আবার নিরবতা নেমে এল যতোক্ষণ না হঠাৎ করে মশালের আলো ছাদ পর্যন্ত উঁচু হয়ে ঠেকল এবং হলুদ থেকে ভয়ংকর সবুজ এবং বেগুনি, লাল ও নীল রং ধারণ করল। ওগুলো থেকে অনেক ধূয়া বের হচ্ছিল এবং কক্ষটি ভরে গেল। নাজার দম বন্ধ হয়ে হল এবং কাশতে লাগল। তার মনে হল তার নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসছে ও সে জ্ঞান হারাচ্ছে। মাথার মধ্যে সে নিজের শ্বাসের আওয়াজ অনুভব করল।
টাইটা ধীরে ঘুরে তার সামনে এসে দাঁড়াল এবং নাজা তাকে দেখে ভয়ে কেঁপে উঠল, কারণ টাইটা পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তার চেহারা সবুজ উজ্জ্বল বর্ণ ধারণ করেছে, ঠিক অশিরিশের ন্যায়। তার খোলা মুখ দিয়ে সবুজ রঙের ফেনা বের হয়ে বুকে বেয়ে পড়ছে ও তার চোখ থেকে রূপালি আলোর ঝলকানি মশালের আলোর উপর ঝিলিক তুলল। পা না নাড়িয়ে নাজা যেখানে বসে আছে সেখানে সে এল। এবং মুখ দিয়ে শয়তান ও জিনদের ন্যায় আওয়াজ করল। একটা চিৎকার কোকানো, হিস্ হিস্ করে গোঙানি ও পাগলের মতো হাসির আওয়াজ।
লর্ড নাজা উঠার চেষ্টা করল কিন্তু আওয়াজ ও ধূয়ায় তার খুলি ভরে গেল এবং অন্ধকার তাকে ছেয়ে ধরল। তার পা ভারি হয়ে এল, পায়ের নিচে সে মাটি খুঁজে পেল না এবং অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল।
*
মিশরের রাজ-প্রতিভূর যখন জ্ঞান ফিরল ততোক্ষণে সূর্য অনেক উপরে উঠে গেছে, নদীর পানিতে তার ঝলকানি চমকাচ্ছিল। সে নিজেকে তার রাজকীয় নৌকায় সিল্কের মাদুরে শায়িত অবস্থায় খুঁজে পেল। চারপাশে সে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকাল এবং নৌকার সাদা পালটা চোখের সামনে দেখল যা সবুজের উপর সাদা পাখির ন্যায় ছড়িয়ে আছে। তার খুব তৃষ্ণা পেল, অনুভব করল জিহ্বা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে এবং মনে হল মাথার খুলির ভেতর তার দেখা সব শয়তানেরা ফাঁদ-বন্দী হয়ে আছে। সে ফুঁপিয়ে উঠে কাঁপতে লাগল এবং বালতির মধ্যে বমি করল যা, একজন ভৃত্য তার সামনে ধরে ছিল।
টাইটা তার পাশে এসে দাঁড়াল। নাজার মাথাটা তুলে কোন এক অলৌকিক পানীয় পান করাল যা তার মাথার ব্যাথা, জ্বালা ঠাণ্ডা করে দিল এবং তার পেটে জমে থাকা গ্যাস বের করে দিল। তারপর কথা বলার মতো শক্তি পেতেই সে ফিসফিসিয়ে টাইটাকে জিজ্ঞেস করে বলল, আমাকে বল, টাইটা; সব কিছু। আমার কিছুই মনে নেই। ধাঁধায় কি পেলে?
উত্তর দেওয়ার পূর্বে টাইটা সব নাবিক ও দাসদের বাইরে বের করে দিল। তারপর সে তার বিছানার পাশে হাঁটুগেড়ে বসল। নাজা কাঁপা কাঁপা একটা হাত তার বাহুতে রাখল এবং করুনভাবে ফিসৃফিস্ করে বলল, আমার পরের কোন কিছুই মনে নেই… গত রাতের ভয়ংকর ঘটনা তার মনে পড়তেই সে ইতস্তত: বোধ করল ও কেঁপে উঠল।
আমরা প্রায় সেবেননিটোস পৌঁছে গেছি, মহামান্য, টাইটা তাকে বলল। রাত নামার আগেই আমরা থেব পৌঁছে যাব।
কি হয়েছে, টাইটা? সে টাইটার কাঁধ ঝাঁকাল। ধাঁধায় কি দেখলে?
বিস্ময়কর, মহামান্য? টাইটার কণ্ঠটা আবেগে কেঁপে উঠল।
বিস্ময়কর? নাজার আকর্ষণ বাড়ল এবং সে উঠে বাসার চেষ্টা করল। কেন তুমি আমাকে মহামান্য বলছ? আমি ফারাও নই।
যা প্রকাশিত হয়েছে এটা তারই অংশ।
আমাকে বল! আমাকে সব খুলে বল!
আপনার কি মনে আছে কি ভাবে মন্দিরের ছাদ পদ্ম পাপড়ির ন্যায় খুলে গিয়েছিল এবং রাতের আকাশ থেকে বিশাল পথ আমাদের দিকে নেমে এল?
নাজা তার মাথা নাড়াল এবং অনিশ্চিতভাবে সম্মতি সূচক ঝাঁকাল। হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়েছিল। পথটায় উঠার জন্যে স্বর্ণের সিঁড়ি ছিল।
আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে। টাইটা আরো জোর দিল। আমরা স্বর্ণের সিঁড়িতে চড়লাম। নাজা নিশ্চিত হতে তার দিকে তাকাল।
দুই ডানারওয়ালা সিংহের পিঠে চড়ে আমরা উপরে উঠে গেলাম। টাইটা মাথা নাড়ল।
হ্যাঁ, সিংহটার কথা আমার মনে আছে, কিন্তু তারপর আর কিছুই মনে নেই।
এই রহস্যগুলো মনকে অবশ ও চোখকে ঝাপসা করে দেয় যা সহ্য করার ক্ষমতা মানুষের নেই। এমনকি আমিও যার কিনা সপ্তম ও শেষ শক্তি আছে অবাক হয়েছিলাম যা দেখলাম। টাইটা আন্তরিকভাবে ব্যাখ্যা করল। কিন্তু হতাশ হবেন না, কারণ প্রভু আমাকে আপনার কাছে তা ব্যাখ্যা করার আদেশ দিয়েছেন।
বল, যাদুকর! কোন কিছু বাদ দিও না।
সিংহের পিঠে চড়ে আমরা কালো সমুদ্র ও সাদা পর্বত অতিক্রম করলাম। আসমান ও জমিনের সব রাজ্য আমাদের নিচে রয়ে গেল।
নাজা আগ্রহ ভরে মাথা নাড়ল, বলে যান।
অবশেষে আমরা প্রভুরা যেখানে বাস করেন সে প্রাসাদে পৌঁছলাম। তার প্রসাদের ভিত্তি পাতাল পর্যন্ত গভীর এবং পিলারগুলো আকাশ ও তারাদের ধরে ছিল। আমরা আমাদের উপরে আগুনের ন্যায় উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময় সিংহাসনে এবং স্বর্গের অন্য প্রভুরা রুপা, সোনা, ক্রিস্টালের সিংহাসনে বসেছিল।
নাজা তার দিকে চোখ পিটপিট করে তাকাল, তার তাকাতে কষ্ট হচ্ছিল। হ্যাঁ, এখন তুমি যা আমাকে বললে তা মনে পড়েছে। নীল কান্ত মণি ও হীরার সিংহাসনে তারা বসেছিল। তারপর প্রভু কথা বললেন? সে দ্বিধান্বিত। তিনি আমার সাথে কথা বললেন, তাই না?
হ্যাঁ, এতো জোরে বললেন যেন পবর্তের উপর থেকে মহান প্রভু অশিরিশ বলছেন: প্রিয় নাজা! তুমি সব সময়ই আমার একনিষ্ঠ ভক্ত। তাই তুমি পুরস্কৃত হবে।
এর অর্থ কি? তিনি কি তা স্পষ্ট করে বলেছেন, টাইটা?
টাইটা শান্তভাবে মাথা নাড়াল, হ্যাঁ, মহামান্য।
