এরই মাঝে নেফার আনন্দে নাচতে লাগল এবং এমনকি টাইটাও, যে কিনা সবসময় বাজ পাখি শিকার করতে ভালোবাসে।
যখন বাজটা পায়রাটিকে মেরে ডানা মেলে নিজের বলে শব্দ করে ঘোষণা দিল তখন সে চিৎকার করে বলে উঠল বাক-হারা। স্ত্রী বাজটা নেমে এসে তার সাথীর সাথে যোগ দিল। ডানা গুটিয়ে পুরুষটা তাকে জায়গা করে দিল ভাগ নেবার জন্যে এবং তাদের ধারালো ঠোঁট দিয়ে মাংস খুবলাবার ফাঁকে ফাঁকে তারা নেফারের দিকে তাকাতে লাগল। মানুষ দুটো ও ঘোড়াগুলোর ব্যাপারে তারা যথেষ্ট সচেতন ছিল, কিন্তু যেহেতু তারা নিরাপদ দূরত্বে ছিল তাই তাদের মেনে নিল।
তারপর যখন পাথরের উপর শুধু পায়রাটার রক্তের দাগ ও কিছু পালক কেবল অবশিষ্ট রইল এবং বাজ দুটির পেট পরিপূর্ণ হল তখনই তারা আবার উড়ে চলে গেল। ডানাগুলোর কষ্ট হল তাদের উড়িয়ে নিতে, তারা পর্বতের চূড়ায় গিয়ে বসল। তাদের অনুসরণ কর, টাইটা তার ঝোলা তুলে নিল এবং রুক্ষ পর্বতের খাঁজ দিয়ে চলা শুরু করল। তাদের হারিয়ে ফেলো না।
নেফারের গতি বেশি দ্রুত এবং দীপ্ত ছিল, সে পাখিগুলোর প্রতি নজর রেখে পর্বতের শিরদাঁড়া বরাবর চলতে লাগল।
চূড়ার নিচে পাহাড়টা সুঁচের ন্যায় দুভাগে বিভক্ত, কালো তীক্ষ্ণ পাথর বেষ্টিত, যা এই নিচে থেকেও ভয়ংকর মনে হয়। তারা বাজ পাখিগুলোকে এ প্রাকৃতিক বৃহৎ পাহাড়ে উঠতে দেখল যততক্ষণ না নেফার বুজতে পারল যে তারা কোথায় গেল। যেখানটায় পাথর ঝুলে আছে, পূর্বের চূড়ার মাঝামাঝি সেখানে V-আকৃতির মত পাথর আকার নিয়েছে ওখানে একটা শুকনো ডালপালা ও খড়-কুটার দলা দেখা গেল।
নীড়!, নেফার উত্তেজিত ভাবে বলল। ঐ যে বাসা।
একই সাথে তারা দাঁড়াল মাথা পিছনে হেলে। বাজ দুটাকে প্রফুল্ল দেখাল, একটার পিছনে আরেকটা, নীড়ের কিনারে দাঁড়ানো এবং তারা মুখের ভেতর থেকে খাবার উগলে বের করছিল। পাহাড়ের বাতাসে নেফার আরেকটা ক্ষীণ আওয়াজ শুনতে পেল, ছানাগুলো চিৎকার করে খাবার চাইছে। এই দিক থেকে সে এবং টাইটা বাজ পাখির বাচ্চাগুলোকে দেখতে পাচ্ছিল না। নেফার হতাশ হল। যদি আমরা পশ্চিম দিকের চূড়াটায় উঠতাম, ঐখানে, সে নির্দেশ করল, তাহলে আমরা পাখির নীড়টা স্পষ্ট দেখতে পেতাম।
আগে আমাকে ঘোড়াগুলো বাধতে সাহায্য কর, টাইটা আদেশ করল। তারা ঘোড়াগুলোর পা বেঁধে দিল এবং পাহাড়ের পাদদেশে দূর রেড-সী হতে ভেসে আসা বাতাসের শিশিরে ভেজা ঘাস খেতে রেখে গেল।
পর্বতের পশ্চিম চূড়ায় উঠতে তাদের সকালের বাকি সময়টা লেগে গেল। যাহোক টাইটা চূড়ার অন্য পাশে নির্ভুলভাবে সবচাইতে সহজ রাস্তাটা খুঁজে নিল। নিচের দিকে তাকিয়ে নেফারের প্রায় দম আটকে যাবার অবস্থা। অবশেষে তারা শীর্ষ চূড়ার শূন্যে একটা সরু জায়গায় এল। সেখানে তারা কিছু সময় বিশ্রাম নিল এবং দূর সাগর ও চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করল। তাদের মনে হল যে সমগ্র সৃষ্টি তাদের নিচে ছড়িয়ে আছে। আর বাতাস তাদের ঘিরে আর্তনাদ করছে, নেফারে ঝোলটাকে যা দোলাচ্ছিল এবং তার কোঁকড়া চুলগুলো এলোমেলো করে দিল।
নীড়টা কোথায়? সে জিজ্ঞেস করল। এমনকি এই উপরে এবং অদ্ভুত স্থানটায় দাঁড়িয়ে, পৃথিবীর অনেক উপরে থেকেও তার মনটা শুধু একটাই বস্তুর উপর স্থির হয়ে আছে।
এসো!, টাইটা উঠল এবং একটু ঘুরে তারা তাদের চলার পথটা কৌণিক বরাবর করে নিল এবং ধীরে ধীরে পর্বতের পূর্বের চূড়া দেখতে পেল। তারা উলম্ব পর্বত মুখের দিকে তাকাল যা মাত্র ১০০ কিউবিট দূরে কিন্তু তাদের থেকে এমন গভীর খাদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন যে নেফারের মাথা ঘুরে গেল।
খাদের এই পাশে তারা নীড়টা থেকে একটু উপরে রয়েছে এবং নিচে তাকাতেই তারা ওটা দেখতে পেল। মা পাখিটা কিনারে বসে ডানা মেলে বাচ্চাগুলোকে ঢেকে রেখেছে।
তারা যখন পাহাড়ের চূড়া জড়িয়ে দাঁড়াল, পাখিটা তখন মাথা উঠাল এবং এক দৃষ্টে তাদের দেখতে লাগল, যেভাবে একটা সিংহ রাগে তার কেশর ফুলায় সেভাবে পাখিটা তার ঘাড়ের পালক ফুলিয়ে রাগ দেখাল। তারপর পাখিটা জোরে তীক্ষ্ণ একটা চিৎকার দিল এবং তাদের উপর চোখ রেখে উড়তে লাগল। পাখিটা তাদের এতো কাছে চলে এল যে এর সব পালকগুলো পরিষ্কার দেখা গেল এবং ছেড়ে আসা নীড়টা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেখানে এক জোড়া বাচ্চা খাবার খাচ্ছে এবং বন্য ছাগলের পশমের ন্যায় তাদের গায়ে পালক উঠেছে। ইতিমধ্যে তাদের প্রায় পূর্ণতা চলে এসেছে এবং লম্বায় প্রায় তাদের মায়ের সমান হয়ে গেছে। নেফার ভয়ে ও শ্রদ্ধায় তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। একটা পাখি উঠে দাঁড়াল এবং ডানা ছড়িয়ে ভয়ংকর রকম করে ঝাঁপটাল।
খুব সুন্দর, নেফার আনমনে বলে উঠল। আমার দেখা এ পর্যন্ত সবচাইতে সুন্দর।
সে উড়ার জন্যে অনুশীলন করছে। টাইটা নরম স্বরে তাকে সতর্ক করল। দেখ ওটা কতো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। কয়দিনের মধ্যেই সে উড়বে।
আমি আজই তাদের ধরতে নামব। নেফার প্রতিজ্ঞা করল এবং শেষ প্রান্তে ফিরে যেতে লাগল, কিন্তু টাইটা কাঁধে হাত রেখে তাকে থামাল।
এটা কোন সহজ বা হালকা কাজ নয়। কিছু মূল্যবান সময় আমাদের পরিকল্পনা করে ব্যয় করতে হবে। এসো, আমার পাশে এসে বসো। নেফার কাঁধের উপর দিয়ে তার দিকে তাকাতেই টাইটা তাদের বিপরীতে থাকা শিলাটা ইঙ্গিতে দেখাল। নীড়টার নিচের পাথর কাঁচের ন্যায় মসৃণ। আর ৫০ কিউবিটের মধ্যে ধরার কিংবা পা রাখার মত কোন জায়গা নেই।
