হত্যার তৃষ্ণা যেন টর্ককে পাগল করে তুলেছে। নেফারও প্রাণপণে তার আঘাতগুলো ফিরিয়ে দিচ্ছিল। নেফারের পিছন পাথরে ঠেকল। তার শেষ চেষ্টা দিয়ে সে বাঁচার চেষ্টা করল।
তখন নেফার শুনল মিনটাকা যেন কিছু বলতে চাইছে চিৎকার করে। কিন্তু সে কিছুই বুঝতে পারল না, সে সামনে এগুতে পারছে না। ক্রমশ টর্ক তার আরো নিকটে চলে এল এবং বুকে বুক ঠেকিয়ে তাকে পরাস্ত করতে চাইছে।
নেফারের দুর্বল হাত থেকে তার তলোয়ার পিছলে গেল। টর্ক তখন দুহাতে তার তলোয়ার মাথার উপর তুলল, নিশ্চিত নেফারকে মৃত্যুর দেশে যা পাঠিয়ে দেবে। আঘাতটা নেফারের মাথা বরাবর নেমে আসছিল, কিন্তু হঠাৎ তা মাঝপথে থেমে গেল। তার দৃষ্টি বিস্ফোরিত এবং সতর্ক। নেফার চোখ বন্ধ করে আঘাতের অপেক্ষা করছিল। দেরি দেখে চোখ খুলল। দেখল মাঝ পথেই তার তলোয়ার থেমে গেছে এবং টর্ক একটি হাত তার পিছনের পিঠ বরাবর ধরে আছে গলার কাছটায়। তারপর হাতটা সামনে নিয়ে এল আবার, তাতে রক্ত মাখা। কিছু বলার জন্য সে মুখ খুলল, কিন্তু রক্তের দুটি ধারা তার মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এবং ধীরে ধীরে সে নেফারের দিক থেকে পিছনে ঘুরল। ঘুরে মিনটাকাকে দেখতে পেয়ে টর্ক চমকে উঠল, যে তার সামনে পাথরটার উপর দাঁড়িয়ে।
অবিশ্বাস্য অনুভূতিতে নেফার দেখতে পেল একটা বলুম টর্কের পিঠের উপরে ঠিক গলার নিচে বিদ্ধ।
যখন সে দেখল যে নেফার নিচে ফাঁদে পড়ে গেছে তখন মিনটাকা বর্শাটা তুলে নেয় যা নেফার টককে নিক্ষেপ করেছিল এবং বাধা পেয়ে তার পায়ের কাছে এসে পতিত হয়। তারপর নিচে নেমে পেছন থেকে সরাসরি অস্ত্রটা টর্কের ব্রোঞ্জের হেলমেটের নিচে গলা বরাবর চালিয়েছে।
মূর্তির মত নিশ্চল দাঁড়ানো টর্কের মুখের ভেতর থেকে রক্তের ধারা অবিরত বইতে লাগল। সে তলোয়ারটা ফেলে গলা ধরে বসে পড়ল ও সে কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু রক্তের ধারায় তা চাপা পড়ে গেল।
মিনাকম ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল যখন টর্ক লাফিয়ে উঠে তাকে ঝাঁপিয়ে ধরল। নেফার তার পায়ের উপর দুলে উঠল। সে টর্কের ফেলে দেয়া তলোয়ারটা তুলে নিল। মিনটাকার চিৎকার তাকে নতুন করে শক্তি জোগাল যেন, বিশেষ করে তার তলোয়ার ধরা হাতটায়।
প্রচন্ড ক্রোধে সে তলোয়ারটি টর্কের বুক বরাবর স্থির করে চালাল। টর্ক কেঁপে উঠল এবং মিনটাকাকে ফেলে দিল। ভয়ে মিনটাকা সরে এল এবং নেফার আবার ফলাটা বের করে বুকের মাঝখান দিয়ে পুনরায় ঢুকিয়ে দিল সজোরে।
পায়ের উপর দুলে উঠে টর্ক নেফারের দিকে ঘুরল এবং তার দিকে এগিয়ে আসতে চাইল দুহাত বাড়িয়ে। নেফার তখন তলোয়ারটা তার গলা লক্ষ্য করে চালাল এবং টর্ক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ফলাটা চেপে ধরে। নেফার টান দিয়ে ওটা বের করে নিতেই টর্কের হাতের মধ্য দিয়ে রক্তের অবিরত ধারা বইতে দেখা গেল। মুখটা মাটি বরাবর দিয়ে সে ধপাস করে পড়ে গেল।
নেফার হাত থেকে তলোয়ারটি দূরে ফেলে দিল এবং ঘুরে দেখতে পেল মিনটাকা একটি পাথরের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে। প্রচন্ড ভয় পেয়েছে সে। বিপদ কেটে গেছে, মিনটাকা ফুফিয়ে কেঁদে উঠল, এখনও সে কাঁপছে, আমি ভেবেছিলাম সে তোমাকে মেরেই ফেলবে।
সে তা প্রায়ই করে ফেলেছিল; নেফার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কিন্তু তোমার জন্যে পারে নি, এই জীবনের জন্যে আমি তোমার কাছে ঋণী।
অসহ্যনীয়! মিনটাকার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। আমার মনে হচ্ছিল সে কখনও মরবে না।
সে একজন দেবতা, নেফার হাসার চেষ্টা করল, তাই একটু দেরিতে সে মরল আর কি।
যুদ্ধের শব্দে সম্বতি ফিরে এল তাদের। টর্কের লোকজন তাদের ফারাও-এর মৃত্যু দেখতে পেয়েছে। তারা যুদ্ধ থেকে পালাল এবং আত্মসমর্পণ করল অনেকে। তারা সবাই ফারাও নেফার সেটির প্রশংসায় তার আনুগত্য স্বীকার করল।
বিজয়ের আনন্দে তাদের ক্ষমা করে দিল নেফার। সে চিৎকার করে আদেশ করল শক্তি ফিরে পেয়ে, তাদের জন্যে কোয়ার্টার বরাদ্দ করো। তারা আমাদের মিশরীয় ভাই। অফিসারদের এবং সৈন্যদের নিজ নিজ মর্যাদা মতো সুবিধে দাও।
টর্কের লোজন যারা তার আনুগত্য প্রকাশ করল তাদের নিয়ে নেফারের শক্তি এখন প্রায় তিন গুণ বেড়ে গেছে।
তারপর সে এক দল সৈন্যকে সাফাগা অভিমুখে পাঠাল টর্কের বাকি ঘোড়াগুলো এবং পানির ওয়াগনসমূহকে রাজধানী গালালায় নিয়ে আসতে।
নেফার তার শেষ আদেশটা দিয়ে যখন মিনটাকা সহযোগে শহরের তোরণ দিয়ে প্রবেশ করছিল তখন নিচু কণ্ঠে মিনটাকাকে বলল, টাইটা কোথায়? ম্যাগোসকে কি কেউ দেখেছে? কিন্তু টাইটা যেন উধাও হয়ে গিয়েছে।
টাইটা পাথুরে ভূমির উপর থেকে যুদ্ধটা দাঁড়িয়ে দেখছিল। অন্য কেউ লক্ষ্য না করলে তার দৃষ্টি এড়াল না ইশতার দি মেডিকে। পলায়ন পর খরগোশের মতো সে পাথরের আড়ালে আড়ালে পালিয়ে যাচ্ছিল।
টাইটা তাকে পলাতে দিল। তাকে পরেও ধরা যাবে।
অনেক আগে যেদিন টাইটা দূর থেকে মিনটাকাকে দেবীর সামনে কোবরার হাত থেকে রক্ষা করেছিল সে দিন থেকে সে মিনটাকাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অর্জন করে।
আজ সে মিনটাকাকে তার ক্ষমতা বলে টর্কের টোপ হিসেবে ব্যবহার করেছে। সে জানত তার প্রতি টর্কের ঘৃণা কতটুকু।
আজ সে এ কাজটা না করলে যুদ্ধের ফলাফল হয়তো উল্টা হতো।
যখন রেড রোডের ভ্রাতারা নেফারকে নিয়ে বিজয়োল্লাস করে এগিয়ে চলছিল তখন কেউ আর তার বিষয়ে মনোনিবেশ করল না।
