আরো একবার মন্দিরের উঠান রাজকীয় ও গণ্যমান্যদের উজ্জ্বল সমাবেশে পূর্ণ হল। যখন উচ্চকণ্ঠে রাজ ঘোষক চুক্তির লেখা পড়তে শুরু করল, সঙ্গে সঙ্গে নেফারের মনোযোগ যা লেখা হয়েছে তার প্রতি আকৃষ্ট হল। সে ও মিনটাকা যে দিনগুলো একসাথে কাটিয়েছে তখন এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। যখনই তাদের মনে হল তারা কোন ভুল ধরছে অথবা ঘোষক কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে গেছে তখন তারা অর্থ পূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করলো। যাইহোক, এগুলো কমই ছিল এবং নেফার নিশ্চিত যে সে টাইটার ছায়াময় প্রভাব এই বিশাল দলিলের অনেক জায়গায় জুড়ে রয়েছে। অবশেষে সীল মোহর করার সময় এল। বাদ্যের এক সিরিজ ঝংকারের সাথে নেফার নিজের স্মারক চিহ্ন ভেজা মাটিতে ছাপ দিল এবং অ্যাপেপিও তাই করল। নেফর এর এটা দেখে রাগ হল যে হিকস্ রাজা পবিত্র স্মারক গ্রহণ করার সাথে সাথে ফারাও-এর বিশেষ অধিকারও দখল করেছে।
যখন নাজা তার ভারি প্রসাধনে ঢাকা অস্পষ্ট অভিব্যক্তি নিয়ে এসব দেখছিল তখন দুই রাজ্যের যুগ্ম শাসক কোলাকুলি করছিল। অ্যাপেপি তার ভালুকের ন্যায় বিশাল দেহের আলিঙ্গণে নেফারের চিকন দেহটা প্রায় ভাজ করে ফেলল এবং সমাবেশে উপস্থিত ব্যক্তিরা জোরে চিৎকার দিল। অসাধারণ! অসাধারণ!
পুরুষেরা তাদের অস্ত্র ঢালের সাথে আঘাত করে কিংবা বর্শার গাঁট দিয়ে পাথরের পতাকায় আঘাত করে ঝনঝন শব্দ তুলল। দুম দুম্। নেফার নিজেকে অ্যাপেপির শক্তিশালী দেহের দুর্গন্ধের মধ্যে খুঁজে পেল। হিকস্রা এখনো মিশরীয়দের ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি রপ্ত করতে পারে নি। আস্তে করে সে নিজেকে তার যুগ্ম ফারাও-এর বাহু থেকে সরিয়ে আনল। কিন্তু অ্যাপেপি তার দিকে পিতৃব্য সুলভ ভঙ্গিতে চেয়ে রইল এবং তার একটা লোমশ হাত তার কাঁধে রাখল। তারপর সে উঠানে জড়ো হওয়া জনগণের দিকে ঘুরল, এই মহান ভূমির নাগরিকরা, যা আবার একত্রিত হল, আমি আপনাদের কাছে আমার দায়িত্ব ও দেশপ্রেমের ওয়াদা করছি। এর প্রমাণ হিসেবে, আমি আমার মেয়ে রাজকন্যা মিনটাকাকে ফারাও নেফার সেটির সাথে বিবাহের প্রস্তাব দিচ্ছি যে কিনা আমার সাথে এই মিশরের যুগ্ম ফারাও। ফারাও নেফার সেটি, যে আমার সাথে উচ্চ ও নিম্ন রাজ্যের দ্বৈত মুকুটের ভাগিদার এবং যে আমার পুত্র হবে এবং তার সন্তানেরা আমার নাতি হবে।
সমাবেশ যখন এই বিস্ময়কর ঘোষণা শুনল তখন আঙ্গিনায় পিন পতন নিরবতা নেমে এল। তারপর তারা বাদ্য বাজনা বাজিয়ে আরো দ্বিগুণ চিৎকারে ফেঁটে পড়ল, অর্থাৎ তারা এই প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। ফারাও নেফার সেটির চেহারায় এমন এক অভিব্যক্তি ছিল যা যে কোন মূর্খ ব্যক্তিও বোকার হাসি বলে বর্ণনা করবে। সে মিনটাকার দিকে চেয়েছিল। এদিকে মিনটাকা বিস্ময়ে জমে গিয়েছিল, এক হাতে মুখ ঢেকে নিজেকে চিৎকার দেওয়া থেকে বিরত রাখল এবং যখন সে তার পিতার দিকে চাইল তখন বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে গেল।
ধীরে ধীরে একটা গাঢ় আভা তার চেহারায় ছড়িয়ে গেল এবং লাজুকভাবে সে নেফারকে দেখতে চোখ তুলল। তারা দুজন একে অপরের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকল যেন উঠানের ভিড়ে আর কেউ নেই। টাইটা ফারাও-এর সিংহাসনের সামনে থেকে এসব দেখছিল। সে বুঝল অ্যাপেপির ঘোষণার সময়টা একেবারে সঠিক। এখন এমন কোন রাস্তা নেই যেখানে নাজা, টর্ক অথবা অন্য কেউ এই বিয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। টাইটা নাজার সিংহাসনের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল। প্রসাধনের নিচে রাজ-প্রতিভূ স্পষ্টত গভীর আতংকিত হলো, বিশেষ করে তার নিজের পরিণামের কথা ভেবে। যদি নেফার রাজকন্যাকে বিয়ে করে তবে সে নাজার আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে। সে দেখল দ্বৈত মুকুট তার হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে। নাজা বুঝতে পারল টাইটার চোখ তার উপর, কারণ সে
তার দিকে তাকিয়ে আছে। এক মুহূর্তের জন্য টাইটা তার আত্মার গভীরে তাকাল, যেন সে একটা শুকনো কুয়ার ভিতরে তাকাল যা জীবন্ত কোবরায় পূর্ণ যার ভিত্তিতে রাজ-প্রতিভূর নাম দেওয়া। তখন নাজা তার হিংস্র হলুদ চোখগুলো লুকিয়ে ফেলল, শীতলভাবে হাসল এবং সম্মতিতে মাথা নাড়ল। কিন্তু টাইটা জানে সে কি তীব্র ঈর্ষায় জ্বলছে।
যাই হোক, ওই ভাবনাগুলো এতো দ্রুত ও জটিল ছিল যে সে ওগুলো ধরতে পারল না।
টাইটা তার মাথা ঘুরাল ও বিপরীত দিকের হিকস্ সৈন্যদের ভীড়ে লর্ড টর্কের মহাকায় দেহ খুঁজে বের করল। রাজ-প্রতিভূর বিপরীতে, টর্ক তার অনুভূতি ঢাকার কোন চেষ্টা করছে না। সে ছিল ক্রোধান্বিত। তার দাড়ি মনে হল খাড়া হয়ে গেল এবং তার চেহারা কালো রক্তে ফুলে উঠল। সে তার মুখ খুলল যেন অবজ্ঞায় অথবা প্রতিবাদে চিৎকার করবে। কিন্তু নিজেকে সে সামলে নিল এবং তলোয়ারের গাঁটে তার এক হাত রাখল। মুঠির চাপে তার আঙুলের গাঁট সাদা হয়ে গেল এবং তৎক্ষণাৎ টাইটার মনে হল সে বোধহয় তার ফলা বের করবে এবং উঠান পার হয়ে নেফারের চিকন দেহে তা ঢুকিয়ে দেবে। অনেক কষ্টে সে তারা নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনল। নিজেকে সে স্বাভাবিক করল। তারপর এক ঝটকায় ঘুরে উঠান থেকে বেরিয়ে গেল। উত্তেজনা এমন ছিল যে প্রায় কেউ বুঝল না যে সে চলে গেল। শুধুমাত্র অ্যাপেপি নৈরাশ্যবাদী হাসি দিয়ে তাকে দেখল।
