প্রথমে তারা শব যানগুলো অতিক্রম করে এল এবং টাইটার চারপাশের লোকগুলো নিজেদের আলখেল্লা দিয়ে তাদের তাদের মুখ ও নাক অশুভ দুর্গন্ধ থেকে বাঁচাতে ঢাকল। যা নগ্ন, অর্ধশুকনো মৃতদেহগুলো থেকে আসছিল, যা গাড়ির পিছনে উঁচু করে স্তূপ করা। দুর্গন্ধ থেকে তাড়াতাড়ি বাঁচার জন্য টর্ক পা দেপে ঘোড়াকে তাড়া দিল। কিন্তু সামনে এমন আরো অনেকগুলো লাশ ভর্তি যান ছিল যা তাদের রাস্তা প্রায় বন্ধ করে দিল।
তারা আরো পোড়ানোর জায়গা অতিক্রম করে এল যেখানে গাড়িগুলো থেকে ভয়াবহ বোঝাগুলো সব নামানো হচ্ছিল। লাকড়ি এই এলাকায় পাওয়া দুর্লভ এবং আগুনের শিখা শবদেহগুলোকে পোড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। তারা পপত্ শব্দ করছিল ও শিখাগুলো ঝিরঝির করে কাঁপছিল। আর ক্ষয় হওয়া মাংস থেকে চর্বি ফোঁটায় ফোঁটায় বের হয়ে তৈলাক্ত কালো ধোয়ার সৃষ্টি করল, যা সেখানে থাকা জীবন্ত মানুষদের মুখ ও গলা ঢেকে দিল।
কত জন প্লেগে মারা গেছে? টাইটা অবাক হল। এবং কত জন আবার আমাদের সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করে?
প্লেগ ভয়ানক অপচ্ছায়ার মতো যে কোন আর্মি দলে হানা দিতে পারে। অ্যাপেপি এখানে বুবাসতিতে অনেক বছর ধরে ক্যাম্প করে আছে যা ইঁদুর, শকুন ও শবখাদক আর বড় বড় সারসে ভর্তি। তার লোকেরা নিজেদের বর্জ্যের মধ্যে একত্রিত হয়ে বাস করছে। তাদের দেহে মাছি ও উকুন হাঁটছে, পচা খাবার খাচ্ছে ও সেচের খালের পানি পান করছে যেখান দিয়ে ময়লা আবর্জনা ও গোবরের স্তূপ বয়ে চলে। এই রকম পরিবেশেই প্লেগ দ্রুত ছড়ায়।
বুবাসতির কাছাকাছি ক্যাম্পে লোকজনের সংখ্যা আরে বেশি। দুর্গ নগরীর দেওয়াল ঘেঁষে তাঁবু, কুঁড়ে ও জীর্ণ কুটিসমূহ দাঁড়িয়ে এমনকি গর্তগুলো পর্যন্ত ঘিরে লোকজন বাস করছে। প্লেগ রোগীদের মধ্যে যারা একটু বেশি ভাগ্যবান তারা ছিন্ন পামের ডালের নিচে শুয়ে সকালের গরম সূর্য থেকে বাঁচার কোন রকম চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যরা পায়ে দলা কর্দম ভূমিতে শুয়ে আছে। ক্ষুধায় ও তৃষ্ণায় কাতর। মৃত ও মৃত প্রায় সব এক সাথে মিশে গেছে। যারা যুদ্ধে আহত ও যাদের কলেরা–হয়েছে তারাও একসাথে রয়েছে।
যদিও তার স্বভাব ছিল চিকিৎসা করার তবুও টাইটা তাদের কোন সাহায্য করল না। তারা নিজের দ্বারাই দোষী। তাই একজন কিভাবে এতোগুলো লোককে সাহায্য করবে? তার চাইতে বড় কথা, তারা এই মিশরের শত্রু এবং এটা পরিষ্কার যে এই মহামারী প্রভুর পক্ষ থেকে একটা অভিশাপ। তাছাড়া একজন হিকস্কে চিকিৎসা করার অর্থ হল থেবসে বিরুদ্ধে যাওয়ার জন্য আরো একজনকে প্রস্তুত করা এবং যারা তার প্রিয় শহরে আগুন দিবে ও লুটপাট করবে।
তারা সুরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করল এবং দেখল এর ভেতরের অবস্থাও তেমন ভালো না। প্লেগ রোগীরা সেখানে পড়ে আছে, রোগে তারা মারা গেছে এবং ইঁদুর ও বেওয়ারিশ কুকুরগুলো সে মৃতদেহ খাচ্ছে এবং এমনকি যারা এখনও জীবিত আছে তাদেরও আত্মরক্ষার শক্তি নেই।
অ্যাপেপির প্রধান কার্যালয় হল বুবাসতির প্রধান ভবন। একটা ভারি কাদার ইটের এবং শুকনো খড়ের প্রসাদ যা শহরের মধ্যখানে অবস্থিত। সহিস তাদের ঘোড়াগুলো প্রধান ফটকে নিয়ে গেল কিন্তু লর্ড টর্ক টাইটাকে উঠান দিয়ে অন্ধকার হলরুমে নিয়ে গেল যেখানে ধূপ ও চন্দন কাঠ একটা ব্রোঞ্জের পাত্রে প্লেগের দুর্গন্ধ লুকানোর জন্য পুড়ানো হচ্ছে যা শহর ও চারপাশের ক্যাম্পবাসীদের কাছ থেকে আসছিল। কিন্তু আগুনের কাঁপা কাঁপা শিখা গরম বাতাসকে অসহনীয় করে তুলেছে। এমনকি এখানেও এই প্রধান কার্যালয়ে প্লেগ রোগীর গোঙানির আওয়াজ রহস্যজনকভাবে বাজছে এবং অন্ধকার কোনে জড়াজড়ি করে তা পড়ে আছে। ভবনের গভীর গোপন স্থানের শক্ত ব্রোঞ্জের দরজার সামনে সেন্ট্রিরা তাদের থামিয়ে দিল। কিন্তু যখনই তারা টর্কের বিশাল দেহ চিনতে পারল তারা একপাশে সরে দাঁড়াল এবং তাদের যেতে দিল। এটা অ্যাপেপির ব্যক্তিগত এলাকা। দেয়ালে চমৎকার সব কার্পেট ঝুলানো এবং আসবাবপত্র দামী কাঠ, আইভরি ও মুক্তার তৈরি যার বেশির ভাগ মিশরের প্রসাদ ও মন্দির থেকে লুট করে আনা।
টর্ক টাইটাকে একটা ছোট কিন্তু বিলাস বহুল উপকক্ষে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল এবং তাকে সেখানে রেখে গেল। দাসীরা তাকে একজগ শরবত ও পাকা খেজুর ও ডালিম দিয়ে গেল। সে একচুমুক পানীয় খেল কিন্তু ফল খেল অল্প। সে সর্বদা মিতহারী।
তাকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। সময়ের বহতা দেখিয়ে সূর্যরশ্মি একটা উঁচু ও একমাত্র জানালা দিয়ে প্রসন্নভাবে একপাশ থেকে অন্যপাশে চলে এল। একটা কার্পেটের উপর শুয়ে সে তার স্যাডল ব্যাগটা বালিশের মত ব্যবহার করল, ঝিমালো কিন্তু কখনই গভীর ঘুমাচ্ছন্ন হল না এবং প্রতিটি শব্দে জেগে উঠছিল। এরই মাঝে সে শুনল দূরে মহিলারা কাঁদছে এবং ভারি দেয়ালের ওপাশে কোথাও শোকার্তনাদ বাজছিল।
অবশেষে বাইরে ভারি পায়ের আওয়াজ হল এবং দরজার পর্দা সরে গেল। একটা বিশালকায় দেহ দরজায় এসে দাঁড়ালো। সে শুধু একটা লাল স্কাট পড়ে আছে যা তার বৃহৎ পেটের নিচে স্বর্ণের চেইন দ্বারা আটকানো। তার বুক ধূসর তারের মত কোকড়ানো পশমে ঢাকা, ভালুকের চামড়ার ন্যায় ভারি। পায়ে ভারি স্যান্ডেল পরা ও হাঁটুর শূন্যে শক্ত পালিশ চামড়ার বর্ম পরা। কিন্তু সে কোন তলোয়ার বা অন্য কোন অস্ত্র বহন করছিল না। তার বাহু ও পা-গুলো মন্দিরের পিলারের ন্যায় ভারি এবং যুদ্ধে আহত দাগে ঢাকা যা অনেক আগে শুকিয়ে সাদা ও সিঙ্কি হয়ে আছে। অন্যগুলো আবার কিছুদিন আগের যা লাল ও হা করে আছে। তার দাড়ি ও ঘর্মাক্ত চুলগুলোও ধূসর বর্ণের কিন্তু কোন গতানুগতিক নিয়মে ফিতা বাধা নেই। ওগুলো তেল দেয়া বা আচড়ানো না, এলোমেলো। তার কালো চোখগুলো বন্য ও বিহ্বল এবং বৃহৎ বাকা নাকের নিচে ভারি ঠোঁট দুটো যেন ব্যথায় মুচড়ে আছে।
