ফারাও নেফার সেটি তার দিকে এমন গভীরভাবে তাকিয়েছিল যে সে তার শ্বাস প্রশ্বাস পর্যন্ত ধরতে পারল। তার চোখগুলো এতোটাই সবুজ যে প্রথম দর্শনেই তা তাকে আকর্ষণ করল এবং চোখ সরিয়ে নিতে গিয়েও সে তা পারল না। তার পরিবর্তে সে লজ্জা পেতে শুরু করল। সাদা মুকুটের নিচে এবং চিবুকে আঁকা নকল দাড়ি নিয়ে নেফার সেটি এমন মর্যাদাপূর্ণ ও স্বর্গীয়ভাবে তাকালো যে সে হত বিহ্বল হয়ে পড়ল। তখন হঠাৎ ফারাও তাকে একটা উষ্ণ ও অর্থপূর্ণ হাসি দিল। তৎক্ষণাৎ তার চেহারা বালক সুলভ ও আবেদনময় হল এবং অকারণেই তার নিঃশ্বাস দ্রুত হল ও সে আরো বেশি লজ্জা পেল। খুব চেষ্টা করে সে তার চোখ সরাল এবং গভীর মনোযোগ দিয়ে হাথোর দেবীর গভীর মূর্তি দেখতে লাগল।
নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনতে তার কিছুটা সময় লাগল এবং এরই মধ্যে লর্ড নাজা উচ্চ রাজ্যের রাজ-প্রতিভূ কথা বললেন। পরিমিত কণ্ঠে সে অ্যাপেপিকে অভিনন্দন জানাল, কূটনৈতিকভাবে তাকে হিকস্ রাজা বলে সম্বোধন করলেন। কিন্তু মিশরের রাজ্যে তার দাবির বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন। মিনটাকা একাগ্র চিত্তে তার ঠোঁট দেখল কিন্তু নেফারের দৃষ্টি যে তার উপর নিবন্ধিত সে ব্যাপারে সজাগ ছিল এবং তার দিকে না তাকানোর প্রতিজ্ঞা করল।
লর্ড নাজার কণ্ঠ ছিল মনোরম ও একঘেয়েমিময় এবং শেষ পর্যন্ত সে আর মনোযোগ ধরে রাখতে পারল না। সে চুরি করে চোখের কোণা দিয়ে দ্রুত একবার নেফারের দিকে তাকাল, ইচ্ছা ছিল সাথে সাথেই অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে নেবে। কিন্তু তার চোখ তার উপর স্থির রইল। নীরব হাসিতে তারা জ্বলজ্বল করছিল ও তাকে মুগ্ধ করল। তার স্বভাব শান্ত নয় কিন্তু এখন তার হাসি ছিল লাজুক ও দ্বিধান্বিত এবং সে অনুভব করল তার চেহারা আবার গোলাপি হয়ে যাচ্ছে। সে চোখ নামিয়ে কোলের উপর রাখা তার হাতের দিকে তাকাল। আঙ্গুলগুলো একসাথে মোচড়ালো যতক্ষণ না সে স্থির হল এবং নিজেকে থামাল। সে হাত স্থির রাখল কিন্তু তার শান্তি নষ্ট করায় সে নেফারের প্রতি রাগ হল। সে-ই একমাত্র মিশরীয় ফুলবাবু। আমার ভাইদের যে কেউ তার চাইতে বেশি পৌরুষপূর্ণ ব্যক্তি এবং তার চেয়ে দ্বিগুণ সুন্দর। এরকম অসভ্যভাবে আমার দিকে তাকিয়ে সে আমাকে শুধু বোকা বানানোর চেষ্টা করছে। আমি আর তার দিকে তাকাবো না। আমি পুরোপুরি তাকে এড়িয়ে যাব। সে সিদ্ধান্ত নিল এবং তার সিদ্ধান্ত বজায় থাকল যতোক্ষণ না লর্ড নাজা তার কথা বন্ধ করল এবং তার পিতা তাকে উত্তর দিতে লাগল।
সে তার পুরু কালো পাপড়ির নিচ দিয়ে আরেকবার নেফারকে দেখে নিল। সে তার পিতার দিকে তাকিয়ে ছিল কিন্তু যখনই তার দৃষ্টি তার মুখের উপর পড়ল তার চোখ তার দিকে ঘুরে গেল। সে তার অভিব্যক্তি রাগান্বিত ও কঠোর করার চেষ্টা করল। কিন্তু যখন সে হাসল তার ঠোঁটগুলো করুণায় স্পন্দিত হল। সে প্রকৃতই আমার কয়জন ভাইদের মত সুন্দর, সে স্বীকার করল, তারপর দ্রুত আরেকবার দেখে নিল। অথবা তাদের যে কারো মত। সে তার কোলের দিকে ফিরে তাকাল ও এ ব্যাপারে ভাবল। তারপর আরো একবার তা নিশ্চিত করার জন্য চুপিচুপি তাকাল। সম্ভবত তাদের যে কারো থেকে সুন্দর, এমনকি রুগার থেকেও। সঙ্গে সঙ্গেই সে অনুভব করল যে তার সবচাইতে বড় ভাইকে প্রতারণা করছে এবং তার মতামত পরিমার্জন করল, অবশ্যই ভিন্নভাবে।
সে পাশে থাকা রুগার দিকে তাকাল। ফিতাসহ দাড়ি ও কালো তে সে একজন পুরোপুরি যোদ্ধা। রুগা একজন সুদর্শন পুরুষ, সে আনুগত্যের সাথে ভাবল।।
বিপরীত সারি থেকে মনে হল না যে তাকে টাইটা দেখছে কিন্তু সে নেফার ও মিনটাকার মধ্যে লুকানো আদান প্রদানের একটি সূক্ষ্ম তারতম্যও ধরতে ব্যর্থ হয়নি। বরং সে এর চাইতে বেশি কিছু দেখল। লর্ড টর্ক, নাজার ভাই অ্যাপেপির সিংহাসনের পিছনে খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে মিনটাকার বাহু ঘেঁষে। তার বাহু তার বুকের উপর ভাজ করা এবং সে চিত্র খচিত খাঁটি স্বর্ণের মনিবন্ধ পড়ে আছে। এক দিকের কাঁধে ভারি ও বাঁকানো ধনুক এবং অন্য কাঁধে স্বর্ণের পাতে ঢাকা তীরের খাপ ঝোলানো। গলায় সে শৌর্য ও বীর্যের স্বর্ণের চেইন পরে আছে। হিক মিশরীয় মিলিটারি সম্মান ও সাজসজ্জা গ্রহণ করেছে সেই সাথে তাদের বিশ্বাস ও রীতিনীতি। টর্ক হিক রাজকন্যাকে গভীর অভিব্যক্তি নিয়ে দেখছিল।
আবারও নেফার ও মিনটাকার মধ্যে সংক্ষিপ্ত দৃষ্টি বিনিময় হল যা টর্ক তার কালো, বিমর্ষ দৃষ্টি নিয়ে দেখল। টাইটা তার রাগ ও হিংসা বুঝতে পারল। যেন খামসিনের গরম ও অসহনীয় মেঘ, সাহারার ভয়ংকর বালি ঝড় মরুর দিগন্তে সৃষ্টি হচ্ছে। আমি পূর্বে এটা দেখিনি। টর্ক কি মিনটাকাকে সত্যি ভালোবাসে নাকি রাজনৈতিক কোন কারণ এর পেছনে আছে? সে বোঝার চেষ্টা করল। তার প্রতি কি তার সত্যি আকর্ষণ আছে নাকি তাকে সে ক্ষমতায় আরোহনের সিঁড়ি মনে করে? প্রতিটি অবস্থান থেকেই এটা বিপদজনক এবং অন্য বিষয়সমূহও আমাদের হিসেবে রাখতে হবে।
অভিবাদন পর্ব শেষ হল এবং তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছুই বলা হয়নিঃ যুদ্ধ বিরতির আলোচনা পরের দিন গোপন সময়ে শুরু হবে। উভয় পক্ষ তাদের সিংহাসন থেকে উঠল ও মাথা নত করে সম্মান জানাল ও স্যালুট দিল এবং তাদের উঠার সময় ঘণ্টা ও বাঁশি বাজল।
