হঠাৎ তার সামনে গেবেল ওয়াদুন এর প্রশস্ত পাথুরে নদী খাত উন্মোচিত হল এবং ফারাও ট্যামোস তার দলবল নিয়ে এগিয়ে চললেন। নদী খাতটি মসৃণ রাস্তা যা তাদের নদীর একটা সমতল পাললিক ভূমিতে নিয়ে গেল। ফারাও ঘোড়ার নাগাল টেনে বর্শা বাহকের দিকে তা ছুঁড়ে দিয়ে নিচে নামলেন। শক্ত হয়ে যাওয়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যথায় টনটন করছে। পিছনে না ঘুরেই শুনতে পেল নাজার রথ আসছে। হালকা শব্দে রথ থামল। ক্ষীণ কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে নাজা তার পাশে এসে দাঁড়াল। এখান থেকে আমাদের বিপদ আরো শক্তিশালী হচ্ছে, নাজা বলল। ঐ দিকে দেখুন, ফারাও এর কাঁধের উপর দিয়ে সে তার লম্বা পেশীবহুল হাত দিয়ে নির্দেশ করল। নদীখাত যেখানে গিয়ে সমতলে মিশেছে তার নিচে একটা আলো দেখা গেল, তেলের বাতির হালকা হলুদ একটা আভা। ওটা আল ওয়াদুন গ্রাম। ঐখানে আমাদের গুপ্তচরেরা আমাদের অপেক্ষায় আছে। তারা আমাদের হিকস্দের সীমানায় নিয়ে যাবে। সব নিরাপদ কিনা দেখতে আমি এগোচ্ছি। মহামান্য, আপনি কি এখানেই অপেক্ষা করবেন এবং আমি সরাসরি এখানেই ফিরব।
আমিও তোমার সাথে যাব।
ক্ষমা চাচ্ছি। সেখানে বিশ্বাসঘাতকেরা থাকতে পারে, মেম। সে রাজার ছোটবেলার নাম ধরে বলল। আপনি মিশর এবং কোন ঝুঁকি নেওয়া পক্ষে একটু বেশিই মূল্যবান।
ফারাও তার প্রিয় বন্ধুর দিকে ঘুরে তাকালেন, সরু ও সুন্দর। হাসতেই তারার আলোয় নাজার শুভ্র দাঁতগুলো চমকালো এবং ফারাও তার কাঁধে আলতো করে হাত রাখলেন, বিশ্বস্ততা ও স্নেহার্দ্রতার প্রতিফলন স্বরূপ। তাড়াতাড়ি যাও এবং দ্রুত ফিরে এসো। তিনি সম্মতি দিলেন।
নাজা আনুগত্যের নিদর্শন স্বরূপ বুকে হাত রাখল এবং রথের কাছে দৌড়ে গেল। তারপর রাজার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে রাজাকে সালাম জানাল। ট্যামোসও হাসিমুখে অভিবাদন ফিরিয়ে দিলেন এবং দেখলেন সে নদীখাতের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। নদীর শক্ত বালি ভূমির উপর পৌঁছেই নাজা ঘোড়াগুলোর পিঠে চাবুক চালালো এবং তার রথ দ্রুত আল-ওয়াদুন গ্রামের দিকে ছুটল। নদীরখাতের প্রথম বাকের আড়ালে অদৃশ্য হওয়ার পূর্বে রথটি রূপালি বালির উপর গভীর দাগ এঁকে চলল। রথটা অদৃশ্য হতেই ফারাও অপেক্ষারত তার রথ সারির নিকট গিয়ে সৈন্যদের সাথে শান্ত স্বরে কথা বলতে লাগলেন, কারো কারো নাম ধরে ডাকলেন, হাসি-তামাশা করলেন, তাদেরকে উজ্জীবিত করলেন ও সাহস দিলেন।
তারা তাকে ভালোবাসে এবং সেখানেই তারা যেতে প্রস্তুত যেখানে সে তাদের নিয়ে যাবে।
*
নদী তটের দক্ষিণ তীর ধরে নাজা যযাদ্ধার মতো এগিয়ে চলল। প্রতি পদক্ষেপে সে পাহাড়ের চূড়ার দিকে তাকাচ্ছিল, যতক্ষণ না সে বাঁকানো পাথরের চূড়াটার দেখা পেল যা আকাশের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটা সন্তুষ্টির শব্দ তার গলা থেকে বের হল। আর একটু এগিয়ে সে এমন একটা জায়গায় পৌঁছুল যেখানটায় নদীখাতের বাঁ দিক দিয়ে একটা হালকা পায়ে হাঁটা পথ বেরিয়ে পুরাতন একটা পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের দিকে বেঁকে চলে গেছে। বর্শা বাহককে একটা ধমক দিয়ে থামতে বলে সে রথের পাদানি থেকে নেমে দাঁড়াল এবং বাঁকানো ধনুকটা তার কাঁধে ঠিক করে নিল। তারপর রথের সাথে ঝোলানো মাটির প্রদীপটা তুলে নিয়ে চলতে লাগল। রাস্তাটা এতোই গোলক ধাঁধায় পূর্ণ যে যদি সমস্ত বাঁক ও গলি তার আগেই মুখস্থ না থাকত তবে মিনারে পৌঁছানোর আগে অন্তত ডজন খানেকবার সে রাস্তা হারাত।
অবশেষে সে ওয়াচটাওয়ারের সবচেয়ে উঁচু স্থানটায় এসে পৌঁছল। এটি অনেক শতাব্দী আগে নির্মাণ করা হয়েছিল এবং এখন প্রায় ধ্বংস হবার উপক্রম। সে কিনারে গেল না কারণ ওপাশে পর্বতের শূন্যে খাড়া গর্ত রয়েছে। দেয়ালের ফাঁকে যেখানে সে এক আঁটি লাঠি লুকিয়ে রেখেছিল তা খুঁজে বের করল। সেগুলো দিয়ে সে দ্রুত একটা ছোট পিরামিড তৈরি করে ফেলল। তারপর মাটির প্রদীপ থেকে কাঠ কয়লা দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে তার মধ্যে কিছু শুকনো ঘাস ফেলে দিল। ফলে আগুন খুব উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠল এবং সে একটা আলোর সংকেত পাঠাল। নিজেকে না লুকিয়ে সে এমন একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল যাতে নিচ থেকে কেউ আর আলোকিত চেহারাটা এবং টাওয়ারের উপরাংশ দেখতে পায়। একসময় লাকড়ি পুড়ে শেষ হয়ে আগুনের শিখা নিভে গেল। অগ্যতা নাজা অন্ধকারে বসে অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর নিচের পাথুরে পথে নুড়ি গড়ানোর আওয়াজ সে শুনল। সাথে সাথে সে একটা স্পষ্ট-তীক্ষ শীষ বাজাল। কেউ তার সংকেতের প্রতি-উত্তর দিল এবং সে উঠে দাঁড়াল। সে তার ব্রোঞ্জের তৈরি বাঁকানো তলোয়ারটা খাপ থেকে একটু বের করে রাখল এবং একটা তীর ধনুকের বানে প্রস্তুত রাখল যাতে তৎক্ষণাৎ সে তা ছুঁড়তে পারে। অল্পক্ষণ পরেই হিকস্ ভাষায় একটা কর্কশ কণ্ঠ তাকে ডাকল। সে খুব দ্রুত ও স্বাভাবিকভাবে একই ভাষায় জবাব দিল এবং কমপক্ষে দুজন লোকের পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল।
এমনকি ফারাও জানেন না যে নাজার মা হিকস্ ছিল। সময়ের সাথে দখলদাররা মিশরের অনেক কিছুই গ্রহণ করেছে। তাদের নিজেদের মাঝে স্ত্রী লোকের সংখ্যা কম থাকায় অনেক হিকস্ই মিশরীয় স্ত্রী গ্রহণ করেছে এবং এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মে রক্তের ধারা সংরক্ষিত হয়েছে।
