টাইটার কথাই ঠিক উপরে উঠার চাইতে নিচে নামা বেশি কঠিন। ডান হাতটা সরাতেই সে দেখল তার আঙ্গুলের গাঁটগুলি কেটে গেছে এবং পাথরের উপর তার রক্তের ছোপ লেগে আছে। ইঞ্চি ইঞ্চি করে নিচে নেমে সে ঐ জায়গায় পৌঁছে গেল যেখানে খাজটা প্রধান খাজের দিকে উন্মুক্ত হয়েছে। আবার তাকে বাধ্য হয়ে ঘুরে কিনারায় পৌঁছতে হল এবং লুকানো খাজ খুঁজতে হল।
গতকাল সে আর টাইটা যখন খাদের অন্য পাশে বসে এ ব্যাপারে আলোচনা করেছিল তখন এই কাজটি অনেক সহজ মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন খাদের কিনারে তার দুপা করুণভাবে ঝুলছে এবং অতল গহ্বরটাকে মনে হচ্ছে যেন তাকে দানবের মুখের ন্যায় গ্রাস করে নেবে। সে একটা ছোট আর্তনাদ করল এবং দুই হাতে ঝুলে পর্বতের মুখের সাথে লেগে রইল। একটা ভয় তাতে পেয়ে বসল, উদ্যমতার শেষ চিহ্নটা তার উষ্ণ বাতাসের এক ঝটকায় উবে গেল, যেন ওটা তাকে পর্বত থেকে সরে যাওয়ার হুমকি দিল। সে নিচের দিকে তাকাল, চোখের জল গালের ঘামের সাথে তার মিশে তার এক হল। খাদটা যেন তাকে ইশারা করছে, ভীত থাবাসহ তার দিকে এগিয়ে এল। তার সাহস দুর্বল হয়ে এল। এগুতে থাক, টাইটার গলা তার কানে এসে পৌঁছল, ক্ষীণ কিন্তু উত্তেজনায় পূর্ণ। তোমাকে অবশ্যই পৌঁছতে হবে।
অনেক কষ্টে নেফার আরেকটা ধাপ এগোনোর জন্যে নিজেকে তুলল। তার পায়ের পাতাগুলো নিচে অন্ধের মতো খাজ খুঁজল এবং একটা তাক খুঁজে পেল যা তাকে ধারণ করার মত যথেষ্ট চওড়া। ব্যথায় সে নিজেকে নামিয়ে নিল। বাহুর কাঁপুনির শব্দ যেন সে শুনতে পাচ্ছিল। হঠাৎ করে তাক থেকে তার পা পিছলে গেল এবং বাহুগুলো তাকে আর ধরে রাখার জন্যে যথেষ্ট দুর্বল ছিল। সে পড়ে গেল এবং একটা করুণ আর্তনাদ করল। সে শুধুমাত্র তার দুই বাহু ধরে রাখতে পরল এবং রশিটা তার মাংসের ভেতর নিষ্ঠুরভাবে ঢেবে গেল। পাজরের নিচে তা তাকে বেঁধে রাখল এবং তার দম বন্ধ হবার মতো অবস্থা হল। সে খাদের উপর ঝুলে রইল, রশিটি ও তার উপরে থাকা বৃদ্ধ লোকটি তাকে ধরে রাখল।
নেফার তুমি কি আমাকে শুনতে পারছ? তাকে ধরে রাখায় টাইটার কণ্ঠ রুক্ষ শুনাল। উত্তরে বালকটি কুকুরের বাচ্চার মতো একটা কুঁই কুঁই আওয়াজ করল। তোমাকে অবশ্যই একটা খাঁজ ধরতে হবে, এভাবে তুমি এখানে ঝুলে থাকতে পারবে না। টাইটার কণ্ঠ তাকে শান্ত করল, সে চোখ থেকে পানি মুছল এবং এক হাত দূরে থাকা পাথরটা তার দৃষ্টিগোচর হল।
আঁকড়ে ধর, টাইটা তাকে তাগাদা দিল এবং নেফার দেখল যে সে পর্বতের বিপরীতে ঝুলছে। ভোলা মুখটা যাওয়ার জন্য যথেষ্ট বড়, ঢালু তাকটা এতোটা চওড়া যে যদি সে সেখানে যেতে পারে তাহলে সেখানটায় সে দাঁড়াতে পারবে। সে কম্পিত হাতটা বাড়াল এবং আঙুলের ডগা দিয়ে দেয়াল স্পর্শ করল এবং দুলতে লাগল।
মনে হচ্ছিল যেন এটা এক অসীম সংগ্রাম এবং প্রানান্ত চেষ্টা। অবশেষে সে খোলা মুখ পর্যন্ত যেতে পারল এবং তার খালি পা তাকের উপরে দাঁড়ানোর একটা জায়গা খুঁজে পেল এবং সে গুটিসুটি মেরে সেখানটায় বসল। তারপর সে শক্ত হয়ে দাঁড়াল এবং বাতাসের জন্য হা-হুঁতাশ করতে লাগল।
উপরে থাকা টাইটা তার ওজন অনুভব করল ও দড়ি ছাড়তে লাগল এবং তাকে উৎসাহ দিল। বাক-হারা, নেফার, বাক-হারা! তুমি কোথায়।
আমি নীড়ের উপর পর্বতের খাজের মধ্যে।
তুমি কি দেখতে পাচ্ছ? টাইটা ছেলেটার মন অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইল যাতে সে তার পায়ের নিচের শূন্যস্থান দেখতে না পায়।
হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে সে চোখের ঘাম মুছে উঁকি মেরে নিচে তাকাল, আমি নীড়টির কিনারা দেখতে পারছি।
কতটা দূরে?
কাছেই।
তুমি কি ওটা ধরতে পারবে?
চেষ্টা করব।
নেফার সরু খাজের খাদের বিপরীতে পিছনে ঝুঁকে খাড়া মেঝের ঢালু দিয়ে ধীরে ধীরে নামতে থাকল। নিচে সে শুধু শুকনো ডালপালা দেখল যেগুলো নীড়টির চারপাশে বেরিয়ে ছিল। আরেকটু যখন সে নিচে নামল তখন তার সামনে নীড়টি ইঞ্চি ইঞ্চি করে ক্রমশ উন্মোচিত হতে লাগল। তারপর সে চিৎকার করে উঠল। তার কণ্ঠ আরো উত্তেজিত ও শক্তিশালী শোনা গেল।
আমি পুরুষ পাখিটা দেখতে পাচ্ছি, সে এখনো বাসায়।
সে কি করছে? টাইটা চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল।
শুটি সুটি মেরে আছে, মনে হয় ঘুমাচ্ছে। নেফারের কণ্ঠ দ্বিধান্বিত। আমি শুধু তার পিঠ দেখছি।
পুরুষ পাখিটা নিশ্চল, অপরিষ্কার বাসার উঁচু দিকটায় শুয়েছিল। কিন্তু এমনভাবে সে ঘুমাচ্ছে যে তার অচেতন অবস্থান সম্পর্কে নেফার বুঝতে পারল না।
বাজ পাখিটাকে এতো কাছে এবং নীড়টা স্পর্শ করার মতো সীমার মধ্যে পেয়ে উত্তেজনায় নেফার তার নিজের ভয়ের কথা ভুলে গেল।
সে আরো দ্রুত এগুল, আরো অধিক আত্মবিশ্বাস সহকারে এবং তার পায়ের নিচের খাজটা মসৃণ হল এবং দাঁড়ানোর মত একটা জায়গা সে পেল।
আমি ওটার মাথা দেখতে পাচ্ছি। তার ডানা দুটো এমনভাবে ছড়ানো যেন একটা মৃত জীব ওটা। সে পাখিটার এতো নিকটে যে হাত বাড়ালেই সে ওটাকে স্পর্শ করতে পারে, কিন্তু তবুও পাখিটার মধ্যে ভয়ের লেশ মাত্র নেই–নেফার ভাবল।
হঠাৎ তার বোধোদয় হল যে ইচ্ছে করলে ঘুমন্ত পাখিটিকেই তো সে ধরতে পারে। সে কাজটি করার জন্য নিজেকে শক্ত করে আটকালো। ধীরে ধীরে সে পাখিটির দিকে হাত বাড়াল, কিন্তু পরক্ষণেই তার হাত থেমে গেল। পিছনের পালকে সে হালকা রক্তের দাগ দেখতে পেল। মসৃণ রুবি পাথরের ন্যায় উজ্জ্বল, সূর্যের আলোতে তা ঝিকিমিকি করে উঠল এবং হঠাৎ করে নেফারের পেট গুলিয়ে উঠল। নেফার বুঝল পাখিটা মৃত। হারানোর একটা হাহাকার অনুভূতি তার মাঝে ছড়িয়ে পড়ল, যেন মহা মূল্যবান কোন কিছু তার থেকে চিরতরে কেড়ে নিয়ে যাওয়া হল। যা বাজ পাখিটার মৃত্যুর চাইতেও বেশি কিছু। রাজকীয় পাখিটা একটু বেশি কিছুর প্রতিনিধি; এটা প্রভু ও রাজার প্রতীক। যখন সে মৃত পাখিটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, ওটাকে মনে হল পরিবর্তিত হয়ে স্বয়ং মৃত ফারাও-এর দেহে পরিণত হল। একটা চাপা কান্না নেফারকে শুষে নিল এবং সে হাত সরিয়ে নিল।
