ঝোঁপের মধ্যে থেকে একটা বক গম্ভীর শব্দে বের হল। এটি একটা সংকেত। হঠাৎ বাতাস পাখির কলতানে মুখর হয়ে উঠল। তারা কেন পানিতে এসেছে নেফার প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। সে নৌকায় বসা সুকুমার অবয়ব থেকে তার দৃষ্টি পানিতে সরাল ও নিক্ষিপ্ত লাঠির দিকে তাকাল। সে ধনুকের পরিবর্তে লাঠি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ সে নিশ্চিত যে ভারি অস্ত্র ব্যবহার করার মত তার শক্তি বা দক্ষতা কোনটাই নেই। এটা তাকে একটা আলাদা সুবিধা দিবে। একটা তীরের চাইতে দক্ষভাবে নিক্ষিপ্ত ঘূর্ণনরত একটা লাঠি বেশি প্রশস্ত করে ছুটতে পারে। এটার গদার মতই ভারি ও ওজন। একটা ভোতা তীরের চাইতে ডালে বসা একটা পাখিকে সহজে নিচে ফেলতে পারবে। আবার একটা তীর জলজ পাখির ঘন পুচ্ছ দ্বারা সরে যেতে পারে। নেফার তার শিকারী দক্ষতা দিয়ে মিনটাকাকে প্রভাবিত করতে সংকল্পবদ্ধ ছিল।
ভোরে হাসদের প্রথম ঝকটা উড়ে নিচে নেমে এল। ওগুলো ছিল চকচকে কালো ও সাদা এবং প্রতিটির চুর অগ্রভাগে আলাদা আলাদাভাবে গাঁট রয়েছে। ঝকের প্রথম পাখিটা ভয় পেয়ে সরে গেল এবং অন্যদেরও আয়ত্তের বাইরে নিয়ে গেল। সেই সময়ে বিশ্বাসঘাতক হাঁসটা মনমোহন রূপে ডাকতে লাগল। ওগুলো ছিল আটক ও বশীভূত পাখি যা শিকারীরা হ্রদের ভোলা পানিতে ছেড়েছিল। একটা সুতা দিয়ে ওগুলোর পাখ ও পা নিম্নদেশের কাদার মধ্যে একটা পাথরের সাথে বাঁধা ছিল।
বন্য হাঁসগুলো প্রশস্ত বৃত্তাকারে ফিরে এল। তারপর একে একে পানিতে নামতে লাগল এবং ঘাতক পাখিগুলোর দিকে খোলা পানিতে সারিবদ্ধ হয়ে আসতে লাগল। তারা তাদের পাখা প্রসারিত করে ভাসতে লাগল, দ্রুত উচ্চতা হারিয়ে সোজা নেফারের নৌকার উপর দিয়ে অতিক্রম করল। ফারাও মুহূর্তটা পরিচ্ছন্নভাবে পরিমাপ করল এবং লাঠি নিয়ে উঠে দাঁড়াল ও নিক্ষেপ করার জন্যে প্রস্তুত হল। সে অগ্রবর্তী পাখিটার ঊর্ধ্বমুখে প্রসারিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল এবং তারপর উড়তে দিল। লাঠিটাকে পাশাপাশি ডিগবাজি খাইয়ে উপরে পাঠাল। এদিকে হাঁসটা মিসাইলটি আসতে দেখল এবং ওটাকে এড়ানোর জন্যে একটা পাখা ফেলে দিল। মুহূর্তের জন্য ওটার মনে হল সে হয়তো সফল কিন্তু তারপর একটা ধুপ করে শব্দ হল। পালকের একটা বিস্ফোরণ এবং হাঁসটা অনিয়ন্ত্রিত ডিগবাজি দিয়ে পড়তে লাগল একটা ভাঙ্গা ডানা টেনে টেনে। বেশ পানি ছিটিয়ে পাখিটা পানিতে পড়ল কিন্তু প্রায় সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিল ও পানিতে ডুব দিল।
দ্রুত! ওটার পিছু যাও। নেফার চিৎকার করে বলল। চারটা দাস বালক পানির মধ্যে ধার ঘেঁষে ঝুলে ছিল, শুধু তাদের মাথা দেখা গেল। তারা নৌকার কিনারা অবশ আঙ্গুল দিয়ে ধরেছিল। ইতোমধ্যে ঠাণ্ডায় তারা দাঁতে দাঁতে চেপে ঠকঠক করছিল।
দুজন পতিত পাখিটা ধরতে সাঁতরে গেল কিন্তু নেফার জানত কোন লাভ হবে না। কোন আঘাত ছাড়া শুধু ভাঙ্গা ডানা নিয়ে হাঁসটা ডুব দিয়ে সাঁতরে চলে যাবে। পাখি হারিয়ে গেল, সে তিক্তভাবে ভাবল। এদিকে দ্বিতীয়বার লাঠি ছোঁড়ার পূর্বে সে দেখল হাঁসের ঝাঁকটা হ্রদের কোণাকুনি মিনটাকার নৌকার দিকে উড়ে আসছে। ঝকটা এখন নিচু হচ্ছে। যাইহোক, তারা খুব দ্রুত যাচ্ছিল। তাদের ফলার মত ডানাগুলো বাতাসে শিষ দিল।
অন্য নৌকার শিকারীকে নেফার গণনাই করে নি। ঐ উচ্চতায় ও গতিতে কারো পক্ষে লক্ষ্য স্থির করা কঠিন তবে একজন দক্ষ ধনুকধারী ছাড়া। খুব দ্রুত ক্রমান্বয়ে দুইটা তীর বিস্তৃত হওয়া হাঁসগুলোর উদ্দেশ্যে উঠে গেল। দুটি আঘাতের আওয়াজ হ্রদের চারদিকে পরিষ্কারভাবে বয়ে গেল। দুটি পাখি অদ্ভুত নির্জীবভাবে পতিত হচ্ছিল। ডানাগুলো ঢিলা ও মাথাটা অসহায়ভাবে তারা নড়াচড়া করছিল। তীর পাখি দুটোকে নিশ্চিত বধ করেছে। ওগুলো টুপ করে পানিতে পড়ল ও স্থিরভাবে সেখানেই ভেসে রইল। সাঁতারুরা সহজেই ওগুলো তুলে নিল ও মিনটাকার নৌকার দিকে সাঁতরে ফিরে এল। তাদের দাঁতে শিকার ধরা ছিল।
দুইটি সৌভাগ্যজনক তীর, নেফার তার মতামত দিল। নৌকার অগ্রভাগে বসে টাইটা তার সাথে যোগ করল কোন হাসি না দিয়ে, দুইটি অভাগা হাঁস।
এখন আকাশ পাখিতে পূণ। সূর্যের প্রথম রশ্মি পানিতে পড়তেই সেগুলো কালো মেঘের মধ্যে উঠল। ঝকটা এতো ঘন ছিল যে দূর থেকে ওটাকে মনে হচ্ছিল যেন জলজ উদ্ভিদের চাঁদোয়া ধিক ধিক করে জ্বলছে ও কালো ধোঁয়ার মেঘ সৃষ্টি করছে। নেফার বিশটি হালকা জাহাজ ও সমপরিমাণ নৌকাকে হাহোর মন্দিরের তিন মাইল পর্যন্ত খোলা পানি পর্যবেক্ষণ করতে এবং যে কোন জলজ পাখিকে ধরতে আদেশ দিয়েছে। শুধুমাত্র বার রকমের হাঁস ও রাজ হাঁসই নয় আইবিস, বক এবং সারসও উড়ছিল। প্রতিটি পর্যায়ে মাথার অনেক উপর থেকে আন্দোলনরত প্যাপিরাসে অগ্রভাগ পর্যন্ত তারা কালো দলে ঘুরছে অথবা ভি আকৃতিতে নিচের দিকে ডানা ঝাঁপটিয়ে দ্রুত নামছে। তারা চিৎকার ও চেঁচামিচি, ডাকাডাকি ও আর্তনাদ করছিল।
যখন মিনটাকার দাসী মেয়েরা তাকে আরো ভালো করার জন্য উৎসাহ দিল, বেসুরে ধ্বনিগুলোও মিষ্টি হাসি ও মেয়েলি উল্লাস মনে হল।
কাজটির জন্য তার হালকা ধনুকটা মানানসই হয়েছে। কোন শক্তি নষ্ট না করেই এটা দ্রুত নিশানা লাগতে উপযুক্ত। প্রথাগত ভোতা আগওয়ালা তীর সে ব্যবহার করছে না। কিন্তু তার পরিবর্তে সে গ্রিপ্পার বিখ্যাত তীর যা তার জন্যে তৈরি করা হয়েছে সেগুলো ব্যবহার করছে। সূঁচের অংশ ঘনপালকের ভিতর দিয়ে চলে যায় এবং সরাসরি হাড়ে আঘাত করে। কোন কথা না বলেই সে বুঝেছে নেফার শিকারের প্রতিযোগিতা করতে ইচ্ছুক এবং সে প্রমাণ করেছে যে তার শিকারী প্রবণতা তার মতই হিংস্র। তার প্রথম ব্যর্থতা ও ধনুকের উপর মিনটাকার অপ্রত্যাশিত দক্ষতায় নেফারের নাভিশ্বাস উঠে গেল। নিজের কাজে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে অন্য নৌকায় কি হচ্ছে তার দিকেই তার মনোযোগ বেশি। সবসময় সে ওদিকে এমনভাবে তাকাল যেন আকাশ থেকে মৃত পাখিগুলো পড়ছে। এটা তাকে আরো হতম্ভ করল। বাছ-বিচারের জ্ঞান যেন তাকে ছেড়ে চলে গেছে এবং সে লাঠি খুব তাড়াতাড়ি অথবা দেরিতে ছুঁড়তে লাগল। সান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টায় সে টানটান হল ও তার বাহু ঝাঁকাতে লাগল পুরো শরীরের পরিবর্তে। তার ডান হাত দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ল। অতি সাধারণভাবেই যে তার নিক্ষিপ্ত বাহুর চাপ কমাল এবং তার কনুই বাঁকাল, ফলে প্রায় কব্জি মচকেই গেল।
