তারপর ন্যাট্রোন দ্রবণ থেকে শব দেহকে বের করে এই পাথরের অতিকায় বেদীর উপর রাখা হয়েছে এবং তেল ও হারবাল উপাদান তাতে লাগানো হয়। পেটের খালি অংশটা রঞ্জন ও মোমের শুকানো লিনেন কাপড় দ্বারা পূর্ণ করা হয়। বুকের যেখানে তীরটা আঘাত করেছিল সেই জায়গা সেলাই করা হয়েছে এবং স্বর্ণ ও দামী পাথরের গহনা তার উপর রাখা হয়েছে। ছোট পাথর ও তীরের অগ্রভাগ যা রাজাকে হত্যা করেছে তা মমি-কররা তার দেহ থেকে বের করে নিয়েছে। কাউন্সিলের সদস্যগণ কর্তৃক পরখ করার পর ওটাকে স্বর্ণের বাক্সে সীল করা হয় এবং এটা তার সাথে তার কবরে যাবে যা পরবর্তী জীবনে যাত্রা কালে কোন ব্যাঘাত ঘটানোর সময় শয়তানের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী অস্ত্র হবে।
মমি করার পরবর্তী চল্লিশ দিন শবদেহকে মরুর লু-হাওয়ায় পুরোপুরি শুকানো হবে।
যখন এটা জ্বালানি কাঠের মত শুকিয়ে যাবে তখন তা বাঁধা হবে। লিলেন ব্যান্ডেজ দিয়ে খুব সূক্ষ্ম ও সাবধানের তা পঁাচানো হবে আর তখন পুরোহিতগণ প্রভুদের উদ্দেশ্য মন্ত্র পড়বেন। তাদের নিচে মূল্যবান তাবিজ ও কবজ রাখা হবে এবং প্রতিটি পরত রঞ্জন দ্বারা প্রলেপ দেওয়া হবে যা ধাতুর মতো কঠিন ও শক্ত করে আটকে ধরবে। শুধুমাত্র মাথাটা উন্মুক্ত রবে এবং পরবর্তী সপ্তাহের পূর্বেই মুখটা খুলে চারজন সবচাইতে দক্ষ মেকআপ আর্টিস্ট মোম ও প্রসাধন ব্যবহার করে ফারাও-এর চেহারায় একটা জীবন্ত ভাব ফুটিয়ে তুলবে। তারা চোখের কোঠরে পাথর ক্রিস্টাল ও কালো আগ্নেয় শিলা বসিয়ে দিয়েছে। সাদাটা অর্ধস্বচ্ছ, আইরিস ও পিউপিল ঠিক রাজার স্বাভাবিক বর্ণের সাথে মিলে গেছে। কাঁচের গোলকটা মনে হল জীবন্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত, নেফার তাদের মধ্যে দিয়ে ভয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল–আশা করল চোখে পাতা নড়ুক ও তার পিতার পিউপিল তাকে চিনতে পেরে প্রসারিত হোক। ঠোঁটগুলো আঁকা হয়েছে ও রং লাগলো হয়েছে, যে কোন সময় যেন তারা হাসবে এবং তার রং করা চামড়া এমন মসৃণ ও উগ্র দেখাল যেন উক্ত রক্ত এখনো তার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে। তার চুল ধোয়া হয়েছে এবং তা পরিচিত কালো খোঁপা করা হয়েছে যা নেফারের অতি পরিচিত।
লর্ড নাজা, প্রধান পুরোহিত ও গায়কবৃন্দ দ্বিতীয় বারের মতো মৃতের জন্য মন্ত্র পড়তে লাগল; কিন্তু নেফার তার পিতার মুখ থেকে চোখ সরাতে পারছিল না।
সে প্রতিচ্ছবি এবং আয়না নয়, সে সঙ্গীত এবং সুর নয়, সে পাথর এবং বাটালি নয়। সে চির দিন বেঁচে থাকবে।
প্রধান পুরোহিত নেফারের পাশে এল ও সোনার চামচটা তার হাতে দিল। নেফারকে রীতিটা শিখিয়ে দেওয়া হল, কিন্তু তার হাত কাঁপতে লাগল যখন সে চামটা তার পিতার ঠোঁটের উপর রাখল এবং বলল, আমি আপনার মুখ খুললাম যাতে আপনি আরো একবার কথা বলার ক্ষমতা পান। সে চামচ দিয়ে তার পিতার নাক স্পর্শ করল এবং বলল, আমি আপনার নাক খুললাম যাতে আপনি আরো একবার শ্বাস নিতে পারেন। তারপর সে শবটির প্রত্যেকটি সুন্দর চোখ স্পর্শ করল। আমি আপনার চোখ খুলে দিলাম যাতে আপনি আবার এই জগৎ ও ভবিষ্যৎ দুনিয়ার সৌন্দর্য দেখতে পান।
এটা শেষ হতেই মমিকররা মাথা ঢেকে দিল ও সুগন্ধি রঞ্জন দ্বারা প্রলেপ মাখাল। এরপর রাজ সভাসদগণ যারা অপেক্ষা করছিল তারা এগিয়ে এল। তারা স্বর্ণের মুখোশটা মুখের উপর বসিয়ে দিল এবং আরো একবার তা দীপ্যমান জীবনের জ্যোতি ছড়াল। আচারাদির বিপরীতে শুধুমাত্র একটা মৃত্যু মুখোশ ও একটা সোনালি কবর ছিল ফারাও ট্যামোসের জন্যে। অথচ তার পিতা তার পূর্বে কবরে গেছেন সাতটা মুখোশ ও সাতটা শবাধার নিয়ে, একটার মধ্যে আরেকটা, প্রতিটি প্রতিবার আগেরটার চাইতে আরো বেশি বড় ও সাজানো।
রাতের বাকি সময়টা নেফার স্বর্ণের শবাধারের পাশে রইল, প্রার্থনা করল ও ধূপ পোড়াল এবং তার পিতাকে তাদের মাঝে নেওয়ার জন্য প্রভুদের উৎসাহ দিল। যেন দেবতাদের মাঝে তাকে আসন দেওয়া হয় সে প্রার্থনা সে করল। প্রত্যুষে সে পুরোহিতদের সাথে বের হয়ে মন্দিরে সারিবদ্ধ বাড়ির কাছে গেল যেখানে তার পিতার প্রধান বাজ শিকারী তার অপেক্ষা করছিল। সে তার হাতে একটা রাজকীয় বাজ পাখি ঢেকে ধরে ছিল।
নেফারটেম! নেফার ফিসফিস্ করে পাখিটার নাম বলল। পদ্ম ফুল সে শিকারীর হাত থেকে সুন্দর পাখিটা নিল ও নিজের মুঠোয় ধরে তা উঁচু করে ধরল যাতে নিচে দাঁড়ানো লোকজন তা স্পষ্ট দেখতে পায়। পাখিটার পায়ে স্বর্ণের চেইনে একটা স্বর্ণের পাত ঝোলানো। ওটার মধ্যে তার পিতার রাজচিহ্ন খোদাই করা। এটা ফারাও ট্যামোস ম্যামোসের গডবার্ড। এটা আমার পিতার সত্তা। সে শক্তি অর্জনের জন্য একটু দম নিল কারণ তার প্রায় কান্না চলে এসেছিল। তারপর সে বলতে লাগল, আমি আমার পিতার গড বার্ডকে মুক্ত করে দিলাম। সে বাজটার মাথা থেকে চোখ বাঁধার চামড়া সরিয়ে ফেলল। ভোরের আলোয় পাখিটার হিংস্র চোখগুলো মিটমিট করে উঠল এবং পাখিটা তার ডানা ঝাঁপটাল। নেফার ওটার পায়ের বাঁধন খুলে দিতেই পাখিটা ডানা প্রসারিত করল। উড়ে যাও, পবিত্র আত্মা! নেফার চিৎকার করে বলল, অনেক উঁচুতে উড়ে যাও আমার জন্যে ও আমার পিতার জন্যে।
সে পাখিটা উপরে নিক্ষেপ করল এবং ওটা ভোরে বাতাসে ভর করে অনেক উপরে উঠে গেল। দুইবার মাথার উপর চক্কর দিল এবং তারপর একটা বন্য ও ভয়ানক চিৎকার দিয়ে পাখিটা নীল পার হয়ে উড়ে গেল।
