ঠিক সময়েই সে সরে এসেছিল, কারণ তখন সাথে সাথে সে একটা শুষ্ক, তীক্ষ্ণ ও ভয়ংকর হিসৃহিস্ আওয়াজ বাতাসে শুনতে পেল। বড় ও চকচকে একটা কালো কিছু, যেখানে কিছুক্ষণ আগে সে হাত রেখেছিল সেখানে চাবুকের মত পিটাচ্ছে এবং এমনভাবে আওয়াজ তুলল যে পুরো নীড়টা নড়তে লাগল। পাহাড়ের খাঁজের মধ্যে যতোটা সম্ভব পিছনে সরে নেফার গুটিসুটি মেরে রইল এবং ভূতুড়ে জটার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। তার চোখ তীক্ষ্ণ ও বড় হয়ে গেল এবং দুঃস্বপ্নের মতো সময় অতিবাহিত হল। সে মৃত পাখিটার পাশে বাচ্চা দুটোর মৃত দেহও দেখল যাদের দেহ পেঁচিয়ে রয়েছে একটা কালো কোবরা। সাপটা মাথা তুলল। ওটার ফনাটা কালো-সাদা দাগ কাটা।
চিকন পাতলা ঠোঁটের মাঝ দিয়ে পাতলা দ্বি-খন্ডিত জিহ্বাটা একবার বের করছে আবার ভেতরে ঢুকাচ্ছে। চোখ দুটো অসীম কালো এবং প্রতিটি চোখে আলোর প্রতিফল দেখা যাচ্ছে যা দিয়ে ওটা নেফারের দিকে নিষ্ঠুর দৃষ্টিতে চেয়ে রইল।
নেফার চিৎকার করে টাইটাকে সর্তক করতে চাইল কিন্তু তার গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বের হল না। কোবরাটার ভয়ংকর সম্মোহিত দৃষ্টি থেকে নেফার তার চোখ সরাতে পারল না। সাপটা তার মাথা আলতো ভাবে ঘোরাতে লাগল, সেই সাথে তার ভারি দেহের ধাক্কায় নীড়টা যার মধ্যে ওটা পাকিয়ে আছে কেঁপে উঠল। কোবরার দেহটা মসৃণ অলংকারের মতো। প্রতিটি কুন্ডলী নেফারের বাহুর সমান পুরু এবং ওটা একসময় কুন্ডলীর উপর ভর করে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
মাথাটা পিছনে হেলে মুখ হা করল এবং নেফার তার মুখ গহ্বরের বিবর্ণ লাইন পর্যন্ত দেখতে পেল। সে স্বচ্ছ বিষ দাঁতগুলোকে ওটার দুপাশের খোল থেকে বের হতে দেখল : প্রতিটি দাঁতের আগায় বর্ণহীন বিষের ফোঁটা। সাপটার ভয়ংকর মাথা নেফারের চেহারার দিকে তেড়ে এল।
নেফার চিৎকার করে উঠল এবং এক পাশে সরে গেল, ফলে সে নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। যদিও টাইটা যে কোন হঠাৎ টানের জন্যে প্রস্তুত ছিল, তবুও যখন নেফারের ওজন দড়ির ওপর পড়ল তখন সে প্রায় দড়ির ওপর বুকে পড়ল। ঘোড়ার চুলের রশির একটা কুন্ডলী তার হাত থেকে মাংস ছিঁড়ে পিছলে গেল, তবুও সে শক্ত করে ধরে রাখল। নিচে বালকটির চিৎকার সে শুনতে পেল এবং অনুভব করল দড়ির অপর প্রান্তে সে দোল খাচ্ছে।
নেফার পর্বতের খাজ থেকে সোজা পাখির নীড় বরাবর দোলাতে লাগল। কোবরাটা আবার আক্রমণের জন্য ছুটে এল। এটার দৃষ্টি বালকটির উপর নির্দিষ্ট করা এবং তাকে মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত। একই সাথে সাপটা মুখ দিয়ে হিস্ হিস্ শব্দ করছে। নেফার আবার চিৎকার করল এবং যখন কোবরাটার দিকে সে উড়ে গেল তখন সাপটাকে ভয়ংকর এক লাথি মারল সে। টাইটা তার চিৎকারের ভয়টা অনুভব করল। সে সজোরে দড়ি উপরে টানল এবং যতোক্ষণ তার বৃদ্ধ মাংসপেশিতে কুলাল সে তা টানতেই থাকল।
তার আয়ত্তের মধ্যে আসা মাত্রই কোবরাটা নেফারের চোখের বরাবর ছোবল মারল। কিন্তু ততোক্ষণে টাইটা নেফারকে রশির অন্য প্রান্ত ধরে টেনে তুলেছে। সাপটির উন্মুক্ত চোয়াল নেফারের কানের এক আঙুল দূর দিয়ে চলে গেল এবং তারপর রথের চাবুকের ন্যায় সাপটির ভারি দেহ তার কাঁধের উপরে দিয়ে এগিয়ে এল। নেফার চিৎকার দিল, জানত সে মারাত্মক কামড় খেতে যাচ্ছে।
আবার যখন সে খাদের উপর ঝুলল তখন সে তার কাঁধের উপরে যেখানে সাপটি ছোবল মেরেছে সে স্থানে এক নজর তাকাল এবং দেখল মলিন হলুদ বর্ণের বিষ তার স্যাডল ব্যাগের উপর ছড়িয়ে আছে। বিপদজনক ভাবে সে ব্যাগটা খুলে আনল এবং আবারো যখন সে যেখানে কোবরটা বিপদজনক ভাবে দাঁড়িয়েছিল সেদিকে দুলে গেল তখন সে ব্যাগটাকে ঢাল রূপে ব্যবহার করল।
যে মুহূর্তে সে ওটার আয়ত্তের মধ্যে গেল কোবরাটা আবার ছোবল মারল কিন্তু নেফার এবার স্যাডল ব্যাগ দিয়ে ছোবল থেকে নিজেকে রক্ষা করল। একটা দাঁত ব্যাগের মধ্যে ঢেবে গেল। ফলে যখন নেফার পিছিয়ে এল তখন আটকে থাকা সাপটিও তার সাথে নীড় থেকে বেড়িয়ে এলো। এটা নেফারের পা জড়িয়ে ধরতে চাইল। ভারি লেজটা তাকে ধরতে গেল এবং ভয়ংকরভাবে হিসৃহিস্ শব্দ করতে লাগল। ভোলা মুখ থেকে বিষের মেঘ স্যাডেল ব্যাগ বেয়ে পড়ল। এর দেহ এতো ভারি যে এর ভারে নেফার ভয়ংকর ভাবে কাঁপতে লাগল।
প্রায় কোন কিছু না ভেবেই নেফার ব্যাগটা খাদে ছুঁড়ে মারল। ব্যাগটা শুন্ধু সাপটা এক সাথে শূন্যে পড়ে গেল। তখনও সাপটার দাঁত ব্যাগে গেঁথে ছিল আর হিসহিস্ করছিল। খাদের নিচে তা হারিয়ে যেতেই ধীরে ধীরে তার হিসৃহিস আওয়াজও ক্ষীণ হয়ে এল। মনে হল যেন এক অনন্ত পতন। অবশেষে নিচে পাথরের উপর পতনের শব্দ সে শুনল। এ পতনের আঘাতে সাপটি মরল কিনা বুঝা গেল না তবে পাথরে বাড়ি খেয়ে একটা কালো বলের ন্যায় লাফিয়ে উঠে ওটা পাথরের নিচে হারিয়ে গেল এবং নেফারের দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেল।
মেঘের ভীত গর্জনের মতো টাইটার কণ্ঠ তার কানে পৌঁছাল। কষ্টে ও চিন্তায় তার কণ্ঠ রুক্ষ শোনাল। আমার সাথে কথা বল। আমাকে কি শুনতে পাচ্ছ?
আমি এখানে, টাইটা, নেফারের কণ্ঠ দুর্বল এবং কাঁপছিল।
আমি তোমাকে উপরে টেনে তুলছি।
ধীরে ধীরে, একটু একটু করে সে নেফারকে টেনে তুলল। এমনকি এই দুঃসময়েও নেফার বৃদ্ধ লোকটির শক্তির প্রশংসা না করে পারল না। যখন পাথর তার হাতের নাগালের মধ্যে এল, সে রশি থেকে ভর কমিয়ে দ্রুত বেয়ে উঠতে লাগল। অবশেষে সে টাইটাকে দেখতে পেল, স্বস্তি নিয়ে বৃদ্ধটি পর্বতের চূড়া থেকে তার দিকে তাকিয়ে আছে, অনেকটা জ্ঞানী, স্ফিংস-এর মতো করে।
