেরাতে এটুকুই যথেষ্ট ছিল। এখন ক্ষুধার চাইতে ব্যথায় ও রাগে সে তার দিকে তেড়ে এল। মিনটাকা যে গাছের পিছনে গুটিয়ে ছিল সেটা থেকে পশুটার বাঁকানো হলুদ নখগুলো এক খাবলা ভিজা বাকল থাবা মেরে তুলে ফেলল।
এসো! আমি এখানে! আমার কাছে চলে এসো! নেফার জোরে চেঁচিয়ে উঠল। সিংহটার মনোযোগ মিনটাকার দিক থেকে সরাতে চেষ্টা করল।
সিংহটি তার বিশাল, ঝাকড়া কেশর মাথাটা তার দিকে ঘোরাল। সাথে সাথে নেফার আরেকটা তীর তাক করে দ্রুত তীরটা ছুঁড়ল। তার বাহু কাঁপছিল এবং তার লক্ষ্য ছিল দ্রুত ও বন্য। তীরটা এবার পশুটির পেটে বিধল। ব্যথায় সে কাশি দিয়ে উঠল। ওটা মিনটাকাকে ছেড়ে এবার নেফারের উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
যদিও পশুটা মারাত্মকভাবে আহত এবং ইতোমধ্যে তার শক্তি ধীর হয়ে আসছে তবুও এই সুবর্ণ সুযোগ নেফারের এড়িয়ে যাওয়ার কোন পথ ছিল না। সে তার শেষ তীর ছুঁড়ে ফেলেছে এবং খাপটা মাটিতে তার নাগালের বাইরে পড়ে আছে। সে হাত নামাল এবং বেল্টের খাপ থেকে তার ছুরি বের করে আনল।
এ হিংস্র পশুটার বিপরীতে যা একটা অতি হালকা অস্ত্র। পাতলা ব্রোঞ্জের ফলটা তার হৃদপিন্ড পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্যে যথেষ্ট লম্বা নয়, কিন্তু সে বাজ শিকারীদের এ রকম ভয়ংকর অবস্থা থেকে বাঁচার গল্প বলতে শুনেছে। যখন সিংহটা মৃত্যু লাফ দিল, নেফার পিছনে পড়ে গেল। এমনকি পশুটার ওজন ও আক্রমণ এড়িয়ে যেতে চাইল না। সে পশুটার দুই থাবার সামনে পড়ে গেল এবং সিংহটা তার চোয়াল পুরোপুরি খুলে ভয়ংকর উঁচু লম্বা সরু দাঁত দিয়ে নেফারের খুলি কামড় দিতে মাথা নামাল। জন্তুটার নিঃশ্বাস এতোটাই দুর্গন্ধযুক্ত, পচা মাংসের ন্যায় যে নেফার অনুভব করল তার গলার মধ্যে গরম বমি উঠে এসেছে। তবে সে ঠিক সময়ের অপেক্ষা করল এবং তার ডান হাতে ছুরিটা ধরে খোলা চোয়াল দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে আড়াআড়ি করে ধরে রইল। সহজাত স্বভাবে সিংহটা কামড় দিল।
নেফার তার মুঠিতে শক্ত করে চাকুটা ধরে আছে। ফলাটা উপরের দিকে ধরা এবং যখন সিংহ চোয়াল বন্ধ করল ব্রোঞ্জের ফলাটা সরাসরি তার মুখের তালুতে ঢুকে গেল। তার কব্জির হাড়ে দাঁত বসে যাওয়ার আগেই নেফার টান দিয়ে হাত বের করে আনল। সিংহের দুচোয়ালের মাঝে চাকু থাকায় মুখটা হা হয়ে রইল এবং তার কামড় নিচে নামাতে পারল না।
এবার পশুটা তার সামনের থাবা উঁচিয়ে তার দিকে তেড়ে আসছিল, নখগুলো পুরোপুরি বর্ধিত। তার বিশাল দেহের নিচে নেফার নড়াচড়া করতে লাগল। কিছু থাবা এড়িয়ে গেল কিন্তু তার কাপড় ছিঁড়ে গেল এবং নখের একটা আঁচড় তার মাংসের মধ্যে দেবে গেছে তা সে অনুভব করল। সে জানে আর বেশিক্ষণ সে তা ধরে রাখতে পারবে না। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে সিংহের নিচে থেকে চিৎকার দিল, ছেড়ে দে আমাকে, বিকট নোংরা জানোয়ার! আমাকে ছাড়!
সিংহটা এখনো গর্জন করছে এবং তার তালু থেকে রক্ত লাল মেঘের মতো বের হচ্ছে সেই সাথে দুর্গন্ধযুক্ত শ্বাস ও গরম লালা নেফারের মুখের উপর এসে পড়ছে।
তার চিৎকার মিনটাকার কানে গেল এবং যখন সে কাঁটা গাছের পিছন থেকে উঁকি মারল দেখল সিংহের দেহের নিচে পুরোপুরি রক্তে ঢাকা অবয়ে নেফার পড়ে রয়েছে। তাকে মেরে ফেলা হচ্ছে এবং সাথে সাথে সে তার ভয় ভুলে গেল।
নেফারের ধনুক তার দেহের নিচে আটকে ছিল এবং এটা ছাড়াও ভরা তীরের খাপটা তার এখন দরকার। সে গাছের পিছন থেকে লাফ দিয়ে বের হয়ে রথের দিকে দৌড় দিল। চিৎকার ও গর্জন তার পিছনে চলতেই থাকল এবং সে দৌড়াল যততক্ষণ না মনে হল তার হৃদপিন্ড ফেটে যাবে।
তার সামনে ঘোড়াগুলো পশুটার গন্ধ ও গর্জনে ভয় পেয়ে গেছে। তারা ডাকাডাকি করছিল। মাথা নাড়ছে এবং রশিতে লাথি মারছে। তারা হয়তো অনেক আগেই দৌড়ে পালাত কিন্তু নেফার এক পাশের চাকায় গতিরোধ দিয়ে রেখেছিল ফলে তারা শুধুমাত্র আটসাট হয়ে ডান দিকে বৃত্তাকারে ঘুরছিল। মিনটাকা তাদের উড়ন্ত খুরের নিচে দৌড়ে গেল এবং লাফ দিয়ে পাদানিতে উঠল। সে খোলা লাগামটা হাতে নিল ও চিৎকার করে বলল, সেখানে যা, স্টার গেজার! হ্যামার শক্ত করে ধর।
পূর্বের অনেক প্রমোদ ভ্রমণে নেফার তাকে গাড়ি চালাতে শিখিয়েছে তাই ঘোড়াগুলো তার কণ্ঠ চেনে এবং রশিতে তার স্পর্শ চিনতে পারল। দ্রুত সে তাদের নিয়ন্ত্রণ নিল কিন্তু তার মনে হয় অনেক সময় চলে গেছে। কারণ সে নেফারের চিৎকার ও পশুটার কান ফাটানো গর্জন শুনতে পেল। সে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে একপাশে ঝুঁকে গতি রোধকটা খুলে দিল। সে তাদের বাঁ দিকে ঘুরাল তারপর সোজা সিংহ ও তার শিকারের দিকে তা চালাল।
