সে তার হলুদ চোখ দিয়ে মনুষ্য সৃষ্টিটাকে দেখল এবং তার উপরের ঠোঁট নীরবে উঠে গেল। সিংহ হিসেবে তার মা তাকে মরা মাংস খেতে শিখিয়েছে যা তারা যুদ্ধের ময়দান থেকে আহার করত। তার ওরকম স্বাভাবিক তিক্ততা ছিল না যা অধিকাংশ মাংসাশী প্রাণীর মানুষের মাংসের স্বাদের প্রতি থাকে। বছর জুড়ে সে হত্যা করেছে এবং এই মাংস খেয়েছে আর এখন এই সুযোগটা নিজে নিজে উপস্থিত হয়েছে। সে দেখল এই জীবটা স্বাভাবিক শিকারের মতই তার দিকে গুল্মের ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসছে।
সিংহটা যেখানে শুয়ে আছে তার থেকে পঞ্চাশ কদম দূরে মিনটাকা থামল এবং চারপাশে তাকাল। শিকারী সিংহের স্বভাব হচ্ছে তার শিকারের দিকে সরাসরি না তাকানো। তাই সিংহটা তার মাথা মাটির সাথে মিশিয়ে রাখল এবং চোখ সরু করে রাখল। এটা আক্রমণ করার সময় নয় এবং ফলে তার লেজ অনমনীয় ও নিচু করা।
মিনটাকা একটা গাছের গুঁড়ির পিছনে গুটিসুটি মেরে বসল এবং তার মূত্রথলি খালি করল। মূত্রের তীক্ষ্ণ গন্ধটা সিংহের নাকে পৌঁছতেই ওটা নাক কুঁচকে গভীর দাগের সৃষ্টি করল। এটা তার আকর্ষণ আরো বাড়িয়ে দিল। মিনটাকা আবার দাঁড়াল এবং তার ছেঁড়া স্কার্ট তার উরুর চারদিকে ঠিক-ঠাক করে পড়ে নিল। সে ঘুরে সিংহটা থেকে বিপরীতে যেখানে নেফার অপেক্ষা করছিল, সেদিকে ফিরতে লাগল।
সিংহটি এবার তার লেজ আগে পিছে নাড়াল, ধাওয়া কারার পূর্বাভাস। সে তার মাথা তুলল এবং কালো পুচ্ছ লেজ দিয়ে তার দেহে আঘাত করল।
লেজের একটানা শাঁই শাঁই ও ধুপধুপ আওয়াজ মিনটাকার কানে আসতেই সে থামল এবং পিছনে তাকাল, হতভম্ব হয়ে গেল। সে পশুটার হলুদ চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। সে চিৎকার করে উঠল, এতো তীক্ষ্ণ আওয়াজ যা নেফারের হৃদয়ে আঘাত করল। নেফার এক ঝটকায় ঘুরে গেল এবং মুহূর্তের মধ্যে সে বালিকাটি এবং গুটিসুটি মারা পশুটার মুখোমুখি দাঁড়াল।
দৌড় দিও না, সে চিৎকার করে বলল। সে জানে যদি মিনটাকা দৌড় দেয় তবে বিড়ালের মতো সিংহটাও তাকে ধাওয়া করবে। আমি আসছি।
সে ড্যাশবোর্ডের তাক থেকে তার ধনুকটা এবং তীরের খাপটা টেনে নিল এবং দৌড়ে তার কাছে গেল। দৌড়ানো অবস্থাতেই সে একটা তীর তাক করল।
দৌড় দিও না! সে উন্মাদের মতো আবার বলল। আর তখনই সিংহটা গর্জন করে উঠল। আওয়াজটা এতো ভয়ংকর ছিল যে তা মিনটাকার হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিল এবং তার পায়ের নিচের মাটি কেঁপে উঠল। মিনটাকা তার চেপে বসা ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। সে ঘুরে অন্ধের ন্যায় নেফারের দিকে দৌড় দিল। প্রতি পদক্ষেপে সে ফোঁপাচ্ছিল।
তৎক্ষণাৎ সিংহটির কেশর তার মাথার চার পাশে কালো রেখার মত দাঁড়িয়ে গেল এবং সে নিজেকে শিকারের জন্য প্রস্তুত করল। সোজাসুজি তার পিছনে সরু গাছপালার মধ্য দিয়ে ওটা লাফিয়ে এগিয়ে এল। মিনটাকা এমনভাবে নেফারের দিকে তাকাল যেন সে এখাননা মাটির গভীরে গেঁথে আছে।
নেফার মরার মতো থেমে রইল এবং দুই হাত মুক্ত করার জন্য তীরের খাপ ফেলে দিল এবং ধনুকটা উপরে তুলল। সে তীরটা তার ঠোঁট বরাবর ধরল এবং তার বাহু ভারি বুকের উপর রাখল। যদিও দূরত্ব কম ছিল, তবুও এটা একটা কঠিন কাজ ছিল। পশুটা একটু কোনাকুনি হয়ে আসছিল, তাই কাজটা ছিল জটিল এবং মিনটাকা সরাসরি তীর ছোঁড়ার পথে ছিল। তার চাইতেও বড় কথা হচ্ছে সিংহের আঘাত থেকে মিনটাকাকে সে রক্ষা করতে পারছে না।
তাকে অবশ্যই পশুটাকে বধ করতে তীরের মাথাটা ওটার নাজুক কোন অঙ্গে প্রবেশ করাতে হবে এবং তাকে সরে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এদিকে নিখুঁত হিসেব করারও যথেষ্ট সময় নেই। সিংহটা প্রায় তার উপর চলে এসেছে।
পশুটা প্রতি লাফে ঘোঁত ঘেত শব্দ করে আসছিল, কাঁদার পিন্ড ও কুঁড়ি পাথর ছিটিয়ে এগিয়ে আসছে। তার হলুদ চোখগুলো ছিল ভয়ংকর। তীর ছোঁড়ার জন্যে মাত্র এক হাত জায়গা নেফার পেল। তারপর সে যথাসম্ভব চিৎকার করে বলল, নিচু হও, মিনটাকা! আমাকে তীর ছুঁড়তে একটু জায়গা দাও।
সপ্তাহ জুড়ে তারা এক সাথে শিকার করছে, তারা নিজেদের মধ্যে একটা সঙ্গতি গড়ে তুলেছিল এবং সে তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে শিখেছে। তাই এমনকি ভয়ে এই আত্মহারা অবস্থায়ও সে তার কথা ধরতে পারল। সে প্রায় ছুটন্ত অবস্থাতেই দৌড় থামিয়ে সিংহের থাবার নিচে পাথুরে ভূমিতে শুয়ে পরতে একটুও ইতস্তত করল না।
ঠিক তখন যখনই সে নিচু হল, নেফার তীরটা ছুঁড়ল। তীরটি ধনুকের আংটা থেকে ছুটে গেল। নেফারের ভয়ার্ত চোখে মনে হল এটা খুব ধীরে তাদের মধ্যের ফাঁকা স্থানটা পার হল। মিটাকা যেখানে পড়ে আছে সে স্থানটা তীর পার হল। ইতোমধ্যে ওটা নিচু হতে শুরু করেছে, মনে হচ্ছে ক্ষুদ্র কোন বস্তু ওটা ও অকার্যকরী কিছু, অন্তত এ রকম একটা বিশাল প্রাণীর বিরুদ্ধে।
তারপর এটা নিঃশব্দে আঘাত করল। নেফারের একবার মনে হলো বুঝি পাতলা তীরের ফলাটাকে ঘোঁত ঘোত করা দৌড়ানো প্রাণীটা হাত দিয়ে খাবলে ধরবে এবং অবজ্ঞা নিয়ে পাশে সরিয়ে ফেলে দিবে।
ঠিক যখন সিংহটার খোলা মুখ ও তার উঁচু নিচু লম্বা সরু দাঁতগুলো দেখা গেল তখন তীরের পাতলা ফলাটা তার বুকের ঘনকালো পশমের মধ্যে হারিয়ে গেল। আঘাতের কোন শব্দ হল না। কিন্তু সরু সোজা তীরের ফলাটা নিশ্চিত ওটার ভেতর ঢুকে গেছে। শুধু এক হাত পরিমাণ ফলা ও গোড়ার উজ্জ্বল পালকগুলো বাইরে বেরিয়ে রইল।
