সন্তুষ্ট হয়ে সে হেজারেটকে খুঁজতে গেল। সে তাকে নদীর তীরে তার বীণা নিয়ে বসে থাকা অবস্থায় পেল। টাইটার দিকে সে চেয়ে ছোট একটা কষ্টের হাসি দিল কিন্তু বীণা বাজনো থামালো না। টাইটা তার পাশে উইলো গাছটার শূন্যে ঘাসের উপর বসল। যে সুরটা সে বাজাচ্ছিল তা তার দাদীর প্রিয় একটা সুর। টাইটা এটা তাকে শিখিয়েছে এবং এখন সে গলা ছেড়ে গাইতে লাগল।
আমার হৃদয়টা আজ আহত কোয়েল পাখি যেন।
যখনই তোমার মুখটা আমি দেখি, প্রিয়!
মনটা তখন ভোরের আকাশ হতে চায়
আর তুমি হেসে ওঠতেই
সূর্যালোক বুঝি আঁধার সব তাড়াল।
তার কণ্ঠ মিষ্টি ও আবেগাপ্লুত, এবং টাইটা অনুভব করল সে নিজেও কাঁদছে। যেন সে এখন আবার লসট্রিসের কন্ঠ শুনল। সেও তার সাথে যোগ দিল। তার কণ্ঠ এখনো পরিষ্কার ও জোরালো, এ বয়সে এবং দাঁত নেই তবুও। এই যুগলের সামনে দিয়ে যাওয়া সব নৌকার মাঝিরা তাদের গান শুনে একটু জিরিয়ে নিতে লাগল।
গান শেষে হেজারেট বীণাটা পাশে সরিয়ে তার দিকে ফিরল। প্রিয় টাইটা আমি খুব খুশি যে তুমি এসেছো।
আমি দুঃখিত যে তোমাকে অপেক্ষায় রেখেছি, আমার রাতের চাঁদ। ডাক নামটা শুনে হেজারেট ক্ষীণ একটা হাসি দিল কারণ প্রকৃতির প্রতি সমসময়ই তার একটা রোমান্টিক ভাব ছিল। এখন বলো আমি তোমার জন্যে কি করতে পারি?
তুমি লর্ড নাজার কাছে যাবে এবং আমার হয়ে ক্ষমা চাইবে। আমি তাকে বিয়ে করতে পারবো না।
তার দাদী এ বয়সে যেমন ছিল সেও তেমন। লসট্রিসও অসম্ভব কাজের শুরু দায়িত্ব একই রকম নিশ্চয়তা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে তার উপর চাপিয়ে দিত। হেজারেট তা গভীর নীল সুন্দর চোখ দুটো তার দিকে ফেরাল। তুমি জানো, আমি ম্যারনকে কথা দিয়েছি, আমি তার স্ত্রী হব। ম্যারন হচ্ছে ক্রাতাসের নাতি ও প্রিন্স নেফারের ফুর্তিবাজ সাথী।
টাইটা হেজারেটের দিকে অনুগ্রহ ভরা দৃষ্টিতে তাকাল কিন্তু কখনো বুঝাল না যে সে তার অনুভূতিগুলোকে উজ্জীবিত করলো। হেজারেট, আমি তোমাকে অনেক বার বলেছি যে তুমি অন্য মেয়েদের মতো নও। তুমি রাজকুমারী। তোমার বিয়েটা কোন আবেগের বশবর্তী হয়ে করা ঠিক হবে না। এটা কোন রাজনৈতিক কারণে অন্যরকম হতে পারে।
তুমি বুঝছ না, টাইটা, হেজারেট নরম স্বরে বলল, কিন্তু মিষ্টি দৃঢ়তা নিয়ে। আমি ম্যারনকে ভালোবাসি। আমার ছেলেবেলা থেকে তাকে আমি নিচু। আমি তাকে বিয়ে করতে চাই, লর্ড নাজাকে নয়।
আমি মিশরের রাজ-প্রতিভূর আদেশ খণ্ডাতে পারবো না। সে বোঝানোর চেষ্টা করল। কিন্তু সে তার মাথা নাড়াল ও তার দিকে চেয়ে হাসল।
তুমি অনেক জ্ঞানী টাইটা। আমি জানি তুমি কিছু একটা ভাববে। আর তুমি সব সময়ই তা কর। সে তাকে বলল এবং অনুভব করল আবেগে বুঝি তার হৃদয় ভেঙ্গে যাবে।
*
লর্ড টাইটা, আমি আপনার সাথে ফারাও কিংবা আমার বিবাহের বিষয়ে কোন কথা বলতে ইচ্ছুক নই। এই দুব্যাপারে যা সিদ্ধান্ত নেবার আমিই নেবো। সে বুঝিয়ে দিল যে এ ব্যাপারে আর কোন কথা নয়। নাজা তার সামনে লেখার টেবিলে ছড়ানো স্ক্রৌলটায় মনোযোগ দিল। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হল, এক পাল বন্য হাঁস পূর্ব তীর থেকে উড়াল দিয়ে তাদের ভারি ডানা ঝাঁপটা দিতে দিতে নীলের ধূসর প্রশস্ত পানি পেরোল এবং প্রাসাদের বাগান যেখানে তারা বসে ছিল তার উপর দিয়ে উড়ে গেল। অবশেষে টাইটা আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে যাওয়ার জন্য উঠল। সে রাজ-প্রতিভূতে মাথা ঝুঁকে বিদায় জানাতে উদ্যত হতেই নাজা তার দিকে চোখ তুলে তাকাল। আমি আপনাকে যেতে বলি নি।
আমার লর্ড, আমি ভাবলাম আমাকে আপনার আর প্রয়োজন নেই।
বরং আপনাকেই আমার সবচাইতে বেশি প্রয়োজন। সে এক দৃষ্টিতে টাইটার দিকে চাইল ও ইশারায় তাকে আবার বসতে বলল। আপনি আমার ধৈর্য ও সহ্য পরীক্ষা করছেন। আমি জানি আপনি কখনো ফারাও ট্যামোসের জন্যে আমন-রা অনুশীলন করতে অস্বীকার করেননি। যখনই তিনি বলেছেন তখনই তা করেছেন। তাহলে আমার সাথে কেন এতো ছল-চাতুরী? এই ভূমির রাজ-প্রতিভূ হিসেবে আমি আর কোন দেরি করব না। আমি এ কাজটা শুধু আমার লাভের জন্যে নয় বরং এ জাতির এই উত্তরের যুদ্ধে টিকে থাকার জন্যে করতে চাই। প্রভুদের দিক নির্দেশনা আমার দরকার। আর আপনিই একমাত্র ব্যক্তি যে তা আমার জন্যে করতে পারেন।
নাজা এতো আকস্মিকভাবে উঠে দাঁড়াল যে তার সামনের টেবিলে উল্টে গেল এবং প্যাপিরাসের স্ক্রৌলটা পিছলে পড়ে গেল। সেদিকে সে কোন নজর দিল না, বরং চিৎকার করে উঠল, আমি আপনাকে আমার হয়ে আমান-রা অনুশীলনের আদেশ দিচ্ছি।
টাইটা নাটকীয় ভঙ্গিমায় মাথা নিচু করল। পিছনের কয়েক সপ্তাহ ধরেই সে এই আল্টিমেটামের জন্য প্রস্তুত ছিল। এবং নেফার যাতে নিরাপদ থাকে তাই সে তাকে দেরি করাল। তার বিশ্বাস যতক্ষণ না সে ধাঁধার রহস্য তাকে বলবে তততক্ষণ লর্ড নাজা নেফারের বড় কোন ক্ষতি করবে না।
ধাঁধার জন্যে পূর্ণিমা সবচাইতে উত্তম সময়। টাইটা তাকে বলল। আমি ইতোমধ্যে আয়োজন শুরু করেছি।
নাজা তার টুলে বসল। আপনি এটা এখানে আমার কোয়ার্টারে করবেন। সে বলল।
না, লর্ড রাজ-প্রতিভূ, ওটা ঠিক হবে না। টাইটা জানে যদি নাজাকে সে বসে রাখতে চায় তাহলে তাকে অশান্ত রাখতে হবে। প্রভুদের যতো বেশি নিকটে থাকা যায় ভষ্যিত্বণী ততো বেশি নির্ভুল হয়। বসিরিসের অশিরিশ মন্দিরে আমি যাজকদের নিয়ে সব ব্যবস্থা করেছি। ঐ খানটাতেই আমি মধ্যরাতে পূর্ণিমায় ধাঁধা অনুশীলন করব। মন্দিরের ভিতরের অংশে তা অনুশীলন করব। পবিত্র আত্মারা আমাদের সাহায্য করবে। টাইটার কণ্ঠ রহস্যে ভারি হল। সেখানে শুধু আমি এবং আপনি উপস্থিত থাকব। অন্য কোন মানুষ, যা প্রভুরা আপনাকে বলবে তা শুনা ঠিক হবে না। আসমরের একজন প্রহরী শুধু দরজায় পাহারা দিবে।
